আদিবাসী সমাজের জীবনযুদ্ধ

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭

*নাটক — বিটলাহা*

নাট্যকার চন্দন ঘোষ এমন একটি বিষয় নিয়ে নাটক লিখেছেন, যাকে স্বল্পদৈর্ঘ্যে জায়গা দেওয়া অসম্ভবই বলা যায়। আদিবাসী সমাজের জীবন ও জীবনযুদ্ধ, লোকবিশ্বাস, সংস্কার-কুসংস্কার এইসব মিলিয়ে যে বিস্তীর্ণ ভাবনা তাকে স্বল্পদৈর্ঘ্যে জায়গা দিল কিছুটা সরল তো হয়ে যাবেই। হয়েছেও তাই। তবু এমন বিষয় নিয়ে নাটক‍ লেখা এবং প্রযোজনা করা মানেই অন্য অভিজ্ঞতায় পৌঁছানো এবং পৌঁছে দেওয়া।

এ এক যুদ্ধের আখ্যান। আদিবাসী সমাজে ডাইন প্রথা শুধু এক বিরাট সামাজিক অপরাধই নয়, চক্রান্তও। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে দুখিয়ার লড়াই শেষ পর্যন্ত সমবেত লড়াইয়ের মাত্রা পেয়েছে। ডাইন প্রথার পিছনে রয়েছে, সম্পত্তি অর্থের ভোগদখলের লিপ্সা এবং চক্রান্ত। সমাজের উপরতলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল এই চক্রান্তের পিছনে রয়েছে এবং এই চক্রান্তের সঙ্গে যোগ রয়েছে শাসন ও শাসকের রাজনীতিও। চন্দন শুধু চক্রান্তের কথায় ‘বিট লাহা’ শেষ করলে নাটকটিকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার কিছু থাকত না, সমবেত প্রতিরোধের মেজাজে শেষ হয়েছে নাটক। শাসন এবং শাসকের প্রসঙ্গ আসেনি। শাসকের প্রতীক বা প্রতিনিধি হিসাবে একটি চরিত্র আনাই যেত। শাসকদের বাদ দিয়ে বা উপেক্ষা করে আজকের বাংলায় কাউকে ডাইন বানিয়ে সব কেড়ে নেওয়ার চক্রান্তের সাধ্য কার? ‘বিট লাহা’ কথার মানে সমাজ থেকে বহিষ্কার। দুখিয়ার নেতৃত্বে চক্রান্তকারীদের সমাজ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আদিবাসী গ্রাম। এই লড়াই উদ্দীপ্ত করবে দর্শককে। এই লড়াইয়ে শহরের পড়ুয়াদের নিয়ে আসা অন্য মাত্রা দিয়েছে ‘বিট লাহাকে’। কারণ, লড়াইটা শুধু আদিবাসীদের নয়।

কিছু সম্পাদনা প্রয়োজন। কিছু সংলাপ, কটি দৃশ্য পুনরাবৃত্তির মতো মনে হচ্ছে। শুরুর দৃশ্যটি অতটা দীর্ঘ হওয়া কি খুব প্রয়োজন? দুই মাতালের বেলাগাম মাতলামি বা স্ল্যাপটিক-দৃশ্যটিও বা অত দীর্ঘ কেন? দুখিয়া আর সুখিয়াকে ঘিরে দৃশ্যগুলিও সামান্য ছোট করে আনা যেতে পারে। নাটক অনেক সংহত হবে। সে যাই হোক, টিম সমকালীন সংস্কৃতি অন্তর ঢেলে দিয়েছে, একটি সার্থক প্রযোজনার নির্মাণে। সবটা যে বিশ্বাসযোগ্য এখনো হয়ে ওঠেনি, তা অভিজ্ঞতার অভাবে আন্তরিকতা নয়।

শুভংকর ঘোষের দুখিয়া এবং অপর্ণা দাসের সুখিয়া গোটা অভিনয়কে এককথায় নেতৃত্বদান‍‌ করেছে। তবু কি তাঁরা সবটা ছুঁতে পেরেছে? খোঁজ চলতে থাকে। দীপেনকান্তি আচার্য (জগমাঝি), দেবপ্রসাদ ঘোষ (পারাণিক), দেবাশিস দাস (মাটি), সমকালীনের নিয়মিত অভিনেতা, কিন্তু এমন সব চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা সেভাবে তাঁদের নেই। তাই গন্তব্যে পৌঁছাতে কিছু পথ এখনো বাকি রয়েছে। অবশ্য শিল্পে গন্তব্য বলে কিছু হয় না। এই প্রযোজনার বৈশিষ্ট্য একগুচ্ছ তরুণ এবং নতুন ছেলেমেয়ে এখানে রয়েছেন। অনেকেই সম্ভাবনাময়। চরিত্রের ভিততে পৌঁছাবার আন্তরিক প্রয়াস লক্ষ্য করা গেল এঁদের মধ্যে। অভিনয়ে ছিলেন শুভংকর ঘটক, দীপাঞ্জন গা‌ঙ্গুলি, অনুপকুমার সরকার, অমলেন্দু চক্রবর্তী, দেবব্রত বিশ্বাস, প্রসেনজিৎ মণ্ডল, সুব্রত মিস্ত্রি, ঈশানি চক্রবর্তী, শ্রাবণী দাস, শর্মিলা চ্যাটার্জি ও মোনালী দাস। গ্রামবাসীর ছোট্ট ভূমিকায় তনিমা দাসসরকার বোঝালেন, তিনি অন্যরকম অভিনেত্রী।

আলো সন্তু সাধুখাঁর। মুখ্যত আলো-অন্ধকারেই আলো করেছেন সন্তু। আলোয় অন্ধকার বেশি। আলোকে পুরোপুরি ডানা মেলতে দেওয়া হয়নি। সুন্দর ভাবনা। তবে লোকনৃত্যে আলো এবং রং এসেছে। দারিদ্র্য, বঞ্চনা আদিবাসী জীবন থেকে রং, আলো কখনো মুছে দিতে পারবে না। দৃশ্যান্তরে মঞ্চকে কেন অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেওয়া হলো? একটি লোকায়ত সমাজ তনিমা দাস সরকারের সংগীত নাট্যপ্রবাহে মিশিয়ে দিতে পেরেছে। তবে নীরবতার উপর আরও নির্ভর করার প্রয়োজন ছিল। সংলাপ আর নাট্যসংঘাতেও তো সুর আর শব্দ রয়েছে। আবহ বিক্রমজিৎ দাঁর। অভিজিৎ নস্করের মঞ্চের পিছনের দিকে মাঝ বরাবর একটি সেমিডায়া‍‌সের মতো, গায়ে একটি গাছ। সেখানেই আদিবাসী দেবতার‍ অধিষ্ঠান। এই ডায়াস এবং দেবতার স্থান নানাভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সামনের মঞ্চের ব্যবহারে এত অনীহা কেন? কম্পোজিশন তাই মাঝে মাঝে ‍‌‍‌বৈচিত্র্য হারাচ্ছিল, পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ছিল। আদিবাসী জীবনের রং সেভাবে বিচ্ছুরিত হলো না। সমকালীন সংস্কৃতি-প্রযোজনা।

 রঞ্জন‍‌ গঙ্গোপাধ্যায়

Featured Posts

Advertisement