হাসির মোড়কে সামাজিক বার্তা

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭

ফণীরা বরাবর দারোগা আর ননিরা চোর হয়েই জন্মায়। এমন কি কোনও প্রবাদ আছে? প্রবাদ না থাকলেও এদেশে ফণী ননির মতন চোর দারোগার রাজযোটক খুব কমই আছে। নইলে দুধে দারোগা ফণী ঘোষাল সুন্দরবনের পায়রাখালি থেকে বদলি হয়ে এলেন বসিতপুরে। বসিতপুরে তার আগমনকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনের তরফে যে রাজকীয় সংবর্ধনার আয়োজন তা দেখলে কিংবা শুনলে যেকোনও সাধারণ মানুষের ভিরমি খাবার জোগাড়। সেখানে ননির মতন সাধারণ চোর কিনা সরাসরি ফণী দারোগাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। শোনা যায় ফণীর দাপটে নাকি সুন্দরবনের বাঘেরা রক্তমাংসের স্বাদ ভুলে ফলমূল আর মধু খেয়ে বেঁচে ছিল। বসিতপুরে পা দিয়েই ফণী দারোগার স্বদম্ভ ঘোষণা ছিল আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে শুধু বসিতপুর নয় আশপাশের সাত আটটি গ্রাম থেকে যেন সব চোর বাটপার তল্পিতল্পা গুটিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু ননি সে কথা মানবে কেন। বাপঠাকুরদার জমি জিরেত ছেড়ে যাবে কেন? এজমিতে থাকার অধিকার কেন সে ফণী দারোগার ভয়ে ছেড়ে দেবে। কভি নেহি। অবস্থা বেগতিক দেখে গ্রামবাসীদের নিয়ে প্রকাশ্য জনসভা ডাকে। সেখানেই ফণী ননিকে পনেরো দিনের মধ্যে চুরি করে দেখাতে বলে। আর না পারলে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে। আর পারলে সোনার মেডেল উপহার দেবে। ননি সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে একটি শর্ত আরোপ করে যদি সে সফল হয় তবে দারোগার মুখে বিশাল গোঁফজোড়া কেটে ফেলতে হবে।

দেখতে দেখতে তেরোদিন পার হয়ে যায়। বসিতপুরের কোনও বাড়িতে চুরির কোনও খবর নেই। দিনরাত এক করে পুলিশ আর গ্রামবাসীদের নজরদারিতে পনেরোদিনও পার। কোথাও কোনও চুরির খবর নেই। সবাই যখন ধরে নিয়েছে ননির হাতযশ আর জাদুর দিন শেষ তখনই ননি জানায় সে স্বয়ং দারোগার ঘরে সিদ কেটে সোনার হার চুরি করেছে। নির্ভেজাল হাসির মোড়কে নাট্যকার সুবীর মুখোপাধ্যায় কিছু সহজ সরল সত্যকে সমাজের সামনে নিয়ে এসেছেন। আমাদের দেশে এমনকী রাজ্যেও রাঘববোয়ালরা বহুমূল্যবান ধনসম্পদ চুরি করে রেহাই পেয়ে যান। আর চুনোপুঁটিরা ধরা পড়ে হাজতবাস করে। রাঘববোয়ালদের মাথায় শাসকশ্রেণির হাত। কে তাকে ধরে? পুলিশ প্রশাসন তো তাদের ভয়েই জড়োসড়ো। থান থেকে দুষ্কৃতীদের ছাড়িয়ে নিয়ে যান স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। হাতপেতে ঘুষের টাকা নিতেও তাদের চোখের পলক পড়ে না। সেখানে যত চোটপাট ছিঁচকে চোরদের উপর। নাটকের শেষ পর্বে ননি সোনার মেডেল গলায় লটকে নিলেও দারোগা গৃহিনীর বুকফাটা কান্না শুনে গোঁফজোড়াকে নিষ্কৃতি দেয় আর ফিরিয়ে দেয় চুরি করা হার। প্রবীর (কুট্টি) বসুর নির্দেশনায় নাটক কোথাও গতিহারা হয়নি। বরং প্রতিটি মুহূর্তে চমকের পর চমক। টানটান সংলাপ আর দুরন্ত টিমওয়ার্ক গড়ে পরিচালক সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন।

শৈলিক বরাবরই নির্ভেজাল হাসির নাটক করলেও সবসময় একটি সামাজিক বার্তা দেবার চেষ্টা করে। ফণী দারোগা ননি চোর নাটকেও সেই বার্তা অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অনৈতিকভাবে একশ্রেণির পুলিশের উৎকোচ গ্রহণ, মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের দৃশ্যময় সংলাপ মনে রেখাপাত করবে। নীল কৌশিকের মঞ্চ ভাবনায় মঞ্চ নির্মাণ করেছেন অজিত রায়। বাহুল্যহীন মঞ্চে প্রতিটি দৃশ্যপটের সঙ্গে বাবলু সরকারের আলোর ব্যঞ্জনা মানানসই। মুরারি রায়চৌধুরির আবহসংগীত নাটকের শরীরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মুখ্য দুটি চরিত্রে তপন কুণ্ডু ও প্রবীর বসু যথাক্রমে ফণী ও ননির মধ্যকার অসম্ভব জীবনীশক্তি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন। বাসিতপুর থানার মেজবাবু নলিনাক্ষর ভূমিকায় সুব্রত চক্রবর্তী অভিনয় শুরুর আগে পুলিশের গাড়ির সঙ্গে দুর্ঘটনায় আহত হয়েও যেভাবে চরিত্র নির্মাণ করলেন তাকে বাহবা জানাতেই হয়। হেড জমাদার সুজিত যাদব, কনস্টেবল বঙ্কু শান্তনু চক্রবর্তী ও কমল কবীর দাসের মধ্যেকার পারস্পরিক বোঝাপড়ার অসামান্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। মহাদেব পরমানিকের ভূমিকায় অভিজিৎ মাকাল, সুলতান সুখেন্দু চক্রবর্তী, ডাক্তার দীপংকর মজুমদার, গুরু তপন সাহা যথাযথ। ননির বউ পাপিয়া বসু তালুকদার ও ফণী দারোগার বউ মৃণালিনী সাহাও নিজেদের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। *কিংশুক রায়*

Featured Posts

Advertisement