ফুটবল বারোমাস্যা

নিজস্ব প্রতিবেদন

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

বছর শেষ। ৩৬৫দিন ভরে থাকল শুধুই। কখনো দেশ। কখনো বিদেশ। মনে গেঁথে রাখার মতো স্মৃতি উপহার দিয়ে বিদায় নিল ফুটবল। ক্রিকেট-পাগল দেশ ভারত। অথচ বিশ্বের নজরে ২০১৭ ছিল শুধুই ফুটবল। অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ সাফল্যের গান শুনিয়েছে। আবার কখনো সমানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জিতে মেসিকে স্পর্শ করেছেন রোনাল্ডো। ইজিপ্টের প্রথমবার বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করা। বা আইজল এফ সি-র আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়া। ২০১৭সালের পরতে পরতে সাজানো একটি করে গল্প।

ভারত ও অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ: ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসের স্বর্ণময় অধ্যায়। চারবছর আগে সেপ ব্লাটার ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এতদিন ধরে শুধু অপেক্ষা ছিল। কবে আসবে! কবে আসবে! অক্টোবরে অবশেষে এল। প্রথমবারের জন্য একটা আস্ত বিশ্বকাপ আয়োজন করল ভারত। এবং এর সাফল্যকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিতো পর্যন্ত স্বীকার করলেন।

একগুচ্ছ নজির তৈরি হলো এই বিশ্বকাপে। দর্শক উপস্থিতি ছিল এখনও পর্যন্ত সব বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতার থেকে বেশি। ১৯৮৫ সালে প্রথম অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ হয়েছিল নজির গড়ে। ১২ লক্ষ ৩০ হাজার ৯৭৬ জন এসেছিল মাঠ ভরিয়ে। ভারত সেই নজির ভেঙে ১৩ লক্ষ ৪৭ হাজার ১৪৩ জনের ইতিহাস গড়েছে। যা ছাপিয়ে গেছে ২০১১ সালে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপকেও। ছয় বছর আগে কলম্বিয়ায় খেলা দেখেছিল ১৩ লক্ষ ৯ হাজার ৯২৯জন। এবারের সংখ্যা তার থেকেও বেশি। ২০১৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে হওয়া বিশ্বকাপে গোল হয়েছিল ১৭২টি। এমনকী গোলের গড়েও এগিয়ে ২০১৭ অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ। ছয়টি স্টেডিয়ামে খেলা ৫২ম্যাচে গোল হয়েছে ১৭৭টি। ম্যাচ পিছু গড় ৩.৪০টি। ২০০৭সালে ষোলো দলের বদলে ২৪ দলে বিশ্বকাপ খেলা শুরু হয়। এই ফরম্যাটের প্রতিযোগিতায় যা সবথেকে বেশি।

আয়োজনের মতোই প্রতিযোগিতার মানও ছিল আশাতীত। ফাইনালের নব্বই মিনিটজুড়ে ইংল্যান্ড-স্পেনের সাত গোলের রোমাঞ্চ এখনো মনে লেগে। ম্যাচ শেষে এক নতুন চ্যাম্পিয়ন পেল ফুটবল বিশ্ব। বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদের মতো নামজাদা আকাদেমিতে তৈরি টেকনিক্যালি প্রশিক্ষিত ফুটবলারদের এক ধাক্কায় উড়িয়ে দিয়েছে ইংল্যান্ড। একটিও ম্যাচ না হেরে চ্যাম্পিয়ন। ইংল্যান্ডের ফিল ফোদেন, রিয়ান ব্রেস্টার ব্রাজিলের অ্যালান, স্পেনের ফেরান তোরেসদের উঠতি তারকা দিয়েছে ২০১৭ যুব বিশ্বকাপ।

ভারত শুধু দেখেনি। নিজেও ইতিহাস গড়েছে। হয়তো বা গ্রুপের একটিও ম্যাচ জিততে পারেনি। হয়তো বা নয় গোল খেয়েছে। বিশ্ব ফুটবলে পিছন সারির দেশ হয়েও প্রথম সারির দলগুলির সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়েছে। চিরকাল মনে রাখার মতো গোল করেছেন জিকসন সিং। ফিফা বিশ্বকাপে ভারতের প্রথম গোল। আসমুদ্র হিমাচলের গর্ব করার মতো গোল। ব্রাজিল-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল গুয়াহাটি থেকে কলকাতায় সরানোর ঘটনা বাদ দিলে পুরো প্রতিযোগিতাই ঘটেছে নিষ্কলুষভাবে।

র‌্যাঙ্কিংয়ে ঊর্ধ্বগমন: ফুটবলে নাকি ঘুমন্ত দৈত্য হলো ভারত। সেই দৈত্য যদিও আর ঘুমিয়ে নেই। জেগে উঠেছে। যদি নড়াচড়া এখনও বিশেষ কিছু করতে পারেনি। এখনও সেই স্থির। অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ কিছুটা সুড়সুড়ি দিয়েছে। বাকিটা করেছেন স্টিফেন কনস্টানটাইন। দ্বিতীয়বার দায়িত্ব পেয়ে সফল তিনি। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে একশোর সীমানা পেরিয়ে সোজা ৯৬তে শেষ করেছিলেন সুনীল ছেত্রীরা। যা গত দুই দশকের সেরা র‌্যাঙ্কিং। এর আগে ১৯৯৩সালের নভেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ৯৪তম স্থানে পৌঁছেছিল ভারত। এখানেও শেষ নয়। ভারতীয় ফুটবল দল টানা ১৩টি অপরাজিত থেকেছে। দুটি ড্র বাদ দিলে মোট ১১টি জয়।

মেসি-রোনাল্ডো দ্বৈরথ: এই দুই ফুটবল মহাতারকার দ্বৈরথ গত বছরও ছিল। এবছরও হয়েছে। নতুন বছরেও হবে। শুধু যত সময় গড়িয়েছে এই দুইয়ের ব্যক্তিগত সাফল্যের দ্বন্দ্ব ফুটবলকে ততটাই সমৃদ্ধ করেছে। ২০১৭ লিওনেল মেসির জন্য সুখকর ছিল না। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ছিলেন সব দিক থেকেই এগিয়ে। লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরোপিয়ান সুপার লিগ, স্প্যানিশ সুপার কাপ ও ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এক মরশুমে পাঁচটি ট্রফি জিতেছেন। মেসির ভাঁড়ার সেখানে ছিল শূন্যই। রোনাল্ডোর এই ট্রফি জয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যালন ডি’অর জয়ও। এতদিন বিশ্ব ফুটবলে একমাত্র লিওনেল মেসিই পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। ২০১৭তে পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জিতে মেসিকেও ছুঁয়ে ফেলেছেন। শুধু কী তাই! ফিফার বর্ষ সেরাও হয়েছেন পর্তুগীজ এই ফুটবলার।

মেসি হয়তো কোনও ট্রফি জিততে পারেননি। কিন্তু নিজের কাজ ঠিক চালিয়ে গিয়েছেন। বছর শেষে লা লিগা জয় পাকা করে এনেছেন। গোল পার্থক্যেও রোনাল্ডোর থেকে এগিয়ে রয়েছেন। এমনকি এল ক্লাসিকো জয়ের নজির পর্যন্ত গড়েছেন। এবছর হয়নি তো কি হয়েছে! পরের বছরে ট্রফি পাওয়ার পথ এখন থেকেই প্রশস্ত করে রাখলেন।

নেইমারের যাওয়া: চারবছর বার্সেলোনায় খেলার পর অবশেষে সম্পর্কে ছেদ টানেন নেইমার। নজির গড়ে স্পেন ছেড়ে প্যারিসে যান। ২০১৩ সালে স্যান্টোস থেকে ২৫ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে বার্সেলোনায় এসেছিলেন নেইমার। চারবছরে সেই অর্থের পরিমাণ বেড়ে হয় ২২২ মিলিয়ন ইউরো। যা করসহ প্রায় তিনশো মিলিয়ন বা তিরিশ কোটি ইউরোতে পৌঁছে যায়। ফুটবলের ইতিহাসে এইধরনের ট্রান্সফার বেনজির। নেইমারকে বার্সেলোনায় রেখে দেওয়ার জন্যই এই বিপুল অর্থ চাপানো হয় রিলিজ ক্লজ হিসাবে। কিন্তু প্যারিস স্যঁ জ্যঁ সব রেকর্ড ভেঙেই নেইমারকে নেওয়ার জন্য ঝাঁপায়। অবশেষে সওদা পাকাও করে। প্রিয় সতীর্থকে বার্সেলোনায় রেখে দেওয়ার চেষ্টায় কোনও খামতি ছিল না। জেরার্ড পিকে, থেকে সুয়ারেজ সকলেই চেয়েছিলেন নেইমার কাতালান ক্লাবেই খেলুন। সতীর্থরা চাইলেও, তিক্ততা বাড়তে থাকে ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে। এমনকি পালটা আইনি পথে যায় বার্সেলোনা। চুক্তি নবীকরণের জন্য নেইমারের বাবা যে বোনাস অর্থ পেতেন সেই তিন মিলিয়ন ইউরো আটকে দেওয়া হয়। কোনও কিছুতেই আটকানো সম্ভব হয়নি। নেইমারের এই যাওয়াকে কেউ বলেছিলেন, মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা। তো কেউ বলেছিলেন অর্থের লোভ। যাই হোক না কেন! প্যারিস স্যঁ জ্যঁতে নেইমার সফল। গোল এবং পয়েন্ট সবই উপহার দিয়ে চলেছেন।

আইজলের জয়: উত্তর-পূর্ব ভারতের দ্বিতীয় দল হিসাবে আই লিগ খেলেছিল আইজল। শিলঙ লাজঙ বহু বছর ধরে চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু সাফল্য আসেনি। মিজোরামের প্রথম ক্লাব হিসাবে আই লিগের যোগ্যতা পেয়েছিল আইজল এফ সি। আর প্রথমবারেই কেল্লাফতে। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, বেঙ্গালুরু এফ সি-র মতো শক্তিশালী দলগুলিকে পিছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হয় আইজল এফ সি। দীর্ঘদিন মুম্বাই এফ সি-র কোচিংয়ের দায়িত্ব সামলানোর পর প্রথমবার আইজলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন খালিদ। আইজলের মতো প্রথমবারই ভারত সেরা খালিদ জামিল।

চ্যাম্পিয়ন হলেও কিন্তু স্বস্তিতে ছিল না আইজল এফ সি। আই এস এল-কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আই লিগকে দ্বিতীয় শ্রেণির লিগে পরিণত করার চেষ্টা করে আই এম জি। পূর্ণ সহযোগিতা করে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনও। আই এস এল এবং আই লিগ-কে মিলিয়ে একটি লিগ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আই এস এলে আগে থেকেই ৮টি দল ছিল। ফলে আই লিগ থেকে মাত্র তিনটি দলকে সুযোগ দেওয়া হতো। তিনটি নতুন শহর থেকে তিনটি নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়া হতো। যার মধ্যে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান বা আইজল এফ সি-র সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে। এমনকি পনেরো কোটি রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হতো। আর তা হলে আই লিগ জয়ের কোনও কৃতিত্বই থাকতো না। ইতিহাস লেখার পরই মৃত্যু মুখে ঠেলে দেওয়া হতো। ক্লাবগুলির বিরোধিতার ফলে ২০১৭তে স্থগিত রাখা হয়েছে সে পরিকল্পনা। নতুন বছর সেই পরীক্ষা পাশ করে কিনা তাই দেখার।

ইজিপ্টের বিশ্বকাপ: সাতাশ বছর পর ফিফা বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেচে ইজিপ্ট। সমর্থকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছেন এই মুহূর্তটার। মহম্মদ সালে কঙ্গোর বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করতেই সব যেন স্পষ্ট হয়ে গেল। ১৯৯০ সালের পর ফের বিশ্বের আসরে খেলবে ইজিপ্ট।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement