ঘনা বাগদির ভাত খাওয়া

তপোময় ঘোষ

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

—কী বললে, মা? বুঝতে পারলাম না। আর একবার বলো। ছোটকাকা কোথা থেকে এসে ঠাকমাকে বললো।

যাঃ, আমাদের গল্প শোনা হয়ে গেল! সমস্ত আনন্দ উল্লাস খতম। সত্যিই ঠাকুমা থেমে যেতে বাধ্য হলেন। যাকে বলে ছোটকা সজ্ঞানে ইন্টারফেয়ার করলেন। আমরা রেগে গেলাম। আর আমরা রাগলাম তো ছোটকার বয়েই গেল। সে-ও এ বাড়ির ছোটছেলে। তার ওপর... সে অনেক কিছু... ডাক্তারি পড়ছে— শুধু নয়, মেডিক্যাল কলেজে রাজনীতিও না কি করে।

আমরা একদল ছোটরা ফ্যাল ফ্যাল করে ওদের মা-ব্যাটার দিকে তাকাতে বাধ্য হলাম। ঠাকমা বললেন, বলছি আমার বাপের বাড়ির মান্দার ঘনা বাগদির ভাত খাওয়ার কথা...

—তা বেশ তো! ভাত খাওয়ার গপ্পোটা আর একবার বলো না। আমি আর একবার শুনবো, ছোটকা বলে।

—কী শুনবি! সে এক গামলা ভাত একাই একবারে খেত।

—অঃ তা গামলাটা কতো বড় শুনি!

—বেশ বড়। প্রায় এক কেজি চালের ভাত ধরতো আমাদের ঠাকুরঘরে প্রসাদের গামলাটার মতো। তোরাও তো ওই গামলাটা বহুবার ফিস্টে ব্যবহার করেছিস। সেই গামলার এক গামলা ভাত ঘনশ্যামদা একাই খেয়ে নিত!

—হ্যাঁ, তা তো খেতেই পারে। তাতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? তাকে তোমার বাবা-দাদারা প্রচণ্ড খাটাতো; পরিশ্রম হতো, ক্ষিদে লাগতো, খেত। বেশি খাটলে বেশি তো খেতেই হবে।

—তাই বলে অত ভাত...?

—হ্যাঁ খাবে। তার বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। বলছি। এই পৃথিবীতে অকারণে কিছুই ঘটে না। অ্যাই, তোরা সবাই শোন। তোদেরও কাজে লাগবে।

আমরা ভয়ে মরি। ছোটকার নীরস কিছু কথা, যা উনি গল্প বলে আমাদের শোনানোর/গেলাবার চেষ্টা করবেন এবং তা আমাদের শুনতেই হবে। আর সেসব যতটা না গল্প, তার চেয়েও বেশি সত্যি কথা। ঠাকমাও গল্পচ্ছলে সত্যি কথা বলেন, তবে তাতে গল্পরস বেশি থাকে। শুনতে খুবই মজা লাগে। এই যে আজকের গল্পটাই। এটা তো সত্যিকারের ওনার বাপের বাড়ির ছোটেবেলাকার আস্ত সত্যি কথা! সত্যিই ওনার বাপের বাড়িতে ঘনা বাগদি নামে একজন কৃষিশ্রমিক লাগাতার কাজ করতেন। তার জীবনের বহু ঘটনাই আমাদের এই সান্ধ্য গল্পাসরে বিশুদ্ধ গল্প হিসাবেই এসেছে। আজকেও এসে গেছিল, একটুর জন্য ছোটকা থামিয়ে দিল। রাগ লাগে খুব!

তা এখন, আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। এখন ছোটকার কথাগুলো শুনতে হবে। টোকন বললো, হ্যাঁ বলো কাকা! আমিও কাঁচুমাচু মুখে ওই টোকনকেই সমর্থন করলাম। কাকা উৎসাহ পেয়ে শুরু করলেন :

—ওই যে মামাবাড়ির মান্দার ঘনা বাগদি, তাকে আমিও দেখেছি। সে আসলে ঘনশ্যাম মাঝি। সে তথাকথিত, আমার মায়ের বংশের মতো ভদ্রলোকের বাড়িতে থাকতো, তারা তাকে ছোটলোক ভাবতো। আর নামটাও ছোট এবং বিকৃত করে ‘ঘনা’ রেখেছিল। অনাদরে অবহেলায় আর কি...

.... তা সেই লোকটা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে খাটতে বাধ্য হতো। যখন ফসল বোনা, পরিচর্যা বা কাটার কাজ থাকতো না, তখন একপাল গোরু মোষ নিয়ে তাকে মাঠে পাঠানো হতো। অর্থাৎ গোরুর রাখালি, গোরুর জন্য খড়বিচালি কাটা, জাব দেওয়া সব করতে হতো।

—হ্যাঁ, তা খাটার জন্যই তো তাকে রাখা হয়েছিল। ঠাকমা কূট কাটলেন। কাকা আরও রেগে এবার বলতে শুরু করলেন, তা সে কত কঠিন খাটুনি তা তো আমি দেখেছি। ওঃ বাপরে তার খাটুনি। মোষের মতো। অবশ্য আমাকে মামাদের মোষের পিঠে পিঠে ঘুরিয়ে মজা খাইয়েছিল।

...তা লোকটা এক গামলা ভাত খেত। সত্যিই খেত। তা সে গামলাটা কোথায় থাকতো জানিস?

—না। আমরা উত্তর দি।

—ধান রাখার গোলার নাম শুনেছিস? সেই গোলার তলায়। সেখানে ইঁদুর খাওয়ার লোভে ঘাস আসতো হামেশা। ইঁদুরকে ছোবল দিতে গিয়ে বিষও হয়তো ছড়িয়ে পড়তো সেই গামলায়...

... সে সে-ই বেলা তিনটেয় মাঠ থেকে অথবা কাজ সেরে এসে গোলার তলা থেকে তার গামলাটা বের করে উঠোনে পেতে বসতো। মা ঠাকরুণরা তাতে আলগোছে সাদা ভাত ফেলে দিতেন। যথারীতি ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে। কি গো মা, তাই তো?

—হ্যাঁ...। ঠাকমার গম্ভীর জবাব।

—সত্যিই একগাদা ভাত। তা খাবার জন্য কি তরকারি পাতে থাকতো জানিস? কুমড়ো-কচু-গেঁড়ো-কাঁচা পেঁপে এসব বিদঘুটে পুষ্টিমূল্যহীন সস্তার শাকসবজি!

—তাই! টোকন আশ্চর্য হয়।

—হ্যাঁ, তাইতো এত ভাত খাওয়া। কেন বলতো?

আমরা বুঝতে পারি না। বলতে তো পারি-ই না। ছোটকা নিজেই উত্তরটা দিতে থাকলেন : ওই যে আগের দিন বলেছিলাম। আমাদের খাদ্যের মধ্যে মোট ছটি উপাদান থাকে। মনে আছে? বল তো কি কি?

বললাম, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ আর জল।

—ঠিক ব‍‌লেছিল। আমাদের শরীর সুস্থ রাখতে হলে এবং কাজ করতে গেলে এগুলো খেতে হবে। যাকে বলে সুষম আহার। তাই তো?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু বাছারা লক্ষ্য করো : আমার কৃপণ মাতুলরা তাকে শুধুই ভাত আর ওইসব কচু-ঘেঁচু-কুমড়ো-ডিংলা দিতেন। কি মা, তাইতো? কস্মিনকালেও তো ওই ভাতে এক চামচ ঘি পড়তো না। খাসির মাংস? না তাহলে...

...ওই ব্যাটা বাগদিরও তো প্রাণ! ওর শরীরেও তো একটা লিভার বা যকৃৎ আছে। সেই অঙ্গটাকে বেশি খেটে ওই ভাতের কার্বোহাইড্রেট থেকে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিদ্রব্য বানিয়ে দিতে হতো। আর সেজন্য শরীরে ভাত লাগতো বেশি। মানে তোদের ঠাকুমার ঠাকুর ঘরের এক গামলা।

—এবার বুঝেছি কেন বেশি ভাত খায় গরিব খেটে-খাওয়া মানুষরা, টোকন বললো। আমি বললাম, শারীরিক শ্রম বেশি করে তো, তাই।

ছোটকা খুশি হয়ে বললো, ঠিক তাই! ঠিক বলেছিল। মানুষের শরীরের লিভার তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ অরগ্যান। ওই যন্ত্রই গ্লুকোজ বা সুগার এসব বানায়, কমায়, বাড়ায়। ভাত রুটি না খেলেও দেখবি ডায়াবেটিস রোগীর সুগার বাড়ছে। কারণ তার লিভার যন্ত্র ঠিক মতো কাজ করছে না। ওইসব তৈরির পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যালান্স রাখতে পারছে না। যাক, ঘনামামার ভাত খাওয়া প্রসঙ্গে এরকম ভারী ভারী কথা বলে ফেললাম। তা তোরা বুঝলি তো? সমবেত আওয়াজ তুললাম, হ্যাঁ... অ্যা... অ্যা...

এবার ছোটকা বললো, তোরা তো খুশি হলি, কিন্তু আমার মা? উনি তো বেশ রেগে গেলেন! না কি মা? ঠাকমা বললেন, কেন, আমি রাগবো কেন?

—ওই যে, তোমার বাপের বাড়ির লোকদের চষোমখোর প্রমাণ করলাম।

ঠাকমা বললেন, তা করগা। তারা সব কবে মরে গেছে... মরা মানুষদের কোনও দোষ থাকে না...।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement