ভারত আবিষ্কার-এর আঁতুড়ঘর

অমৃতকুমার দাস

১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

১৯৪২ সালে ৮ই আগস্ট গান্ধীজী তদানীন্তন বোম্বাই শহরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ডাকা এক জনসভাতে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের আহ্বান দিলেন। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলছে, ইংরেজরা যুদ্ধ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। তাই ঐ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশের সর্বত্র জাতীয় কংগ্রেসের উল্লেখযোগ্য সব নেতাদের বিনা বিচারে আটক করা হলো। তাদের মধ্যে জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই পটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদসহ আরও অনেক নেতাকে মহারাষ্ট্রের আহমদনগর ফোর্টের ভিতর আটক রাখা হয়। এই ফোর্ট তখন ব্রিটিশ সেনার এক বড় ঘাঁটি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ভারতীয়দের জন্য বন্দিশালা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় দেশ-বিদেশের সমস্তরকম রাজনৈতিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঐ সব নেতাদের ওখানে আটক থাকতে হয়েছিল। তাঁরা তখন সেই সময়কে পডাশোনা আর লেখালেখিতে কাজে লাগাতেন। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ওই ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে তাঁর বিশ্ব-বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Discovery of India’ লেখেন। তদানীন্তন ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, ইত্যাদির এক বিরাট দলিল হিসাবে সমগ্র বিশ্বে এই গ্রন্থটি এখনো গৃহীত হয়। আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই দুর্গটির পরিচয় হলো এটি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ‘Discovery of India’ (‘ভারত আবিষ্কার’)-এর জন্মস্থান। আহমদনগর শহরের কথা বলতে গেলেই এই ইতিহাস সবার আগে চলে আছে।

নিজাম-শাহী বংশের প্রথম সুলতান মালিক আহমদ নিজাম-শাহ মহারাষ্ট্রের এই অঞ্চলে তাঁর প্রতিপত্তি বজায় রাখতে ১৪২৭ সালে মাটির প্রাচীর দিয়ে এই ফোর্ট তৈরি করেন। ফোর্টের ভিতরেই সেনা মোতায়েন সহ ছো‍‌ট একটা নগর পত্তন করেন। এই প্রতিষ্ঠাতা সুলতানের নাম অনুসারেই এই ফোর্টের এবং নগরের নামকরণ হয়। তবে স্থানীয় মানুষ এই ফোর্টকে ‘ভূইকট কেল্লা’ বলে। ১৫৫৯ থেকে ১৫৬২ সালের মধ্যে হুসেইন নিজাম-শাহ এর সংস্কার করে পাথরের দুর্গ-প্রাকার দিয়ে এটিকে আরও সুরক্ষিত করে তোলেন। একাধিকবার মুঘল আক্রমণ থেকে এই দুর্গকে রক্ষা করতে পারলেও ১৬০০ সালে সম্রাট আকবরের দখল নিতে সক্ষম হন। তারপর শতাধিক বর মুঘলদের দখলে থাকলেও ১৭২৪ সালে আবার নিজামরা এর দখল নেয়। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শেষ জীবনের বেশ কয়েক বছর এখানে কাটে এবং ১৭০৭ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয় এখানেই। ১৮০৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজ এই দুর্গটি দখল করে। তারা এখানে ব্রিটিশ সৈন্যের একটি বড় ঘাঁটি ও স্বাধীনতা আন্দোল‍‌নের কর্মীদের বন্দিশালা হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেনা বিভাগের হাতে এই ফোর্ট থাকলেও এখানে সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় সংগ্রহশালা তৈরি করা হয়েছে। সকাল ০৯-৩০ থেকে বিকাল ০৫-০০ পর্যন্ত প্রতিদিন খোলা থাকে এই সংগ্রহশালা। বহু ইতিহাসের ধারক হয়েও প্রায় ৬০০ বছরের পুরানো এই আহমাদনগর ফোর্ট আজ বিলুপ্তপ্রায় ভগ্নদশা নিয়ে কোনোরকমে অস্তিত্ব রক্ষা করে আছে। তবে আরও উন্নত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও অনেক আগে থেকেই নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।

আহমাদনগরের প্রায় মাঝে অবস্থিত এই দুর্গ। এছাড়াও দেখার মতো আরও অনেক কিছু আছে আহমাদনগরে। আছে ‘বিশাল গণেশ মন্দির’, সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুস্থান ‘আলমগীর’, ‘চাঁদবিবি-মহল’, ‘মূলাড্যাম্‌’, ‘আনন্দ্‌ধাম’ ইত্যাদি। পাহাড় ঘেরা মূলা-ড্যামর প্রাকৃতিক পরিবেশ অতি মনোরম। এই ড্যামের স্থানীয় নাম ‘ধ্যানেশ্বর-সাগর’। এই ড্যামের ধারে একটি সুন্দর রিসর্ট আছে। শহরের উপকণ্ঠেই সেনা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে সবুজজেভরা এক উাদ্যানে ভারতের একমাত্র ট্যাস্ক-মিউজিয়ামটি একান্তই দর্শনীয়। এখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত টায়ার-টিউব লাগানো চাকার ট্যাঙ্কসহ বিভিন্ন উন্নততর ট্যাঙ্কের ক্রমবিকাশের নিদর্শনসহ অত্যাধুনিক ট্যাঙ্ক দেখতে পাওয়া যাবে। আরও ৩৫ কিমি মতো ঔরঙ্গাবাদের দিকে গিয়ে আছে ‘শনি-শিংগ্‌নাপুর মন্দির’। সাড়ে-পাঁচ ফুট উচ্চতার কালো পাথরের শনি-মহারাজের মূর্তির মাথায় নিরবচ্ছিন্ন ধারায় তেলের স্রোত ঝরছে। প্রতিদিন এখানে ৩০ থেকে ৪০ হাজার দর্শনার্থী আসে তবে অমাবস্যায় সংখ্যাটা অনেক বেশি হয়।

‘চাঁদবিবি মহল’ নগর থেকে প্রায় ১৩ কিমি দূরে ৩০০০ ফুট উঁচু এক পাহাড়ের চুড়ার উপর অবস্থিত। এই স্মৃতিসৌধের নাম চাঁদবিবির নামে হলেও এটি সুলতানখান-২-এর সমাধি। কথিত আছে তিনি ছিলেন মুর্তজা নিজাম-শাহের অত্যন্ত তুখোর বুদ্ধিসম্পন্ন ও বিশ্বস্ত মন্ত্রী। তাঁর স্মৃতিতে নিজামের রানি চাঁদবিবির উদ্যোগে এই সৌধটি নির্মাণ হয়। পাহাড়ের চুড়ার উপর এর অবস্থান অত্যন্ত মনোরম। সরকারি উদ্যোগে এর দুই পাশে পাহাড়ের উপর অনেকগুলি উইন্ডমিল বসানো হয়েছে। আহমাদনগর থেকে ৮৫ কিমি উত্তরে শিরডিতে শ্রী সাঁইবাবার মন্দির। এখানে নিয়মিত বহু ভক্তর সমাগম হয়।

‘Discovery of India’ (‘ভারত আবিষ্কার’)-এর আঁতুড়ঘর দেখতে গেলে তার পাশাপাশি আরও কিছু ইতিহাস, ধর্মীয়‌ স্থান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও শিল্প উপরি পাওনা হতে পারে।

ঠিকানা: ২০১, স্তবক অ‌্যাপার্টমেন্ট, কোর্টমোড়, আসানসোল-৭১৩৩০৪, জেলা-পশ্চিম বর্ধমান, মোবাইল: ৯৪৩৪১৪৭৪৫৩

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement