১২৫তম জন্মর্বর্ষে
সত্যেন্দ্রনাথ বসুূ

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

১৮৯৪সালের ১লা জানুয়ারি উত্তর কলকাতার ঈশ্বর মিল লেনে জন্মেছিলেন বাংলার অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। বছরের হিসাবে ২০১৮সালটি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ১২৫তম জন্মবর্ষ। ২০১৫সালে হিগস-বোসন আবিষ্কারের পর আবারও তাঁর নাম সামনে চলে আসে। ভারতীয় হিসাবে আমাদের গর্বের বিষয় এই জগতের মৌল কণার অর্ধেকই তাঁর নামের অনুসারী। পরিভাষায় ‘বোসন’।

১৯৩৪সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু এই কলকাতা থেকে তাঁর দুই গবেষণাপত্র পাঠান আলবার্ট আইনস্টাইনকে। গবেষণাপত্র দুটি আইনস্টাইন অনুবাদ করে তা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করেন। এরপর থেকে পদার্থবিজ্ঞানে আইনস্টাইনের সঙ্গে একই সঙ্গে উচ্চারিত হতে থাকে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম। ‘বোসন’-এর পাশাপাশি কণা পদার্থবিদ্যায় একাধিক জায়গায় তাঁর পদবি ‘বোস’ বলে জায়গা করে নেয়। ‘বোস সংখ্যায়ন’ নিয়ে এখনও গবেষণা করে থাকেন দেশ-বিদেশের অনেক পদার্থবিদ।

লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো, জাতীয় অধ্যাপক, দেশিকোত্তম, পদ্মবিভূষণের মতো একাধিক সম্মান পেয়েছেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। এক সময়ে জাতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান সম্মেলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিসাবে কাজ করার সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ বসু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থার উপদেষ্টা ছিলেন।

এবছর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ১২৫তম জন্মবর্ষ পালিত হতে যাচ্ছে। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌল বিজ্ঞান কেন্দ্রের তরফে নানা ধরনের অনুষ্ঠান হাতে নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের সকল মানুষের কাছে বিশেষত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথের বৈজ্ঞানিক অবদান ও বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে নেওয়া হয়েছে বর্ষব্যাপী নানান অনুষ্ঠানের।

শুধু বিজ্ঞান নয়, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শনে আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর গভীর চর্চা আর বুৎপত্তি ছুঁয়েছিল। শিল্পকলা, সংগীত জগতেও ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। সত্যেন্দ্রনাথ বসু কন্ঠ ও যন্ত্রসংগীতে উচ্চমানের রসগ্রাহী এবং সুদক্ষ এস্রাজ বাদক বলে পরিচিত ছিলেন। এমনকি জানলে অবাক হতে হয় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর একমাত্র বিজ্ঞান গ্রন্থ ‘বিশ্ব পরিচয়’ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন।

১৯৪৮সালের ২৫শে জানুয়ারি আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ। তিনি সংস্থার মূল স্থপতি শুধু নন, প্রতিষ্ঠা বর্ষ থেকে আমৃত্যু বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের সবচেয়ে বড় পরিচয় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত মাসিক বিজ্ঞান পত্রিকা ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’। মৌলিক গবেষণাকে বাংলায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে এই পত্রিকার অবদান অনেকটা।

সোমবার বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌল বিজ্ঞান কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দিয়ে বিজ্ঞানীর জন্মবার্ষিকী উৎসব পালনের সূচনা হচ্ছে। গোয়াবাগানে বিজ্ঞান পরিষদ থেকে সকাল সাড়ে আটটায় শুরু হবে বর্ণাঢ্য পদযাত্রা। এ পি সি রোড, মানিকতলা, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, সুকিয়া স্ট্রিট, রাজা রামমোহন সরণি, বিবেকানন্দ রোড, বিধান সরণি পরিক্রমা করে আচার্যের বাড়িতে এসে শেষ হবে পদযাত্রা।

১২৫তম জন্মবার্ষিকীকে উপলক্ষ্য করে ২৪-২৫শে মার্চ সায়েন্স সিটিতে বসছে জাতীয় আলোচনাচক্র। বিজ্ঞান, সমাজ, বিজ্ঞান মানসিকতা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু শীর্ষক ওই আলোচনা চক্রের দেশের সেরা বিজ্ঞানীরা যোগ দিচ্ছেন। সত্যেন্দ্রনাথের জীবন ও কর্ম বিষয়ে রাজ্যের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে সারা বছর ধরে আয়োজন করা হবে জনপ্রিয় বক্তৃতা। চলবে তাঁর কর্মজীবন নিয়ে পোস্টার প্রদর্শনী।

‘সত্যেন্দ্রনাথের জীবন ও কর্ম’ বিষয়ে বিশিষ্টজনের লেখা নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’-এ বিশেষ মে-২০১৮সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে।

বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের কর্মসচিব তপন সাহা জানিয়েছেন, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে নানান বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে থাকবে প্রবন্ধ, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, কুইজ। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের উদ্যোগে বর্ষব্যাপী আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ১২৫তম জন্মবর্ষ উদ্‌যাপনের এই মহতী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করছে রাজ্যের উচ্চ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জীবপ্রযুক্তি দপ্তর।

সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে ভারত সরকারের সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌল বিজ্ঞান কেন্দ্র। ১লা জানুয়ারি সকাল এগারোটায় দিল্লিতে বসে ভিডিও কনফারেন্স মারফত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সল্টলেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌল বিজ্ঞান কেন্দ্রে ১২৫তম জন্মবর্ষ উজ্জাপনের সূচনা করবেন। ১২৫তম জন্মবর্ষের বিশেষ বক্তৃতা দিতে ওই দিন কলকাতায় আসছেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির সভাপতি অধ্যাপক অজয় কুমার সুদ। ওই দিন বিকাল ৪টা নাগাদ সল্টলেকের সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু নিয়ে জনপ্রিয় বক্তৃতা দেবেন দেশের ন্যানো বিজ্ঞানের পুরোধা ভারতরত্ন অধ্যাপক সি এন আর রাও।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌল বিজ্ঞান কেন্দ্রের অধিকর্তা অধ্যাপক সমিত কুমার রায় জানিয়েছেন, ১২৫তম জন্মবর্ষ পালনের অঙ্গ হিসাবে ২০১৮সালের বিভিন্ন সময়ে নামী-দামী বিজ্ঞানীদের নিয়ে আলোচনাসভা ও জনপ্রিয় বক্তৃতার আয়োজন করা হবে। এই উপলক্ষ্যে নোবেল জয়ী পদার্থবিজ্ঞানীদের আনার চেষ্টা চলছে। বিজ্ঞান প্রসার এবং জাতীয় বিজ্ঞান সংগ্রহশালা পর্ষদ। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ১২৫তম জন্মবর্ষ পালন করতে উদ্যোগী হয়েছে আরও অনেক সংস্থা। তাঁর গবেষণা উৎকর্ষের খোঁজ চালানোর জন্য মুখিয়ে রাজ্যের গবেষকরা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement