দাম নেই, হিমঘরে পড়ে আলু
ক্ষতিপূরণ চাইছেন আলুচাষি

অনন্ত সাঁতরা

৮ জানুয়ারী, ২০১৮

রাজ্য সরকারের নীতির ফলে হুগলী জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিবলয়ের ‌আলুচাষিরা আজ বিপন্ন। হিমঘরে থাকা আলুর আর কোন দাম নেই। লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। এদিকে তথাকথিত ‘মা মাটি মানুষের সরকার’ নির্বিকার। সরকারের এই উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ জেলার অগণিত আলুচাষি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর একটি ফরমান হুগলী জেলা তথা গোটা বাংলার আলুচাষ ও চাষির জীবনে চরম সর্বনাশ ডেকে এনেছে। এই চরম সত্য কথাটি আলুচাষি থেকে ব্যবসায়ী, আড়তদার ও হিমঘর মালিকদের মুখে মুখে ফিরছে।। তাই তাঁরা এই সঙ্কটের দিনে দুষছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অপরিণামদর্শী ফরমানকেই। এরাজ্যের আলু পাশের রাজ্যগুলিতে পাঠানো বন্ধ করতে মুখ্যমন্ত্রী সেদিন সীমান্ত সিল করিয়ে দিয়েছিলেন। দিনের পর দিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায় ট্রাকবোঝাই আলু পচে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। বাংলার আলুর রপ্তানি বন্ধ হওযায় এরাজ্যে আলুচাষিদের সংকট গভীর হয়।

হুগলী জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আলু । জেলার পুরশুড়া, তারকেশ্বর, হরিপাল ,সিঙ্গুর, ধনেখালি, জাঙ্গিপাড়া, আরামবাগ, খানাকুল, পান্ডুয়া, পোলবা–দাদপুর, চন্ডীতলা, মগরা ও বলাগড়-সহ সর্বত্রই আলুচাষ হয়। এই জেলায় আলু সংরক্ষণের জন্য প্রায় দেড়শো হিমঘর আছে। তারকেশ্বরের এক হিমঘর কর্মী জানালেন, এই ব্লক এলাকায় ১৫টি হিমঘর আছে। এখনও পর্যন্ত হিমঘরগুলিতে ৫, ১০, ২৫, ৩০এমনকি ৫০হাজারেরও বেশি বস্তা করে আলু রয়েছে। এই পরিমাণ আলু হিমঘর থেকে খালি হতে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি হয়ে যাবে। তিনি আরো জানালেন, গতবার জেলায় প্রচুর আলু উৎপাদন হয়। কিন্তু অন্য রাজ্যে আলু পাঠানো বন্ধের সরকারি নির্দেশ আমাদের রাজ্যের আলুচাষের বড় ক্ষতি করে দিলো। বাংলার আলু না পেয়ে বিহার , ওডিশা ও ঝাড়খন্ডের সরকার কৃষকদের ভরতুকি দিয়ে সেখানে আলুচাষ শুরু করে। ফলে তারা তাদের চাহিদা পুরণের লক্ষ্যে এগোচ্ছে। আসামেও এরাজ্যের আলু যেতো। প্রতি বছর তারকেশ্বর স্টেশন থেকে মালগাড়ি ভর্তি হয়ে ভিনরাজ্যে আলু যেতো। এখন সে সব প্রায় বন্ধ। অন্য রাজ্যে আলু না গেলে আমাদের রাজ্যের আলুর দাম মার খায়। এখন যা অবস্থা বাংলার আলু এরাজ্যের মানুষকেই খেতে হবে।

এরাজ্যে আলুর বড়ো মোকাম সিঙ্গুরের রতনপুর। প্রায় দেড়শো আড়ত আছে। জেলার বিভিন্ন হিমঘর থেকে এখানে আলু আসে। এরপর বাছাই হয়ে বস্তাবন্দী আলু ট্রাকে চলে যায় শহরতলি-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে। এখানকার এক আড়তদার কার্তিক দাস বললেন, এখন ফ্রি বন্ড ২০–৩০টাকা বস্তা। বহু কৃষক ও আলু ব্যবসায়ী এই জলের দরে আলু বিক্রি করতে হিমঘরের ধারে কাছে আসছেন না। নালিকুলের লালকার হিমঘরে এখনও ৫০হাজারের বেশি বস্তা আলু রয়েছে। কতদিনে হিমঘর খালি হবে তা নিয়ে হিমঘর মালিকরা আশঙ্কায় রয়েছেন। কিছু ক্ষুদ্র-প্রান্তিক কৃষক আলু নিয়ে গিয়ে রাস্তার ধারে বা পাড়ায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেচছেন। সিঙ্গুরের এক কৃষক রবীন ধাড়া রাস্তার ধারে আলু সাজিয়ে ‘সেল’ লিখে বিক্রি করছেন। তিনি জানালেন, এক বিঘা জমিতে আলু চাষে খরচ ১৮-২০হাজার টাকা । সেখানে হিমঘর ভাড়া ও পরিবহন খরচ ১০০টাকা। ১৫০টাকা বস্তা বেচে হাতে থাকছে মাত্র ৪০-৫০ টাকা। পুরশুড়ার আলুচাষি অসীম পাত্র জানালেন, রাজ্য সরকার খেলা-মেলা, উৎসব ও ক্লাবগুলিকে প্রতি বছর খয়রাতি দিচ্ছে। অথচ রাজ্যের হাজার হাজার আলুচাষি দাম না পেয়ে যখন সর্বস্বান্ত হওয়ার মুখে, সেই সময় হিমঘরের ভাড়া মুকুব করে সরকার তার আর্থিক দায়িত্বটুকু নিতে পারছে না। এই হলো কৃষকদরদী সরকার!

সঙ্কট মোকাবিলায় অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি তুলে হুগলী জেলা কৃষক সমিতির সম্পাদক ভক্তরাম পান বলেছেন, হিমঘরের ভাড়া মকুব করুক রাজ্য সরকার। পাশাপাশি মকুব করতে হবে কৃষিঋণ। নতুন চাষের জন্য কমসুদে ঋণ দিতে হবে কৃষকদের।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement