করন্থ থেকে কামদুনি যেন এক সূত্রে বাধা

কিংশুক রায়

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭

নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি সভ্যতার লোভ চিরকাল। সভ্যতা মানুষের সভ্যতা। যে সভ্যতার নিগড়ে চাপা পড়ে থাকে নারীর স্বাধিকারের প্রশ্ন। দুই নারী কামিনী কাঞ্চন যখন একে অপরকে প্রশ্ন করে আমি কেন তোমার কাছে এসেছি জানো? তখনই প্রশ্ন ওঠে আমি কি নিষিদ্ধ? নাকি তোমার কাছে আসতে কারও অনুমতির প্রয়োজন? তখনই পরিষ্কার হয়ে যায় আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান। শুধু আমাদের সমাজ কেন পৃথিবীর দেশে দেশে নারীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে রায়গঞ্জ ছন্দমের সাম্প্রতিকতম নাটক ‘মেদেয়ারা’। মেদেয়ারার হাত ধরে করিন্থ থেকে কামদুনি সমান্তরাল রেখায় চলে আসে। আবহমানকাল ধরে নারীর ওপর নির্যাতন আর নির্যাতনের পটভূমি থেকে আগুন শপথে বারেবারে রক্তাক্ত হয়েছে এই ধরণির মাটি।

প্রাচীন গ্রিক পুরাণের কিংবদন্তি নারী চরিত্র মেদেয়া। ভালবেসে বিয়ে করেছিল বীর যোদ্ধা জ্যাসনকে। কিন্তু ক্ষমতালোভী জ্যাসন রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা থেকে করিন্থের সিংহাসন দখল করার অভিপ্রায়ে করিন্থের রাজা ক্রেয়নের কন্যাকে বিবাহ করার ছক কষে। মেদেয়া জ্যাসনের এই প্রতারণার প্রতিশোধ নেয় জ্যাসনের সামনে তার প্রিয় সন্তানদের হত্যা করে। পরে সে হত্যা করে রাজা ক্রেয়ন ও তার কন্যাকে। মহান গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিস ‘মেদেয়া’ মিথকে সামনে রেখে লেখেন নাটক ‘মেদেয়া’। সেই গ্রিক ট্যাজেডি মেদেয়ার আজকের চলমান ভাষ্য নির্মাণ করেছেন রায়গঞ্জ ছন্দম। হর ভট্টাচার্যের নাটক মেদেয়ারা’র খোলনলচেতে লেগেছে সমকালীন প্রসঙ্গ। হিংসা প্রতিহিংসার আগুনে ঝলসে উঠেছে মহাকাব্যিক রূপ। নির্দেশক গৌতম মুখোপাধ্যায় নাটকের মধ্যে নাটক নির্মাণ করে ধরতে চেয়েছেন সমকাল। সেই সমকাল যেখানে মেদেয়ারা পুরুষের আদিম কামনার স্বীকার। কামদুনি গাইঘাটা থেকে নির্ভয়াকাণ্ড সবই এসেছে সময়ের হাত ধরে। প্রতিবাদী সত্তা হয়ে। অন্যদিকে ঝরে পড়তে থাকে পুরুষের পুরুষ হয়ে ওঠার আদিম প্রবণতাগুলি। আধুনিক সভ্যতার শতছিন্ন চাদরের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে পুরুষতন্ত্রের জলছবি।

মেদেয়ারার সূচনা একটি নাটকের মহড়া থেকে। আধুনিক ভাষ্যে যাকে আমরা ক্লোজডোর শো বলে চিহ্নিত করি। নাটকের নির্দেশক পুরুষোত্তম দাশগুপ্তের আমন্ত্রিত বন্ধু সাংবাদিক নাট্য সমালোচক তনুময় মেদেয়ারা দেখে একটি প্রাক্‌ সমীক্ষা প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করে। সেই ইচ্ছার মুখে একে একে পলেস্তারা খসার মতন খুলে পড়তে থাকে পুরুষের ক্ষমতার লোভ থেকে রাজনীতির বেআবরু চেহারা। ভালবাসার অছিলায় কন্যাভ্রুণ হত্যার প্রতিক্রিয়ায় এই সময়ের কন্যা কাঞ্চন নিজের পুত্রসন্তানকে হত্যা করে। এ যেন মেদেয়ারই প্রতিচ্ছবি। নষ্টভ্রুণ বিপন্নতা মেদেয়ার চরিত্রাভিনেত্রী কামিনীর অনতিক্রম শোক বাধভাঙা জলের মতন আছড়ে পড়ে মঞ্চের উজানভূমিতে। অপ্রতিরোধ্য সেই তেজের আগুনে পুড়ে খানখান হয়ে যায় পুরুষের যাবতীয় কলাকৌশল। যা পুরুষকে আজন্মকাল ধরে শিখিয়েছে এই সমাজে নারী শুধুই ভোগ্যপণ্য। নাটকের নির্দেশক পুরুষোত্তম নাটকের স্বার্থে কামিনী ও নিজের স্ত্রী ঈপ্সিতাকে নিজের সাফল্যের সোপান হিসাবে যখন যেমন প্রয়োজন ব্যবহার করেছেন। প্রাক সমীক্ষায় তনুময়ের সরাসরি কামিনী বা ঈপ্সিতার সাক্ষাৎকার অনেক ছাইচাপা আগুনের সন্ধান দেয়। রাজনৈতিক পালাবদলও যে নাটকের ক্ষেত্রে কতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তারও একটা টুকরো ছবি মেদেয়ায় প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে। আজকের বাংলার নাট্য জগতে এমন ঘটনার সাক্ষী বহু নাট্যদল ও নাট্যকর্মী।

আজকের নারী প্রকৃতি পুরুষের জন্মদাতা। সেই নারী আজ ধর্ষিতা। করন্থ থেকে কামদুনি রাজনীতির ছাদনাতলায় বারেবারে তার রংবদল ঘটে। নারীকে তাই আশ্রয় করতেই হয় মার্কসের ক্যাপিট্যাল থেকে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী অক্ষরমালায়।পুরুষের ছায়া সরিয়ে নারীর জীবনে আসুক বসন্তের সুবাতাস। স্বাধীকার চেতনায় সোচ্চার হোক রক্তনিশানে।

নীল কৌশিকের মঞ্চ ও পোশাকে সামঞ্জস্য রেখেই রক্তাক্ত হয়েছে নারীর হৃদয়। মঞ্চে যেন তারই ছোঁয়া। সৌমেন চক্রবর্তীর আলোক বিন্যাস মেদেয়ারার প্রতিটি চরিত্রকে আলোঅন্ধকারে রেখে বাঙ্ময় করেছেন। আবহ সম্পাদনা ও কোরিওগ্রাফিতে দেবকুমার পাল দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। অভিনয়ে দলগত নৈপুণ্যের ছবি। মেদেয়া ও কামিনী চরিত্রে শ্রাবণী দে, কাঞ্চনের ভূমিকায় বর্ণালী বসু ও ঈপ্সিতার চরিত্রে রত্না বসু তিনজনই এইসময়ের অন্যতম প্রতিভাময়ী অভিনেত্রীর শিরোপা পেতে পারেন। চরিত্রগুলিকে যেভাবে তারা নির্মাণ করেছেন তার মধ্যে জীবনের স্পন্দন আছে। কৌশিক দাসের জ্যাসন, সাংবাদিক সুমিত্রা দে যথাযথ। তনুময়ের ভূমিকায় শান্তনু চট্টোপাধ্যায় নিজস্ব একটা অভিনয় ধারা ধরে রেখেছেন। যা নাটক দাবি করে। নির্দেশনার পাশাপাশি দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পুরুষোত্তম দাশগুপ্ত ও ক্রেয়নের ভূমিকায় পরিচালক গৌতম মুখোপাধ্যায়ের বলিষ্ঠ অভিনয়ে রয়েছে বাচিক ও কায়িক অভিনয়ে মেলবন্ধন। মঞ্চের মধ্যে এমন ভারসাম্য বজায় রেখে মেদেয়ারার মতন কঠিন ও জটিল নাটককে ভাষ্য দিয়েছেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement