কোনো একদিন

সাধন চট্টোপাধ্যায়

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

(তেইশ)

বীণা জটাশংকরের চাইতে মাত্তর তিন বছরের ছোট। দীর্ঘদিন নানা মহকুমা কিংবা জেলার সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা ও প্রশাসনের দায়— দুইয়েরই ঝঞ্ঝাটিয়া দায়িত্ব কাঁধে চাকরিজীবন কাটাতে হয়েছে। ইদানীংকার হাঙ্গামা-ভাঙচুর না ঘটলেও, জটিল সমস্যার রেহাই ছিল না সেদিনও। আর্ত মানুষের মনোভূমিই যে জটিলতর। কাতর আবেদন, অন্ধকারের আশঙ্কা, মৃত্যু বা আরোগ্য হয়ে সংসারে ফিরে যাওয়া! ব্যথা-পুঁজ-রক্ত— স্বাভাবিক জীবনের পালিট মুদ্রাটি দেখতে দেখতে, কর্তৃপক্ষ ও বসদের অবিচার মেনে নিতে বাধ্য থেকে, সকলেরই কাণ্ডজ্ঞান, বোধবুদ্ধি ধীরস্থির ও সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। ভ্যাদভ্যাদে আবেগ বা ছোটখাটো স্বার্থের চটজলদি চরিতার্থর মতলব আসে না। যুক্তির পাল্লায় সব কিছু উপলব্ধির প্রবণতা জন্মায়। সর্বংসহা হয়ে ওঠে।

কদিন আগেই এতবড় ধস ও ভূমিকম্প হয়ে গেল, কত মানুষ, বস্তি-মহল্লা ধসে চাপা, তবু, গ্যাংটক বেড়াতে যাওয়ার সময় দিদির ছেলে সুখেনকে কথা দিল কোন আক্কেলে? কথা দেওয়ার আগে স্বামী হিসেবে ছোট্ট পরামর্শটুকুও কি দরকার ছিল না? বে-শ! বেড়াতেই যাক! ভালোমন্দ কিছু বলব না! তবু সদ্য অতীতের পুরানো ক্ষোভটুকু জটাশংকরের বুকের কোণে কোথাও জমে ছিল। .. হঠাৎ সামান্য কারণে উদোরপিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপান।

নইলে কারও স্বাধীন মতামতে জটাশংকর কোনোদিন অহেতুক নাকগলায়নি। খারাপ লাগলেও চেপে গেছে। চুপচাপ অনেক কিছু হজমে সে অভ্যস্ত।

জীবনে যথাযথ জ্ঞান ফুটবার আগেই, পারিবারিক স্নেহ বঞ্চিত। তারপর জীবনের নানা পর্যায়ে পচা খালের কচুরিপানার মতো যত্রতত্র ছিটিয়ে থেকেছে। বঞ্চনা ও আঘাত তাই ভোঁতা হয়ে যায়। দুপায়ে সোরিওসিস ও ম্যাগট আক্রান্ত দিনগুলোতেও পোকারা যখন ঘায়ে ডুবে কুরে কুরে খেত, সে চ্যাঁচাত না। হাসতে হাসতে, ব্যথাকে স্বাধীনতা দিয়েছে। এক আধবার ধৈর্যের শেষ সীমায় বীণাকে বলেছে, একবার এসে দেখবে একটু?

ইঙ্গিতটুকুই যথেষ্ট। বীণা বুঝত ব্যান্ডেজ বা সেবার জন্য আহ্বান। বীণা তার চাকরিজীবনে বিচিত্র আর্তদের ঘেঁটে, বিশ্বাস করে সুস্থতা বলে জগতে কোনও ‍‌কিছু নি‍‌টোল হয় না। চলমান সব মানুষই ছোটখাটো ব্যাধিতে আক্রান্ত একটা সীমারেখা টপকে গেলে মানুষকে রোগী বলে দেগে দেওয়া হয়। আসলে, মানুষের বিচিত্র মনের জগতেই তো বহুবিধ ব্যাধির বীজ। বহু বছর আগে জটাশংকরের সঙ্গে সংসারে জড়ানোর মধ্যেও ছিল কোনও মানসিক গূঢ়ৈষা। সে-প্রসঙ্গ এখন থাক।

তো, সোরিওসিস পেশেন্ট জটাশংকরের ডাকটুকু শুনে দীর্ঘ নীরবতার পর, বীণার তরফে নির্লিপ্ত জবাব থাকত, যাচ্ছি!... হাতের কাজ সেরে নিই!

তাই?

হ্যাঁ, কড়াইয়ে তেল ঢেলে ফেলেছি!... যেতে পাচ্ছি না।

খুবই শান্ত গলার কথাবার্তা। তখনই জটাশংকরের অনেকগুলোর এক ‘তিনি’ চাপা ক্ষোভে প্রভুত্বে গজরাতে চাইলেও, বিপরীত ‘তিনি’-টি স্থির, স্নিগ্ধ শিখাটির আলো ছড়িয়ে থাকত। হতেই পারে! ... হয়তো উনুনে হাত আটকা!.. সেরেই আসুক। ...ওরও সুবিধে-অসুবিধে বুঝতে হবে! সুতরাং সেদিন সুখেনের আবদারে, তার যুক্তি ‘গ্যাংটকে বেড়াতে যাবার শখ কি মাসির থাকতে নেই?’ শুনে মনে হয়েছিল শখতো থাকতেই পারে!... সংসার আর হাসপাতালে গুবরে পোকার মতো দেখে এল। ব্যস্ত।

তাহলে কেন প্রভুত্বে চাপা গজরাতে হবে?

আসলে, জটাশংকরের একটা ‘তিনি’ সুখেন ছেলেটিকে সহজ করে নিতে পারে না। যদিও অন্যান্য ‘তিনি’-গুলো জানে দুই বুড়ো-বুড়ির সংসারে নানা দরকারে ছেলেটাই ভরসা। ‘ছেলেটাই’ বা বলি কেন। সুখেনও পঞ্চাশোত্তর। মেঘে মেঘে বেলা হয়ে গেছে। চেহারাটি ফর্সা দোহারা বলে ছেলেমানুষ ঠেকে।

জটাশংকর অভিজ্ঞতায় টের পায়, সম্প্রতি রাষ্ট্র এবং প্রশাসন যেভাবে নাগরিকদের তুর্কি নাচাচ্ছে, হ্যানো-ত্যানো কার্ড ও নম্বরের জন্য সংসারের বেকার উটকো ছেলেছোকড়া না থাকলে মার খেতে হবে। সুখেন সম্প্রতি তোড়জোর না করলে বীণা ও তার আধার কার্ডটাই হতো না। কম হ্যাপা?

এছাড়া রেশন কার্ডের নানা চিত্তির, চিকিৎসার বিমা জমা দেওয়া, টি ভি-র সেটটপ বক্স লাগানো, ট্যাক্স দেওয়া করা, পোস্ট অফিসে লাইন লাগানো — হাজারো ফেঁকড়া। তাছাড়াও, সংসার তো স্থাবর হয়ে থাকে না। আজ এটা ঠিক হলো তো, ওটা খারাপ, এটা সারানো হলো তো, ওখানটা লিক্‌ হচ্ছে — তাই সুখেন এ-বাড়িতে অপরিহার্য। বীণা বাস্তববাদী। হাড়ে হাড়ে সমস্যাটা বোঝে। তাছাড়াও তার স্নেহের বন্ধন। আর সুখেন-এরও মাসি অন্তঃপ্রাণ। নিজেদের সংসার সেরে, যতটা রিলিফ মাসিকে দিতে পারে! মাসির তো কোনও ছেলেপুলে নেই!

জটাশংকর এটা বোঝে আর মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়। সন্তান না থাকার জন্য মাসির প্রতি সুখেনের চিরদুঃখিনী -অনুভব। এটা কখনও কখন‍‌ও তার পৌরুষকে ঘা দেওয়া আর বীণাও হয়েছে তেমন! কথায় কথায় সুখেনের ওপর নির্ভরতা।

তাছাড়া জটাশংকর টের পায় সুখেনের মধ্যে সবজান্তা ভাব। দেশ-রাজনীতি-সমাজ-সংসার-মানবচরিত্র সব যেন বুঝে ফেলেছে! কোনও বিষয়ে তক্ক উঠলেই, মেসোকে জ্ঞান দিতে চায়। ও যা বুঝে গেছে, তাই যেন ধ্রুব, অমোঘ। মাঝে মধ্যে জটাশংকরকে ধৈর্য হারিয়ে বলতে হয়, বাপু! তোর মেসো ফালতু হলেও নানা ঘাটের জল খেয়েছে রে!... জানে কোনটা পানের যোগ্য, কোনটা দিয়ে শৌচকার্য করতে হয়।

জটাশংকর ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখে‍‌ছে, ছেলেটার মধ্যে অনেক কিছুই ভালো কিন্তু ওর স্বভাবের কোথাও নেতিবাদ ও দুঃখবাদের প্রবল প্রভাব। কখনো তা স্বৈরতন্ত্রের স্তরে পৌঁছে যায়। ও বলে, অপরাধীদের কোনও হৃদয় পরিবর্তন হয় না, তাই ধরো আর গুলি করে মারো। দেশ ঠিক হয়ে যাবে। দেশের পচা লিডারদের ব্যাপারেও সু‍খেনের একই নিদান।

দেশ ও সময়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেটা কোনও আশার আলো দেখ‍‌তে চায় না। তাই নাকি দেশে প্রয়োজন স্বৈরতান্ত্রিক ধারা। স্রেফ মিলিটারি শাসন। অথচ, জটাশংকর টের পায়, ছেলেটা সৎ খুবই, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা শুনলে যথাসম্ভব দুর্বল হয়ে পড়ে। এ জন্য বহুবার ঠকেছেও, তবু নিরাসক্ত থাকবার অভিনয়টুকু জানে না। যে পর্বে জটাশংকর ব্যাধিতে পঙ্গু প্রায়, বীণা চাকরি ও সংসার সামলাতে চোখের জলে নাকের জলে, সুখেনই উদ্যোগ নিয়ে সংসারটা সামলেছিল। ছেলেটা জীবনে তথাকথিত প্রতিটা না পাওয়ায়, জটাশংকরই মাঝে মধ্যে বীণার কাছে আপশোস করেছে। বীণা আবেগে বলতো, আমার যা কিছু জমানো টাকা, ভবিষ্যতে ওকে দিয়ে যাব!

দেবে! কে বাধা দিচ্ছে.

দিলেও বা শুনছে কে?

মুশকিল তোমার, ছুতো পেলেই ছায়ার মতো যুদ্ধ চালাতে চাও আমার সঙ্গে!

তখন বীণা থামে। থামে বটে, মৃদু খোঁচা দিতেও ছাড়ে না।

শেষমেশ রিকশাটা ঝুনো ঝুনো তাতা অবস্থায় স্টেশনের কাছটায় হাজির হলো। পুরানো রিকশাস্ট্যান্ডটায় গাড়ি ঠেকাবার সুযোগ সাময়িক বন্ধ। কে এম ডি এ-এর খোঁড়াখুঁড়িতে জায়গাটা টিন দিয়ে ঘেরা।

মাটিতে পা ঠেকিয়ে গামছায় ঘাম মুছে, টলোমলো লোকটা কে এম ডি এ-এর উদ্দেশে একটা খিস্তি কেটে বলে, শালার পাইপের জল পেতে আমার নাতি-পুতির আমল থেকে যাবে? জটাশংকরের মানিব্যাগ তোলা কুড়ি টাকার নোটটির দিকে চটপট তাকায়।

নো টু-রূপি!

জটাশংকর পথের জমানো বিরক্তি ঢেলে দেয়, চালাকি ছাড়ো!

খুচরোর আকালে লোকটা বোঝে টু-রুপি কতটা মূল্যবান। সিকি উঠে গেছে, আধুলি নিতে নিমরাজি, দুটাকার নিচে ভিখিরিরাও হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে। জটাশংকর ভাবে, ছোটবেলায় পথের ধুলোয় পথেঘাটে সামান্য একটি সিকি আচমকা পেয়ে গেলে, মন কতখানি উৎফুল্ল হ‍‌য়ে উঠত। রাজারধন পাওয়া গেল যেন!

একেই মুদ্রাস্ফীতি বলে? কি জানি! হঠাৎ স্মরণে এলো, রেলে তাদের ডিপার্টমেন্টে কাঠবাঙাল ঝাড়ুদারের মন্তব্যটি। লোকটা সর্বক্ষণ গিলে থাকত। মুড ভালো থাকলে রহস্যভেদের জন্য বাবুদের জিজ্ঞেস করতো, টাকা ভাঙাইলেই আর লাগর পাই না সার! ক্যান কনতো?

ঝাড়ুদারটা টের পেত না নিজের অপটু ভাষার মধ্য দিয়ে আসলে সে মুদ্রাস্ফীতির কথা জানতে চাইছে। তাই খুচরো করতে গেলেই হাতের নোট ক্রয়ক্ষমতা সীমিত করে ফেরে।

ভাড়া মিটিয়ে, বীণাকে বলে জটাশংকর, দাঁড়াও এখানে! টিকিট কেটে আনি!

বীণা বললো, চার নম্বরের টিকিট কাউন্টারে যাচ্ছ না কেন?

একগুঁয়ে জটাশংকর, না! এক নম্বরেরটায় যাব!

গাড়ি তো তিন নম্বরে আসবে, ফলওয়ালাটা বললে যে? ... লাইন পেরুবার ঝুঁকি নিচ্ছ?

বীণার কথায় কান দিল না সে। দেখা যাক বলেও নিজের জেদ বজায় রাখতে হাঁটলো এক নম্বরের দিকে। লাইন টপকে পাথরের স্তূপ ধরে পা টিপে টিপে।

(ক্রমশ)

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement