ডোভারলেন সঙ্গীত সম্মেলন

১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

বিগত বছরগুলির মতো এবছরেও ২২শে জানুয়ারি থেকে ২৫শে জানুয়ারি নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হলো ডোভারলেন সংগীত সম্মেলনের বর্ণময় বার্ষিক অনুষ্ঠান। প্রদীপ প্রজ্বলন করে এবারের সংগীত সম্মেলনের আনু্ষ্ঠানিক সূচনা করেছিলেন বেনারস ঘরানার বর্ষীয়ান কণ্ঠশিল্পী ছন্নুলাল মিশ্র। এ বছর তাঁকেই ডোভারলেন সংগীত সম্মাননা প্রদান করা হয়। প্রথমদিনের অনুষ্ঠান নিবেদিত ছিল প্রয়াত গিরিজা দেবীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হলো বেনারস ঘরানার ‘রাজেন্দ্রপ্রসন্ন’র সানাই বাদনের মধ্য দিয়ে। পরিবেশিত রাগ ইমন। প্রথম প্রহরের রাগ হিসাবে খুব সুনির্বাচিত। কিন্তু রাগ চলনে আরও স্পষ্ট স্বরের প্রয়োজন ছিল। বারবার গান্ধার আন্দোলন এবং মধ্যম স্পর্শে অনেক ক্ষেত্রে ইমনকল্যাণের ছায়া এসে পড়েছে। বিলম্বিত চলনে বিস্তার মধ্যমানের। বরং ছোট ছোট নিজস্ব কিছু কম্পোজিশন ভালো লেগেছে।

নবীন প্রজন্মের সরোদশিল্পী দেবাঞ্জন ভট্টাচার্যের ‘বাগেশ্রী কানাড়া’ বেশ সুর ঋদ্ধ পরিবেশন। পূর্বাঙ্গে বাগেশ্রীর এবং অবরোহণে কানাড়ার মতো গান্ধারের প্রয়োগ করে আলাপ পর্বেই রাগের রূপটি সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এরপর জোড় ও ঝালা। জোড়পর্বে স্বরবিস্তার ও তান ভালো হয়েছিল। নিয়ন্ত্রিত মিড়ের কাজ ও গমক ছিল পরিচ্ছন্ন। পরে একটি গৎ বাজান ত্রিতালে। সব মিলিয়ে উপভোগ্য অনুষ্ঠান। এরপর বেনারস ঘরানার ছন্নুলাল মিশ্রের গানে ছিল নানা বৈচিত্র। ঠুংরী, ভজন, কাজরী, চৈতি, দাদরা অনেক ধরনের গানেই তাঁর অনায়াস দখল। আসর শুরু হয়েছিল প্রায় আশ্রুত ‘হেমখেম’ রা‍‌গের একটি বিলম্বিত বন্দিশের মাধ্যমে। বহু ঐশ্বর্য ছড়িয়ে আছে তাঁর গানে। তবে বয়সোচিত কারণে কণ্ঠ অনেক ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেনি। তবে বেশ কিছু নকশা ছিল উপভোগ্য। এরপরে মঞ্চে এসে সেতারে নিজ সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখলেন ‘অনুপম ভকত’। পরিবেশিত রাগ ‘কৌশি কানাড়া’। আশাবরী ঠাঁটের এই রাগ পঞ্চমের প্রয়োগ এবং আন্দোলিত গান্ধার তাঁর বাদনে চমৎকার ফুটে উঠেছিল। ইমদাদখানি ঘরানার বৈশিষ্ট্যে, নিয়ন্ত্রিত মিড়, তদুপরি মন্ত্র ও মধ্য সপ্তকে রাগরূপটি তিনি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কয়েকটি লম্বা তান ও তালবাদ্যের বোঝাপড়া শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। অনুষ্ঠান শেষ করেন মিশ্র কাফিতে ধনু বাজিয়ে। এ‍‌দিনের কণ্ঠশিল্পী ‘শুভদা পারোদকর’ পরিবেশেন করলেন জয়জয়ন্তী, পারমেল প্রবেশক রাগ। পরিচ্ছন্ন ও বলিষ্ঠ কণ্ঠ। খাদের পঞ্চম ও মধ্য ঋষভে তাঁর স্বরসঙ্গতি শ্রোতারা দীর্ঘদিন স্মরণে রাখবেন। তিলওয়ারা তালে বিলম্বিত বন্দিশটি খুবই শ্রুতিসুখকর হয়ে উঠেছিল। বৈচিত্রপূর্ণ তানকর্তব ভালো লেগেছে। প্রথমদিনের শেষ অনুষ্ঠান ছিল রণু মজুমদারের বাঁশি এবং কাজরি গোপালনাথের স্যাক্সোফোন। পরিবেশিত রাগ নটভৈরব। সপ্তকের পূর্বভাগে নট এবং উত্তরভাগে ভৈরব। একটু মিড় প্রধান রাগ যা বাঁশিকে অনেকটাই মুড আনতে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। স্যাক্সোফোনের কাটা বাজনায় সেভাবে মিড় বা ‍‌গমক তুলে ধরা কঠিন। অত্যন্ত কঠিন এক অন্য ধরনের মেলবন্ধন। নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক।

দ্বিতীয়দিনের আসন শুরু হলো ‍ বিশিষ্ট সেতার‍‌শিল্পী সুব্রত রায়চৌধুরির স্মৃতির উদ্দেশ্যে। আসর শুরু ‘সুব্রত ট্রিনিটি’ অর্থাৎ ইন্দ্রজিৎ রায়চৌধুরি, মার্টিয়স ভোল্টার এবং জোনাসন মায়ার এই তিন শিল্পীর সেতার বাদনের মধ্য দিয়ে। পরিবেশিত রাগ বেহাগ। প্রথমে আলাপ-জোড়-ঝালা, পরে বিলম্বিত মধ্য ও দ্রুত তিনতালে গৎ। পরিচ্ছন্ন পরিবেশন এবং সুব্রত রায়চৌধুরির বাদনশৈলী অনেকটাই ধরে রেখেছেন। মন্ত্র সপ্তক থেকে মধ্য সপ্তকে বৈচিত্রপূর্ণ স্বর সঞ্চালনা। দ্রুত অংশে ঝালার মধ্যে গমকের কিছু কাজ আকর্ষণীয়। এরপর মঞ্চে এসে খেয়ালে মাতিয়ে দিলেন আগ্রা ঘরানার ওয়াসিম আহমেদ খান। খুব শ্রুতিমধুর কণ্ঠ। জয়জয়ন্তীতে বিলম্বিত এবং দ্রুত বন্দিশ। আগ্রা ঘরানার পুরানো বৈশিষ্ট্য অনুসারে খুব সুন্দরভাবে ‘নোমতোম’ গাইলেন আলাপপর্বে। অবরোহণে কোমল গান্ধার ও নিষাদের বৈচিত্রপূর্ণ স্বর প্রয়োগে চমৎকার রাগের মেজাজ তৈরি করেছিলেন। কিছু ভাল বোলতান তিনি শ্রোতাদের মনে গেঁথে দিয়েছেন। পরের শিল্পী হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার বাঁশি শ্রোতাদের আবিষ্ট করেছে। খুব পরিমিত বাদন। পরিবেশিত রাগ ‘যোগকোষ’। রেখার বর্জিত ষাড়ব-ষাড়ব জা‍‌তির এই রাগটি তাঁর বাদনশৈলীতে বর্ণময় হয়ে উঠেছিল। ছোট ছোট কাজ, মিড়, গমকে পূর্ণতা পেয়েছিল। পরে বাজালেন দুর্গা এবং পাহাড়ী ধুন। সবকটি শ্রুতিনন্দন ও মনোজ্ঞ পরিবেশন। আসর শেষ করেন ‘বৈষ্ণবজন তো’। ভজনটি বাজিয়ে। এদিনের শেষ অনুষ্ঠান ছিল পিতাপুত্রের বেহালাবাদন এল সুব্রহ্মণ্যম এবং পুত্র অম্বি সুব্রহ্মণ্যম। পিতা ভারত বরেণ্য দক্ষিণী বেহালাবাদক হলে পুত্র অম্বি এখনও পরিপূর্ণ প্রস্তুত বলে মনে হলো না। তাঁর দক্ষিণীরাগ ‘সন্মুখপ্রিয়া’ খুব পরিচ্ছন্ন উপস্থাপিত হয়নি। অত্যন্ত উচ্চকিত ছিল মৃদঙ্গে আওয়াজ। পরে পিতা এল সুব্রহ্মণ্যম আদি তালে রাগ কম্বোজি বাজিয়ে নিজ সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখেন।

তৃতীয়দিনের আসর চিহ্নিত ছিল প্রয়াত কিশোরী আমানকরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। সরোদ পার্থসারথি আসর শুরু করলেন। তাঁর বিস্তার, নিয়ন্ত্রিত মিড়ের কাজ এবং ছোটখাট নকশা করে তানের উপস্থাপনা শ্রোতাদের ভালো লেগেছে। দ্বিতীয় শিল্পী রঘুনন্দন পানসিকরের কণ্ঠটি সুরেলা ও জোয়ারী সমৃদ্ধ। পরিবেশিত রাগ মালকোষ। প্রথমে বিলম্বিত এবং পরে মধ্যলয়। বিলম্বিত বিস্তারে বারবার একই পদ একই চলনে ঘোরাফেরায় একটু একঘেয়েমি এসে গিয়েছিল পরে অবশ্য দ্রুত সরগম ও বোলতান গেয়ে আসর জমিয়ে দেন। তবে আরও ছিমছাম হলে মালকোষ আরও মনোহারী হতো। পরের শিল্পী জ্যোতি হেগড়ে বাজালেন রুদ্রবীণা, ভারী জলদ আওয়াজ, তবে কিছু তার বাদনকালে সুর থেকে সরে গিয়েছিল বলে মনে হয়। চৈতালে ধ্রুপদীচা‍‌লে বাজালেন চন্দ্রষোষ, কিন্তু উত্তরাঙ্গ প্রধান এই রাগটির প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। একটু আড়ষ্টতা ছিল। তুলনামূলকভাবে পরবর্তী পরিবেশন দরবারী কানাড়া অনেক উন্নত নিবেদন। মন্ত্র ও মধ্য সপ্তকে বিস্তার খুব উচ্চমানের না হলেও আশাপ্রদ। পরের কণ্ঠশিল্পী রসিদ খান আসর শুরু করলেন রাগ ‘গোরখ কল্যাণে’র মধ্য দিয়ে।

শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতির মিড় ও গমক প্রধান গান্ধার ও পঞ্চম বর্জিত রাগ। ভারী চমৎকার রাগের প্রস্তার করেছেন। সরগমের নকশা এবং বড় পাল্লার বোলতান ছিল শ্রুতিসুখকর। বিলম্বিত পর্বে ছোট ছোট সরগম ও আকার তান ছিল চিত্তাকর্ষক, এবারও শ্রোতাদের পছন্দের ‘ইয়াদপিয়া কি আয়ে’ গাইলেন নিজস্বতায়। শ্রোতারা তৃপ্ত। তৃতীয়দিনের শেষ অনুষ্ঠান ছিল শাহিদ পরভেজ এবং পুত্র শাকির খানের সেতার। শাকির খুব যত্ন করে বাজালেন চারুকেশি, আলাপের সঞ্চারী অংশে রাগের মেজাজ চমৎকার ফুটে উঠেছিল। ছোট জোড়টির কাঠামোগত দৃঢ়তা ও মিড়ের ব্যবহার শ্রোতাদের ভালো লেগেছে। পরে শেষরাত্রে শাহিদ পারভেজ বাজালেন টোড়ি। আলাপ পর্বেই নিজস্ব ভঙ্গিমায় স্বরসঙ্গতি এবং মিড়ের মাধ্যমে আসর জমিয়ে দেন। জোড় ও ঝালা ছিল তুলনাহীন। ভালো লেগেছে সুপরিকল্পিত বিস্তার, এবং সরগমের নকশা।

শেষদিনের আসর শুরু হয় তরুণ ভট্টাচার্যের সন্তুর এবং মাইসোর এম মঞ্জুনাথের দক্ষিণী ভায়োলিনের মধ্য দিয়ে। পরিবেশিত রাগ কিরতয়ানি। সন্তুরে আলাপ একটু অস্ফুট থাকে কিন্তু ভায়োলিনের সুর মূর্ছনায় এই ত্রুটি ধরা প‍‌ড়েনি। জোড় ও ঝালা পর্বে সন্তুর চমৎকার। মন্ত্র ও তার সপ্তকে কিছু ছোট তান ও সূক্ষ্ম কারুকাজ শ্রোতাদের বাহবা পেয়েছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে শিল্পীদ্বয়ের বোঝাপড়া; তবলা ও মৃদঙ্গের সঙ্গে খুব উপভোগ্য হয়েছিল এই অনুষ্ঠান। পরের শিল্পী গৌরী পাথারে খেয়াল শোনালেন ‘নন্দ’ রাগে। ষাড়ব-ষাড়ব জাতির মিশ্র রাগ। পূর্বাঙ্গ প্রধান এবং মধ্য সপ্তকে কাজ বেশি। খুব খোলামেলা গলা। কণ্ঠের মিষ্টতা থাকলেও ধ্রুপদীভাব আছে। শ্রুতিসুখকর পরিবেশন। পরের শিল্পী বসন্ত কাবরা সরোদে বাজালেন কৌশিক কানাড়া। আলাপ জোড় ঝালা পরিচ্ছন্ন পরিবেশন। পূর্বাঙ্গে বাগেশ্রী এবং উত্তরাঙ্গে মালকোষের মোহিতরূপ ফুটে উঠল তাঁর বাদনে। জোড়পর্বেও ছোট ছোট কাজ ও লম্বা তানে মুগ্ধ করেছেন। এরপর ছোট করে পেশ করেন থাম খাম্বোজ। এরপর মঞ্চে এসে নিজ কণ্ঠের ঐশ্বর্যে আসর মাতিয়ে দিলেন পারভিন সুলতানা। পরিবেশিত রাগ-যোগ। বিলম্বিত একতালের বন্দিশে শিল্পীর বিস্তার সুরেলা পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছিল। ছোট ছোট ছন্দের নকশা ও দুনি সরগমের কাজ এদিনের অন্যতম প্রাপ্তি। তিন সপ্তাহ জুড়ে অনায়াস তাঁর কণ্ঠ। ফলত তানকারি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। এরপর তিনতালে বসন্ত। পূর্বঠাটের সম্পূর্ণ জাতির রাগ প্রাণস্পর্শী হয়ে উঠেছিল কণ্ঠলাবণ্যে। এরপর হংসধ্বনি রাগে তারানা গেয়ে তিনি আসর শেষ করেন। পরবর্তী শিল্পী বিশ্বমোহন ভাট এবং পুত্র সলিল ভাট মোহনবীণায় পরিবেশন করেন নটভৈরব। কোমল বৈবত থেকে মিড় দিয়ে এমনভাবে মধ্যম গান্ধার স্পর্শ করে ঋষভে এসেছেন যা শ্রোতাদের আবিষ্ট করেছে। আলাপ পর্ব থেকেই চমৎকার রাগরূপ প্রস্তার করেছেন। তান এবং সরগম, বিস্তার ছিল নান্দনিক, নিঃসন্দেহে ভালোলাগার উপকরণ ছিল পিতাপুত্রের পরম্পরার মধ্যে। এবার ডোভার লেন শেষ হলো যশরাজের ‘ললিত’ রাগ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। অত্যন্ত সুরেলা স্নিগ্ধ কণ্ঠ। তদুপরি রাগরূপের স্পর্শ বোধ, পরিমিত তান, বিস্তার, অলংকার তাঁকে অনন্যতা দান করেছে। প্রথমে বিলম্বিত ঝাঁপতাল, পরে মধ্যলয় ত্রিতালে দুটি বন্দিশ। তবে বয়স অনেক ক্ষেত্রে তাঁর দমের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পীদের বিভিন্ন দিনে হারমোনিয়াম, তালবাদ্যে যোগ্য সঙ্গত করেছেন—জ্যোতি গোহ, সনাতন গোস্বামী, হিরন্ময় মিত্র, মুরাদ আলি, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, সমর সাহা, সাবির খাঁ, শুভম চট্টোপাধ্যায়, তন্ময় বোস, অভিজিৎ ব্যানার্জি, অরূপ চ্যাটার্জি প্রমুখেরা। নবীন ‍‌ও প্রবীণের সমন্বয়ে এবারের অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে শ্রোতাদের তৃপ্তি দিয়েছে।

*সুরেন মুখোপাধ্যায়*

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement