বিরাট পঞ্জি

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ক্রিকেটের রকমারির মধ্যেও বিরাট কোহলির ক্যারিশমা বজায় ছিল। দলগত খেলায় ব্যক্তিগত মুনশিয়ানাকে বড় করে দেখানোর মানে নেই, তবুও যে কোনও দলকে টানতে যোগ্য একটা নেতা দরকার। সেটি দেখা গিয়েছে বিরাট কোহলির মধ্যে, নিজে স্বপ্নের ফর্মের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, যা ধরছেন সোনা হয়ে যাচ্ছে। ফেলে আসা বছরের হিসাবে বিরাটই যে সকলের থেকে এগিয়ে রইলেন। তথ্যগুলিকে একজায়গায় নিয়ে এলেন দীপঙ্কর ঘোষাল।

১। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক! নতুন এক বোলারের কাছে এর চেয়ে বড় পাওনা কি হতে পারে! ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে তৃতীয় বোলার হিসাবে একদিনের ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক করেন কুলদীপ যাদব। হাউসফুল ইডেন গার্ডেন্সে।

২। অধিনায়ক হিসাবে প্রথম আই সি সি-র টুর্নামেন্টে। রানার্স হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলিকে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল ভারত। ফাইনালের প্রতিপক্ষও পাকিস্তান। এবার পুনরাবৃত্তি হয়নি। পাকিস্তানের কাছে হারে ভারত। এর বিভিন্ন কারণের মধ্যে অন্যতম, জসপ্রীত বুমরার নো বল। ওপেনার ফকর জামানকে ৩ রানে আউট করেন জসপ্রীত বুমরা। ব্যাটসম্যান প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন। রিপ্লেতে দেখা গেলো বুমরা ‘নো বল’ করেছেন। ম্যাচ জেতানো শতরান করেছিলেন ফকর জামান।

৩। সারা বছর ফিক্সিং কিংবা অন্যান্য কারণে শিরোনামে এসেছে পাকিস্তান। এবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খবরের শিরোনামে। পাকিস্তান ক্রিকেটে নতুন জোয়ার এনেছে এই ট্রফি। এর চেয়েও ভালো কিছু অপেক্ষা করছিল। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পরই দীর্ঘদিন পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরলো পাকিস্তানে। আইসিসি স্বীকৃত প্রতিযোগিতায় অংশ নিলো বিশ্ব একাদশ ও পাকিস্তান জাতীয় দল। লাহোরের গদ্দাফি স্টেডিয়াম ফের আয়োজন করল আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

৪। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নাম শুনলেই অনেকেই ভ্রু কুঁচকান। দু- একটা চমক দেখানো ছাড়া সাফল্যের কোনও ধারাবাহিকতা নেই দলটির মধ্যে। ২০১৭ বাংলাদেশের সাফল্যের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো টেস্টের অন্যতম সফল দলকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এটাই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, বছরখানেক আগে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকেও হারিয়েছে বাংলাদেশ।



৫। বিশ্ব ক্রিকেট মানচিত্রে উজ্জ্বল এবার আফগানিস্তানও। এ বছরই টেস্ট স্বীকৃতি পেয়েছে তারা। ব্যক্তিগতভাবে নজর কেড়েছেন রশিদ খান। ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে এক ম্যাচে মাত্র ১৮ রান দিয়ে ৭ উইকেট নিয়েছেন রশিদ। আই পি এলের নিলামে এই লেগস্পিনারকে কোটি (৪ কোটি) টাকায় নেওয়া হয়েছে। রশিদের জন্য এই বছরটা স্মরণীয় হয়ে থাকলো। তেমনি আফগানিস্তানেরও।

৬। মহিলা বিশ্বকাপে রানার্স হয়েছে ভারতীয় দল। দলগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কিছু অনবদ্য পারফরম্যান্স রয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটারদের। সেমিফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচে ১৬৭ রানের মারকাটারি ইনিংস খেলেছেন হরমনপ্রীত কউর। এই টুর্নামেন্টেই একদিনের কেরিয়ারের ৬ হাজার রানের মাইলফলক পার করেছেন ভারত অধিনায়ক মিতালি রাজ। একদিনের ক্রিকেটে মহিলাদের মধ্যে মিতালিই সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

৭। ওয়েস্ট ক্রিকেটের পুরানো ঝলক দেখলো ক্রিকেট বিশ্ব। গত বছর পুরুষ ও মহিলা দুই বিভাগেই টি-২০ বিশ্বকাপ জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একধাক্কায় অনেকটা আত্মবিশ্বাস বেড়েছিল। ইংল্যান্ডের মাটিতে ইংল্যান্ডকে টেস্টে হারানো তারই ফল। হেডিংলেতে শেষ দিন ৩২২ রান তাড়া করে জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দলের জয়ে প্রধান ভূমিকা নেন শাই হোপ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জিতলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

৮। টি-২০ তে দ্রুততম শতরানকারী কে? নাম বলতে হবে দুজনের। এ বছরই টি-২০ তে ৩৫ বলে শতরান করেছেন দক্ষিণ ‌আফ্রিকার ক্রিকেটার ডেভিড মিলার। কয়েকদিন আগেই যুগ্মভাবে নজির গড়লেন রোহিত শর্মা। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে রোহিতও ৩৫ বলে শতরান করেছেন।

৯। শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে একদিনের সিরিজে শ্রীলঙ্কাকে হারালো জিম্বাবোয়ে। গত ৮ বছরে এই প্রথম বিদেশ সফরে জয়ের স্বাদ পেল জিম্বাবোয়ে। জুলাইতে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের একদিনের সিরিজে ৩-২ ব্যবধানে জয় পেল জিম্বাবোয়ে।

১০। বিশ্ব ক্রিকেটে ব্যাটসম্যান হিসেবে তুলনায় প্রথম তিনজন বিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথ এবং জো রুট। প্রথম দুজনের আগেই নেতৃত্বের অভিষেক হয়েছে। এ বছর ইংল্যান্ড টেস্ট দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন জো রুট। নেতা হিসেবে প্রথম অ্যাসেজ একেবারেই সুখকর হলো না রুটের। প্রথম তিন ম্যাচ হেরে সিরিজ আগেই হাতছাড়া।

১১। বিরাট কোহলি এবং তাঁর দলের জন্য স্মরণীয় বছর। ক্রিকেটের সব ফরম্যাটেই আধিপত্য দেখিয়েছে ভারতীয় দল। এমনকি কোহলিহীন ভারতীয় দলও অনবদ্য। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে একদিনের সিরিজে ২-১ এবং টি-২০ তে ৩-০’র জয় দিয়ে বছর শেষ করল রোহিত শর্মার নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দল। টেস্ট ক্রমতালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভারত। টি-২০ এবং একদিনের ক্রিকেটের ক্রমতালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ভারত।

টেস্টে আধিপত্য : গত বছরের শেষদিকে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডকে পাঁচ ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ৪-০ ব্যবধানে হারিয়েছে ভারত। বছরের শুরুতে ঘরের মাঠে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি টেস্ট খেলেন কোহলিরা। এবারই প্রথম দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে ভারতে আসা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। কিছুটা লড়াই করলেও এক নম্বর টেস্ট দলের কাছে ২০৮ রানে হারে বাংলাদেশ। গত বছরের শুরু থেকে কার্যত সকল ক্রিকেটপ্রেমীই অপেক্ষা করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ভারত সফর নিয়ে। চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচেই হারে ভারত। শুরুতে একতরফা সিরিজের প্রত্যাশা থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার এই জয় ভারতীয় শিবিরের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়। শেষ অবধি স্মিথবাহিনীকে ২-১ ব্যবধানে হারায় ভারতীয় দল। শুধু ফলাফলের ভিত্তিতেই নয়, সিরিজ জমে উঠেছিল মাঠের বাইরের লড়াই নিয়েও। ডি আর এস চাওয়ার আগে সাজঘরের দিকে তাঁকান স্মিথ। যা নিয়মবিরুদ্ধ। সাংবাদিক সম্মেলনে স্মিথকে প্রতারক বলতেও ছাড়েননি কোহলি। স্মিথ পরে জবাবে বলেন, সে সময় তাঁর মাথা কাজ করছিল না।

এরপর শ্রীলঙ্কায় তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। শ্রীলঙ্কাকে হেলায় হারায় ভারতীয় দল। ৩-০ ব্যবধানে জয়। সঙ্গে ইতিহাস। ১৯৬৭-৬৮-র পর এবারই প্রথম একটি অ্যাওয়ে সিরিজে তিনটি টেস্ট জেতার কৃতিত্ব দেখালো কোহলি বাহিনী। ঘরের মাঠে ফিরতি টেস্ট সিরিজে অবশ্য এত সহজ জয় পায়নি ভারত। প্রথম টেস্টে বৃষ্টির ধাক্কা। দ্বিতীয় টেস্টে জেতে ভারত। তৃতীয় টেস্টে দিল্লির ধোঁয়াশা ও পাটা পিচে সুবিধে করে উঠতে পারেনি ভারত। নিস্ফলা টেস্ট শেষে ১-০ তে সিরিজ জেতে ভারত।

শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে মুম্বাইতে টি-২০ ম্যাচ দিয়ে রেকর্ডের বছর শেষ করল ভারতীয় ক্রিকেট দল। সব ফরম্যাট মিলিয়ে এ বছর ৫৭টি ম্যাচ খেলেছে ভারতীয় দল। জিতেছে ৩৭টি, হার ১২টি, চারটি ম্যাচ অমীমাংসিত। ভারতীয় দলের এটাই এক বছরে সর্বোচ্চ জয়। ক্রিকেট ইতিহাসে দ্বিতীয় সেরা। ২০০৩ সালে এক বছরে ৩৮টি ম্যাচ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া।

বিরাটের সাফল্য : একদিনের ক্রিকেট দ্রুততম হিসাবে ৮ হাজার রানের মাইলফলক পার করেছিলেন। এবছর দ্রুততম ৯ হাজারও পার করলেন বিরাট কোহলি। আই পি এলে তাঁর সতীর্থ এবি ডিভিলিয়ার্সের দখলে ছিল এই নজির। এবি কে ছাপিয়ে মাত্র ১৯৪ ইনিংসে ৯হাজার রানের মাইলফলক পার করলেন কোহলি।

শতরানে পন্টিংকে ছাপিয়ে যাওয়া : একদিনের ক্রিকেটে শচীন তেন্ডুলকারের ৪৯টি শতরানের রেকর্ড কি ভাঙা যাবে! এতদিন অন্তত এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হতো। বিরাট কোহলির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বলছে, হয়তো শচীনের সংখ্যা ছাপিয়ে যাবেন কোহলি। এ বছর একদিনের ক্রিকেটে হাফডজন শতরান করেছেন কোহলি। সবমিলিয়ে সংখ্যাটা ৩২। শচীন তেন্ডুলকারের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শতরানকারী। এবারই ছাপিয়ে গিয়েছেন পন্টিংয়ের ৩১টি শতরান। ২০১৭ বর্ষে কোহলির মোট রান ২৮১৮। ব্যাটিং গড় ৬৮.৭৩। শতরানের সংখ্যা এগারো। একদিনের ক্রিকেটে শীর্ষস্থানে থেকেই বছর শেষ কোহলির। টেস্টে রয়েছেন দ্বিতীয় স্থানে। টি-২০ তে ক’দিন আগেই শীর্ষস্থানে হারিয়ে তিনে কোহলি। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টি-২০ সিরিজে বিশ্রামের কারণেই ক্রমতালিকায় পিছিয়েছেন।

২০১৭ সালে কোহলির প্রাপ্তি দুই রিস্ট স্পিনার যুযবেন্দ্র চাহাল-কুলদীপ যাদব। অশ্বিন-জাদেজার বিকল্প জুটি তৈরি। ২০১৭ সালে টেস্টে ভারতীয় দলের সাফল্যে অশ্বিন-জাদেজা জুটির বড় ভরসা রয়েছে। তেমনি একদিনের ক্রিকেটে চাহাল-কুলদীপ।

২০১৭ কোহলিদের পরিবারে অতীত। নজরে ২০১৮। অধিনায়ক কোহলির জীবনে সম্ভবত কঠিন বছর। শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। এরপর ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। সাফল্যের ধারা বজায় রাখাই চ্যালেঞ্জ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement