পিঠে খাবো কবে?

নিবেদিতা চক্রবর্তী

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

প্রাচীনকালে গ্রীক বিজ্ঞানী ক্লডিয়াস টলেমি পৃথিবী কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের কথা বলতেন। প্রভাতের পূর্বাকাশে সূর্যের উদয় আর প্রদোষে আকাশপথ পরিক্রমণ করে সূর্যের পশ্চিম আকাশে অস্ত সকলেই পর্যবেক্ষণ করতো। পৃথিবীর পূর্ব আকাশ থেকে পশ্চিম আকাশের সূর্যের গমন পথ সকলেই সহজভাবে বিশ্বাস করে নিয়েছিলো।

কিন্তু এই ধারণাকে ভ্রান্ত, বাস্তবতাহীন বলে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানী আর্যভট্ট। তিনি ঘোষণা করেছিলেন — আবর্তনরত অবস্থাতেই পৃথিবী, সূর্যকে পরিক্রমণ করছে। এই মতবাদ পরবর্তী সময়ে কোপারনিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও এবং নিউটন সমর্থন করেছিলেন। এমনকি স্যার আইজাক নিউটন পৃথিবীর আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতিরও প্রামাণ্য রেখে গেছেন। ১৬৮৭খ্রিস্টাব্দে প্যািরিসে অনুষ্ঠিত ভূ-সমীক্ষায় নিউটনের যুক্তি প্রমাণিত হয়।

পৃথিবী এক উপবৃত্তাকার পথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। প্রদক্ষিণ করে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে। তার জন্য আমরা আপাতদৃষ্টিতে সূর্যসহ সমস্ত গ্রহ নক্ষত্রদের পূর্ব-পশ্চিমে আকাশপথে পরিক্রমা করতে দেখি। আর এই পরিক্রমণের জন্য কোন অংশ একবার কাছে আসে, একবার দূরে যায় সূর্যের থেকে। তার জন্য জল বাতাস, খাওয়া পরা, চলা ফেরা, দিন রাত, ঠান্ডা গরম সবকিছুর সাথেই আমাদের পরিচয় গড়ে ওঠে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে।

পৃথিবীর মেরুরেখা যেহেতু নিজের কক্ষতলের উপর সোজাসুজি না থেকে সাড়ে ৬৬১/২ডিগ্রি কোণে অবস্থান করে আর কক্ষপথটিও উপবৃত্তাকার, তাই শুধুমাত্র বছরের দু’দিন ২১শে মার্চ এবং ২৩শে সেপ্টেম্বর সূর্যকিরণ পৃথিবীর নিরক্ষরেখার ওপর সোজাসুজি বা লম্বভাবে পড়ে। তাই সেই সময় পৃথিবী উত্তর ও দক্ষিণ মেরুবিন্দু সূর্য থেকে সমান দূরত্বে থাকে। আর তারই অনিবার্য ফল পৃথিবীর সর্বত্র দিবারাত্রি সমান হয়। বলা হয় বিষুব বা ইকুইনক্স। ‘ইকুই’ মানে ‘ইক্যুয়াল’ আর ‘নক্স’ মানে ‘নাইট’। একযোগ করলে সমান রাত্রি যেখানে।

অয়ন কথার অর্থ গতি বা গমন। তাই সূর্যের গতিপথ’কে অয়ন বলে। যেমন উত্তরমুখী গতিকে উত্তরায়ণ আর দক্ষিণমুখী গতিকে দক্ষিণায়ন। অবশ্য সূর্যের কিরণ যদি উত্তর গোলার্ধে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বেশি না পড়ে তবে তাদের উত্তরায়ণ বা দক্ষিণায়ন বলা যাবে না।

২১শে মার্চ সূর্যকিরণ নিরক্ষরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। তারপর পৃথিবী যতই কক্ষপথে অগ্রসর হয় তত পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে সূর্যের দিকে হেলে যায়। দক্ষিণ গোলার্ধ তত দূরে সরে যেতে থাকে। মনে হয় সূর্য বুঝি একটু একটু করে উত্তর দিকে যাচ্ছে। একেই বলে উত্তরায়ণ। ২১শে মার্চ থেকে ২১শে জুন পর্যন্ত সময়কে সূর্যের উত্তরায়ণ বলা হয়। আর ২৩শে সেপ্টেম্বর থেকে ২১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সূর্যের দক্ষিণায়ন বলা হয়। ২১শে ডিসেম্বর সূর্য দক্ষিণ গোলার্ধের সবচেয়ে কাছে আসে। ঐ দিন সূর্য মকরক্রান্তির উপর লম্বভাবে পড়ে। দক্ষিণ গোলার্ধে দিবাভাগ সবচেয়ে বড় আর রাত ছোট। আর উত্তর গোলার্ধে বিপরীত অবস্থা অর্থাৎ দিন ছোট আর রাত বড়।

আমরা থাকি উত্তর গোলার্ধে। তাই আমাদেরও ২১শে ডিসেম্বর দিন সব থেকে ছোট। সেই সময় দক্ষিণায়নের শেষ। বলা হয় দক্ষিণ অয়নান্ত দিবস বা মকর সংক্রান্তি। এত গেল বৈজ্ঞানিক তথ্য। যা পৃথিবীব্যাপী মানুষ মানতে বাধ্য। কিন্তু দেশ-কাল-পরিবেশ-জল-বাতাস যা কিনা সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর অনবরত পাক খাওয়ার জন্যই ঘটে, তারই ফলে দেশে দেশে, রাজ্যে রাজ্যে, গ্রামে গ্রামে নানা সংস্কৃতি আচার অনুষ্ঠান পালাপার্বন, লোককথা, লোকগাঁথা চলে আসছে বংশপরম্পরায়।

ঠিক সেই রকমই একটা উৎসব মকর সংক্রান্তি। ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী সংক্রান্তি একটি সংস্কৃত শব্দ। এর সাহায্যে সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করা বোঝানো হয়। আমাদের ১২মাসের মতো ১২টি রাশিও আছে। তাই আছে ১২টি সংক্রান্তি। এই মকর সংক্রান্তি উৎসব হয় পৌষ সংক্রান্তি বা পৌষ মাসের শেষ তারিখে। কোথাও ১দিন, কোথাও ৪দিন, কোথাও বা ৭দিন ধরে নানা আচার অনুষ্ঠান সহযোগে উৎসব পালিত হয়। সাধারণত জানুয়ারি মাসে ১৪ বা ১৫তারিখে হয় পৌষ সংক্রান্তি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই অনুষ্ঠানের রেওয়াজ আছে। তবে এক, এক জায়গায় এক, এক নাম। অনেকটা কেষ্ট ঠাকুরের একশত আট নামের মতো। কিছু কিছু উল্লেখ করতেই হয়। যেমন নেপালে মাখে, থাইল্যান্ডে সোংক্রাণ, বার্মায় থিংইয়ান, আবার কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রাণ, বাংলাদেশের পুরানো ঢাকায় এই উৎসবকে বলা হয় সাকরাইন। তাছাড়া তামিলনাডুতে পোঙ্গল, আসামে ভোগালি বিহু, পাঞ্জাব-হরিয়ানা-হিমাচল প্রদেশ ও জন্মুতে লোহ্রি, কর্ণাটকে মকর সংক্রমণ এবং কাশ্মীরে শায়েন-ক্রাত বলা হয়।

উত্তর ভারতের অন্যান্য অঞ্চল যেমন ওডিশা, মহারাষ্ট্র, গোয়া, অন্ধ্র, তেলঙ্গানা এবং কেরলে মকর সংক্রান্তি নামটিই চলে। এর পাশাপাশি অবশ্য স্থানীয় নামেরও প্রচলন আছে। যেমন মধ্যপ্রদেশে সুকরাত বা বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের কোনও কোনও এলাকায় খিচড়ি পর্ব। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এই মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তিতে ফসলের উৎসব ছাড়াও উত্তরায়ণের সূচনাও বলা হয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যে রাজ্যে, জেলায় জেলায় নানাভাবে এই উৎসব পালন হয়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার অন্তর্গত সাগরদ্বীপে মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে কপিল মুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে পুণ্যস্নান ও বিরাট মেলা বসে। জেলায় জেলায় একাধিক মেলা এই সময় হয়।

২১শে ডিসেম্বর সূর্য মকরক্রান্তি রেখায় লম্বভাবে পড়ে। দিনরাত, ঋতু পরিবর্তন, নক্ষত্র-ধুমকেতু গল্পের মধ্য দিয়ে নাতিকে ভূ-গোলকটা নিয়ে দেখিয়ে মজা করছিলাম। কিন্তু আমার ৮বছরের সব বিষয়ে ‘কেন’ বলার অধিকারী নাতি বলে বসলো — আচ্ছা দাদিয়া, সূর্য যদি ২১শে ডিসেম্বর মকর সংক্রান্তি করে, তবে ঠামি কেন জানুয়ারি মাঝখানের মকর সংক্রান্তি’কে পৌষ সংক্রান্তি বলে ‘পুজো’ করে। পিঠে, পায়েস, পাটিসাপটা করে।

২১শে ডিসেম্বর কেন করে না ? বই পড়েনি বলে ? নাতির কৌতূহল নিরসনের জন্য এই ব্যাখ্যা নয়। তবু নাতিকে বলা কথা দিয়েই বিবাদের মীমাংসা করতে হয়। বৈজ্ঞানিক তথ্য এক আর মানুষের ভালোবাসা, ভালোলাগা, সংস্কার আর এক। জ্যোতিষ শাস্ত্র আর জ্যোতির্বিজ্ঞান তো এক হতে পারে না। খাদ্য তালিকাতেও স্থানীয় প্রভাব পড়ে। তামিলনাডুর সংক্রান্তি উৎসবে তিল আর গুড়ের মিষ্টির প্রাধান্য থাকে। ওখানে তিলের প্রাচুর্য, আর পশ্চিমবঙ্গে নারকেলের প্রাচুর্যের জেরে এখানে নারকেলের পিঠেই বেশি।

তবে বৈজ্ঞানিক তথ্য যেমন বলে এটা ভালো সময়ের শুরু। আচার অনুষ্ঠান পালন উদ্দেশ্যও তাই। সেখানে দিনের বিতর্ক করে কী হবে ? ভালো জিনিসতো সব সময়েই ভালো। ঠাকুমা-দিদিমারা শুধু পৌষ সংক্রান্তিতে কেন, যদি গোটা পৌষমাস ধরেই ভালোমন্দ খাওয়ান, তাহলেই বা আপত্তি কোথায়? পিঠে খাওয়ার সঙ্গে ধর্মাচরণের তো কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে অযথা বৈজ্ঞানিক যুক্তিকে এর মধ্যে ডাকা কেন?

Featured Posts

Advertisement