ভীম বাগদিদের জীবনের জন্য বীরভূমে নয়া অভিযান লালঝান্ডার

রণদীপ মিত্র

৮ জানুয়ারী, ২০১৮

সাঁইথিয়ার ভীম বাগদি। নেহাতই হতদরিদ্র কৃষক। দু-তিন কাঠা জমিই তাঁর দিন গুজরানের সম্বল। জমিটি রয়েছে আবার আর পাঁচজন কৃষকের জমির ঠিক মাঝখানে। ভীম বাগদি গেরোয় পড়েছেন এখানেই। কারণ পুঁজিতেই তাঁর টান। নিজে, স্ত্রী, ছেলেকে নিয়েই গতর দেন জমিতে। উদ্দেশ্য, চাষের খরচ কমানো। কিন্তু বাদ সেধেছে তাঁর জমির চারপাশে থাকা অন্যান্য জমিগুলি। সেগুলির মালিকরা তুলনায় সচ্ছল। তাই তাঁরা চাষ তুলে দিয়েছেন যন্ত্রের হাতে। বলদে টানা হাল তাঁরা ছেড়ে দিয়েছেন। আমদানি করেছেন ট্রাক্টর। আর তাতেই বেকায়দায় ভীম বাগদি। ঘরে বলদের হাল থাকা সত্বেও তা আর মাঠে নামাতে পারছেন না। কারণ যে জমিতে ট্রাক্টরে হাল দিতে লাগে একদিন, তো বলদে লাগে কম করে তিনদিন। ফলে পাশের জমিগুলির হাল ট্রাক্টরে করে দেওয়ার পর সেই জমি দিয়ে বলদ নিয়ে আর নিজের মাঠে যেতে পারেন না ভীম। অগত্যা বাধ্য হয়েছেন ট্রাক্টরের ভাড়া গুনতে।

বিষয়টা আপাতভাবে তুচ্ছ। কিন্তু এই তুচ্ছ বিষয়ই বিশাল ফারাক করে দিয়েছে ভীম বাগদির চুলো জ্বালানোর নিশ্চয়তায়। ফসলের দামের ফারাক হয় না খুব বেশি, কিন্তু নিজেদের গতর আর যন্ত্র দিয়ে চাষ করার খরচের ব্যবধান যথেষ্ট। অনিবার্য ফল, ভীম বাগদিদের মত কৃষকদের মরশুম শেষে শুধুই লোকসান। এমনই নানান ছোট ছোট জ্বলন্ত সমস্যায় ভুগছেন অগণিত কৃষক। দেখা যাচ্ছে এবছর খোলা বাজারে ধানের দাম চড়া। আপাতভাবে মনে হবে এবার হয়ত কৃষকের ঘরে শ্রী ফিরবে। কিন্তু অনেকেরই খেয়াল থাকে না যে, কৃষক মরে গিয়েছে আগেই। কারণ এবছর দাম চড়া হলে কি হবে, ফলন কমেছে চোখে পড়ার মতো। অনেক ছোট কৃষক আছেন যারা নিজেদের সামান্য জমির চাষাবাদ, ফসল তোলার কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে নেন, যাতে বাকি সময়টা অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে আয় কিছুটা বাড়তি করতে পারেন। বন্ধ সেই পথও। কারণ ফসল ফলার পর তা ঘরে তোলার জন্য জমির দখল নিয়েছে ধান ঝাড়াই মেশিন। দাম অনেক। ভাড়াও বেশি। কিন্তু ‘পারফরম্যান্স’ দারুণ। নগদের জোর আছে এমন জমির মালিকরা কি এই সুযোগ ছাড়বে ভীমদের মত একচিলতে কৃষকদের স্বার্থে ? কখনই নয়।

কৃষক জীবনে দিনদিন ঘনিয়ে আসা এইসব নানান খুঁটিনাটি সমস্যা আর জীবনযন্ত্রণা বুঝতে এবং তা সমাধানের দাবি নিয়ে এবার লালঝান্ডা পৌছবে বীরভূমের গ্রামে গ্রামে, বুথে বুথে। আগামী ৮থেকে ১০ই জানুয়ারি। কর্মসূচীর নাম ‘বুথে চলো অভিযান’। উদ্যোগ সি পি আই (এম)-র। কিন্তু উদ্যোগের বৃহদাংশই কৃষকের স্বার্থে। সি পি আই (এম) বীরভূম জেলা কমিটির সম্পাদক মনসা হাঁসদার কথায়, ‘বীরভূমের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৯শতাংশের বাস শহরে। বাকি বিপুল সংখ্যক মানুষ কিন্তু থাকেন গ্রামেই। যাদের জীবিকা অধিকাংশই কৃষিনির্ভর। জেলার মোট জনসংখ্যার ৭০শতাংশই কৃষিকাজ, খেতমজুরি বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল। তাই গ্রামপথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে থাকা এই বিশাল অংশের মানুষের জীবনের দৈনন্দিন জ্বলন্ত সমস্যার সাথে একাত্ম হয়ে সেই সমস্যা সমাধানের দাবিতে আন্দোলন তীব্র করার লক্ষ্যেই বুথ চলো অভিযান।’

সেই অভিযানের অংশ হিসাবে বুথে বুথে হবে লালঝান্ডা হাতে মিছিল। হবে সভা। হবে পাড়া বৈঠক। একদম কৃষকের উঠোনে বসে হবে মত বিনিময়। প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে জেলাজুড়ে। এব্যাপারে সারাভারত কৃষক সভার জেলা সম্পাদক অরূপ বাগের মত, ‘বুথে বুথে জর্জরিত মানুষদের জোটবদ্ধ না করতে পারলে সঙ্কট থেকে মুক্ত হতে পারবেন না দিনদরিদ্র মানুষগুলি। কারণ এই সঙ্কটমুক্তির ক্ষেত্রে যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, সেই পঞ্চায়েত তো আজ আর মানুষের নেই। গুটিকয়েক ‘মাতব্বরের’ পঞ্চায়েত হয়ে গিয়েছে। তাই ফেরাতে হবে সেই চেনা পঞ্চায়েত। অর্থাৎ মানুষের পঞ্চায়েত ফিরিয়ে দিতে হবে মানুষের হাতে। তবেই মানুষের জীবনে আসবে স্বাচ্ছন্দ্য। সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ভাবতে পারা যাবে বিকল্প পথ।’

উদাহরণ দেখিয়ে কৃষকসভা বলেছে, বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়েই মাঠে মাঠে আজ যন্ত্রের আধিক্য। তাতে বাধা দিতে গেলে পিছু হঠতে হবে। ভুল হয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে চাই বিকল্প ভাবনা। চাই বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আন্তরিক উদ্যোগ। যার কোনটাই তৃণমূলের নেতৃত্বাধীন পঞ্চায়েতের নেই। কারণ এখনকার পঞ্চায়েত চলছে একটিই লক্ষ্যে, ‘লুট, লুট, আর লুট’। তাই তো প্রয়োজন হয়েছে বুথে চলো অভিযানের। বুথ আগলানোর। বুথ রক্ষার। যাতে লুটের কান্ডারিরা যেন আর বুথের একচেটিয়া দখল না পায়।

Featured Posts

Advertisement