একুশে : অতীত থেকে ভবিষ্যৎ

পবিত্র সরকার

১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

‘ফেব্রুয়ারি’ বলার দরকার হয় না, ‘একুশে’ বলাই যেন যথেষ্ট। ‘একুশে পদক’, ‘একুশে বইমেলা’, ‘একুশের শহীদ’, ‘একুশের দিনগুলি’। ‘একুশে’ কথাটা আর কোনও এক খ্রিস্টীয় অব্দের কোনও মাসের কোনও তারিখ বোঝায় না। কথাটা উচ্চারিত হলেই একটি আবেগঘন স্মৃতি, একটি জাতির রক্তাক্ত প্রতিবাদের ধারাবাহিকতা, এক স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ওই তারিখটির স্বীকৃতি— পর পর এই ক্রমিক চিত্রনাট্য আমাদের সামনে খুলে যায়। অবশ্যই ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯শে মে তারিখটিরও এক বিরল মহত্ব আছে, আছে আমাদের শোকপালন ও শ্রদ্ধার উপর তার দাবি। দক্ষিণ ভারতেও তেলুগু আর তামিলভাষীদের ভাষা-জাতীয়তার লড়াইয়ে বিচ্ছিন্ন আত্মদানের ইতিহাস আছে। তবু একুশে ফেব্রুয়ারি এখন এক আন্তর্জাতিক প্রতীক ও উদ্‌যাপনের দিন। যতদূর জানি, এই উপমহাদেশের বুক থেকে আর কোনোদিন সেভাবে চিহ্নিত হয়নি। ইতিহাস নিয়ে এ লেখায় আমরা কথা বলবো না, কারণ তা হবে পরিচিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি। আমরা বলবো বর্তমানের কথা, ভবিষ্যতের কথা।

এটা ভাষা নিয়ে আত্মোৎসর্গের দুই বা তার বেশি দিনের মধ্যে কোনও প্রতিযোগিতার প্রশ্ন নয়। ভাষা, স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের লড়াইয়ে যেখানে যেটুকু জয় অর্জিত হয়েছে তা সমস্ত মানুষের হয়ে জয়, তাতে সমস্ত মানুষের সংগ্রাম মহিমান্বিত হয়। একুশে ফেব্রুয়ারিও তাই মানুষের নিজের ভাষার অধিকারের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতির দ্বারা চিহ্নিত। এই অধিকারের অনেকগুলি দিক আছে। এক এবং একেবারে প্রাথমিক হলো এই ভাষায় কথা বলার অধিকার। ‘কথা বলা’ কথাটারও নানা অর্থ আছে। ‘কথা বলা’ শুধু নিজের সমাজে নিজের প্রতিবেশে নিজভাষী মানুষের মধ্যে কথা বলা নয়, যদি রাষ্ট্রের ভাষা ভিন্ন হয়, তবু আমার নিজের ভাষাতেই আমি রাষ্ট্রকে আমার কথা শোনাব, রাষ্ট্রকে অনুবাদ করেই হোক, বা আমার ভাষা জেনেই হোক, আমার কথা শুনতে হবে। এমনকি পৃথিবীর সর্বোচ্চ মানব-সংগঠন রাষ্ট্রসঙ্ঘকেও আমার ভাষায় আমার কথা শুনতে হবে। সবাই শোনে কি না জানি না, কিন্তু তা আমার মানবিক অধিকারের অঙ্গ। আমি যে মানুষ, তার প্রমাণ আমি একটি ভাষায় বলতে পারি, সে ভাষা যেমনই হোক। আমার এই ভাষা মানুষের ভাষা, তাই মানুষের অস্তিত্বের সর্বত্র আমার ভাষা স্বীকৃত হবে। প্রয়োজন হলে সব মানুষকে আমার ভাষায় পৌঁছাতে হবে, আমার কথা শুনতে হবে।

আমরা ভাবতেই পারি, কথা বলার অধিকার কার নেই, নিজেদের মধ্যে কথায় বাগড়া দিতে যাচ্ছে কে? কিন্তু একটু যেন ভেবে দেখি আমাদের কথা বলার পরিবেশগুলি কীরকম। আমরা যেখানে কথা বলি সেখানে প্রায়ই অন্যরা থাকে। এই অন্যরা হয়তো শাসক, বা বৃহত্তর ভাষাগোষ্ঠী (যেখানে আমরা ভাষা-সংখ্যালঘু) বা অন্যভাবে আমাদের উপর আধিপত্য করে। কিংবা আমাদের ছোট ভাষা হয়তো সাহিত্যসমৃদ্ধ নয় বলে তারা আমাদের ভাষাকে একটু তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তাই তারা অনেক সময় আমাদের কথা বলার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে চায় না। যেমন ১৯৬০-এর বছরগুলি পর্যন্ত আমেরিকায় যেসব স্কুলে সাদা আর কালোদের একসঙ্গে পড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল (আগে তাদের আলাদা স্কুলে পড়তে হতো), সেগুলিতে কালো ছেলেরা তাদের নিজেদের ইংরেজিতে— যার নাম Black English Ve

acular বা BEV— কথা বললেই কোনও-কোনও সাদা শিক্ষক ধমকে উঠতেন। ‘এই! কী হচ্ছে, শুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বল্‌!’ ব্যাস, তাতেই মন্ত্রের ম‍‌তো কাজ হতো, কালো ছেলে বা মেয়েরা একদম চুপ করে যেত। পরে কোনও শিক্ষকের কোনও প্রশ্নেই তারা আর মুখ খুলতে চাইত না। কারণ তারা তো সাদা মধ্যবিত্তের প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজি শেখেনি, তারা কী করে সে ভাষায় কথা বলবে? তখন সাদা শিক্ষকেরা ধরেই নিতেন যে, প্রশ্নের উত্তর যখন দিচ্ছে না, মুখ বুজে থাকছে— তখন এরা বোকা, আদতে উত্তরটাই জানে না। ফলে শিক্ষাপ্রশাসনে এই ধারণাটাই চালু হয়ে গিয়েছিল যে, কালো ছেলেমেয়েরা সাদা ছেলেমেয়েদের তুলনায় নিম্ন মেধাসম্পন্ন।

আমরা এই উপমহাদেশেও এই ধরনের ঘটনা সমান্তরাল ঘটনা দেখিনি বা শুনিনি তা নয়। একবার (২০০১ সালে) এই লেখক সাঁওতালি ভাষা অলচিকি লিপিতে লেখা হবে কিনা তার কমিশনের অধ্যক্ষ হিসেবে হুগলীর এক গ্রামে একটি প্রাথমিক স্কুলে গিয়েছিল। সেখানে বেশ কিছু সাঁওতালের বসবাস, কিন্তু তাঁদের ছেলেমেয়েরা বাংলা স্কুলে বাংলার মধ্য দিয়েই পড়ে। আমরা হেডমাস্টার মশাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি সাঁওতাল মেলেমেয়েদের ক্লাসের বাইরে নিজেদের ভাষায় কথা বলতে দেন তো?’ তিনি একটু রসিকতা করে বললেন, ‘হ্যাঁ, দিই বইকি! তবে আমি যখন ওরা ওদের ভাষায় ওদের মধ্যে কথা বলে তখন জিজ্ঞেস করি, কী রে, তোরা আমাকে গালাগাল দিচ্ছিস না তো?’

ভাবুন একবার ব্যাপারটা! হয়তো এরকম হেডমাস্টার বা শিক্ষক খুব বেশি নেই। কিন্তু তবু তাঁর এই প্রশ্নের পর সাঁওতাল ছেলেমেয়েরা কি স্কুলে আর নিজেদের মধ্যেও তাদের ভাষায় কথা বলতে সাহস করবে? এখানে বলে রাখি, ‘অলচিকি’ একটা লিপি, ভাষা নয়, ভাষাটা আসলে সাঁওতালি। কাজেই ‘অলচিকি’ ভাষা বলে কোনও ভাষা নেই, যেমন গুরুমুখি হলো লিপি, ভাষাটা পাঞ্জাবি। কিন্তু আসল কথাটা হলো, কথা বলার গণতান্ত্রিক অধিকারের আর একটা জায়গা হলো আমার শিক্ষায় আমার ভাষাটার ব্যবহার করার অধিকার। ক্লাসঘরে আমার নিজের ভাষায়, এমনকি উপভাষায় প্রশ্ন করার, উত্তর দেওয়ার অধিকার।

পশ্চিমবঙ্গে আর বাংলাদেশেও শুনেছি, ‘শুদ্ধ ভাষা’ বলতে পারে না বলে অনেক শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের বকুনি দেন। আবার এটাও ঘটনা যে, অনেক শিক্ষক নিজেরাও ‘শুদ্ধ ভাষা’ বলতে পারেন না। এখানে আবার একটা কথাসূত্রে মন্তব্য করি যে, ভাষাবিজ্ঞানে ভাষার কোনও নৈতিক মূল্য, অর্থাৎ একটা শুদ্ধ ভাষা, আর— একটা ‘অশুদ্ধ’ ভাষা— এই তফাৎ স্বীকার করে না। ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ভাষা প্রমিত নয় বলেই ‘অশুদ্ধ’ হয়ে যায় না, উপভাষাও অশুদ্ধ নয়। বিজ্ঞানের কাছে সব ভাষা বা উপভাষাই মর্যাদার দিক থেকে সমান, যেহেতু তারা সম্ভাবনার দিক থেকে সমান। একটা ভাষা বা উপভাষা তথাকথিত ‘উন্নত’ বা ‘সমৃদ্ধ’ হয় নেহাতই কতকগুলি ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, সেই যোগাযোগ অন্য ভাষা বা উপভাষার ক্ষেত্রে ঘটলে তাও সমান উন্নত হতে পারত। যে সব ছাত্রছাত্রী মান্য বা প্রমিত ভাষা বলতে পারে না, তাদের নিজেদের ভাষা সম্বন্ধে অবজ্ঞা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের অধিকার শিক্ষকের নেই— তাঁর নিজের ভাষা ‘শুদ্ধ’ কি না সে প্রশ্ন না হয় না তুললাম। ওই কাজটি যেই করলাম, শিশুর মনে তার ঘরের ভাষা (তার প্রথম ভাষা) সম্বন্ধে একটা হীনমন্যতার বোধ তৈরি করে দিলাম। সে তখন সেটা লুকোতে চাইবে, চুপ করে যেতে চাইবে— সেই কালো ছেলেমেয়েদের মতো। সে তখন বোকা বলে চিহ্নিত হবে। এটা তার অপরাধ নয়, আমাদের অপরাধ।

কারণ, আমরা কখনও তাকে বলিনি যে, তার জন্মভাষায় যদি তার সবটা পড়ার ব্যবস্থা না করতে পারি, তবে অন্তত তাকে বলতে পারি যে, ক্লাসে তার ভাষায় বা উপভাষায় সে প্রশ্ন করতেই পারে, উত্তর দিতেই পারে। তার ঘরের ভাষা নিয়ে তার লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই, আমরা নিজেরাও যেন তার নিজের ভাষা-উপভাষাকে তার কাছে লজ্জিত করে তোলার দায়িত্ব না নিই। তার পরে তাকে বোঝাতে হবে যে, তার ভাষা উপভাষাকে আমরা এই শিক্ষাব্যবস্থায় কিছুটা গ্রহণ করতে পেরেছি। কিন্তু তাকে লেখায় বা পরে বলার ক্ষেত্রে আরও একটা ভাষারূপ শিখতে হবে, তাতে আমরাই তাকে সাহায্য করবো। এইভাবে আস্তে আস্তে সে এক উপভাষা থেকে আর-এক উপভাষায়, হয়তো আর এক ভাষায় পৌঁছে যাবে, নিজের ভাষা-উপভাষাকে ঘৃণা না করে।

লক্ষ্য করি যে, আমরা শিক্ষাপ্রশাসকেরা, নেতারা, অভিভাবকেরা ইংরেজি বলা-কওয়া (আর লেখা) শেখানোর উপর যত জোর দিই, উপভাষা-অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের প্রমিত বাংলা (বা প্রমিত অন্য কোনও ভাষা) শেখানোর বিষয়ে তত জোর দিই না। পাঠ্যবই প্রমিত ভাষায় লেখা হয়, আর রেডিওতে প্রমিত ভাষা শোনে— তাই আমরা ভাবি এই ভাবেই তারা প্রমিত বাংলা (বা অন্য কোনও প্রমিত ভাষা) নিজে-নিজেই শিখে যাবে। না শিখলে সেটা তাদের দায়, তারা ক্লাসে বকুনি খাওয়ার জন্য তৈরি থাকুক।

একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাসের পর্যালোচনা নিশ্চয়ই বারবার করতে হবে, উৎসব-উদ্‌যাপনও প্রতি বৎসর নিশ্চয়ই চলবে, কিন্তু তার মূল শিক্ষাগুলি কবে আমাদের জীবনে সত্য হবে— সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না। বিশেষ করে যখন পৃথিবীর ছোট গোষ্ঠীর দুর্বল ভাষাগুলি দ্রুত মৃত্যুর মুখে এগিয়ে চলেছে। এই শতাব্দীতেই ‘এথনোলগ্‌’-প্রতিবেদনের একটি হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর ৭১০৫-টির মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষা মরে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই মৃত্যুর বিরুদ্ধে একুশে ফেব্রুয়ারি একটা প্রতিরোধ তৈরি করুক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার দিন হিসাবে।

Featured Posts

Advertisement