বাংলার কথা বাপু

মন্দাক্রান্তা সেন

১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর আবেগে আমার প্রাণের ভাষা বাংলাকে আমরণ ভালোবেসে ধন্য হয়ে যাই। ভাষার জন্য লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল একটা দেশ। হরফের ডান পাশে হরফ বসানোর দাবিতে উত্তাল এক সংগ্রাম। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। যে ভাষার জন্য এই রোখ, সেই ভাষাতে আমিও কথা বলি, একি কম গর্ব একটা। আমার মাতৃভাষা সারা পৃথিবীর মাতৃভাষা দিবসের অনুপ্রেরণা, ভাবতে গৌরবে মাথা উঁচু হয়ে ও‍‌ঠে।

কিন্তু, এই রে ...!

অনুপ্রেরণা শব্দটাকে আজকাল অভিধান থেকে বাদ দিতে ইচ্ছে করে। কিংবা তার অন্য অর্থ লিখতে ইচ্ছে করে। অর্থের বিস্তার, কিংবা অর্থের সম্পূর্ণ পরিবর্তন। আর্য প্রয়োগও কি বলা যায়? অবিশ্যি সে যাঁরা ডি লিট দিয়েছেন তাঁরা বুঝবেন। অনুপ্রেরণা শব্দটা নিয়ে আলোচনা করতেও বোধহয় বিশেষ কারও অনুপ্রেরণা দরকার। যাঁর অনুপ্রেরণায় ‘চারিদিকে উৎসব (আমি ধরি খুঁৎ সব)’। ধুৎ, কী বিচ্ছিরি ছড়া কাটার অভ্যাস আমার। ‘তুমি সমুদ্র আমি ঢেউ / তুমি কুকুর আমি ঘেউ’ — কী আর করা, বাংলা কথা বাপু, এরকম উত্তীর্ণ কবিতা লেখার মতো অনুপ্রেরণা আজ অবধি আমার জোটেনি।

একুশ আমাদের অমর একুশ। মহা সমারোহে এই দিনটি আমরা পালন করি। এপার বাংলা ওপার বাংলায় যতই ভৌগোলিক বেড়া থাক, আমরা এক সুরে গেয়ে উঠি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি’। ভুলিনি, ভুলব না। কিন্তু সে কি এই একটি দিনের তরে? আগেই বলেছি, অমর একুশ আমাদের গৌরবের দিন, আবেগের দিন, কান্না হাসির দোলায় দোলানো স্মৃতিস্বপ্নের দিন। এইদিন চতুর্দিকে নানা উৎসব সভা সমিতি বক্তৃতা গান কবিতার অঢেল আয়োজন। সে ঠিক আছে। কিন্তু একুশ উপলক্ষে মেলাও বসে। একুশ যেন যে-কোন‍‌ও একটা হইচই। আরেকটা বিনোদন মাত্র। এত হাসি মজায় আমরা ভুলে যাচ্ছি না তো, দিনটা কিসের, দিনটা কেন? মেলা হয়, হজমি আচার ঝুটো মুক্তোর গয়নার পশরা বসে। আমরা কেনাকাটিতে উৎসাহিত হই। মনে কি সত্যিই পড়ে, শহীদ আবদুস সাত্তার, রফিকুদ্দিন আহমেদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বরদের রক্তের দামে কেনা মাতৃভাষার অধিকার? মেলায় দেখেছি তরুণ তরুণীরা হাতে হাত রেখে ঘোরে। ওরা জানে তো, শহীদদের নাম? পরস্পরকে ওরা কি বলে ‘ভালোবাসি’? মাতৃভাষায়? আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে? নিজের ভাষার দিনে, নিজেদের ভালোবাসার দিনে? এ কিন্তু ভ্যালেনটাইনস ডে, কিস ডে, হাগ ডে-র মতো মশকরা নয়, বাঙালির নিজের ভাষায় পরস্পরকে ভালোবাসা জানানোর দিন। বলো বলো বলো ... ‘আই লাভ ইউ’ নয়, বলো, ‘তোমাকে ভালোবাসি’। ভালোবাসা ঝড়ে পড়ুক নিজের ভাষায়। চাহনি, হাসি, স্পর্শ — সব বাংলা, আমার হৃদয়ের ভাষা, হয়ে উঠুক।

আমরা কিন্তু, গত বেশ কিছুদিন ধরেই, আমাদের মাতৃভাষাকে অপমান করে চলেছি। জানি, ভাষা যত অন্য ভাষাকে আলিঙ্গন করায় মুক্তমনা হয়, সে ভাষা তত ঋদ্ধ হয়ে চলে। বাংলা ভাষার সে গুণ আছে। সংস্কৃত থেকে শুরু করে আরবি ফরাসি তুর্কি পর্তুগিজ ওলন্দাজ ইংরেজি ভাষাকে সে আত্মস্থ করেছে। এটা একটা পরম্পরা, একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ। কিন্তু বিদেশি ভাষা যখন একটি ভাষার ওপর আগ্রাসন হয়ে দাঁড়ায়, বিষয়টা চিন্তার হয়ে ওঠে। অধুনা আমরা তাই দেখছি। সপ্রতিভতা, যাকে আমরা ‘বাংলা করে’ স্মার্টনেস বলি, তার ভাষা আমাদের নিজের ভাষা নয়। কেন জানি না, বিমানবন্দরে, রেস্তোরাঁতে, আমরা ইংরেজিতে কথা বলতে পছন্দ করি। শুধু পছন্দ করি তা নয়, ভিতরে ভিতরে বিশ্বাস করি এখানে এটাই রীতি। অন্যান্য সামাজিক রীতির মতোই। তাকে অগ্রাহ্য করতে ভয় পাই। নিরাপত্তার অভাববোধে ভুগি। তাই আমার নিজের ভাষা ছেড়ে এমনকি ভুল ইংরেজিতেই কথোপকথন চালাতে চাই। আমি বাংলা মাধ্যমে মাধ্যমিক পাশ (পাশ : একটি ইংরেজি শব্দের যথাযথ আত্তীকরণ ও আত্মীকরণ দুটোই) করার পর একটি ইংরেজি মাধ্যম কলেজে ঢুকি, যেখানে করিডরে দাঁড়িয়ে বাংলা বললে সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতো, মুখ ঘুরিয়ে চলে যেত। আর হায়, এখনও আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার ভাষা বিদেশি। অফিসিয়াল (ফের আগ্রাসন) কাজকর্মের ভাষাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাই। আর সাহিত্যে আকাদেমিও ‘ইন্ডিয়ান ইংলিশ’কে ভারতীয় ভাষা বলেই স্বীকৃতি দিয়েছে। বহু ভাষাভাষী ভারতে কোনও জাতীয় ভাষা নেই, যদিও হিন্দি ‘রাজভাষা’ (একটি আদ্যন্ত অগণতান্ত্রিক আত্মঘোষিত তকমা) বলে গা-জোয়ারি করে। ইংরেজির আক্রমণ আমরা সইয়ে নিয়েছি, আজকাল মুশকিলে পড়েছি ওই হিন্দি নিয়েই। টেলিফোনে কাউকে না পেলে যদিও বাংলা ইংরেজি হিন্দিতে কারণ জানানো হয়, কিন্তু ওই বাংলা কোথাকার বাংলা। ‘এই নাম্বার এখন উপলব্ধ নয়’। হিন্দি ‘উপলব্ধ নহি হ্যায়’-এর অক্ষম অনুবাদ। কেন, ‘আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না’ বললে কী হয়? হিন্দি বিজ্ঞাপনের বাংলা দেখলে মাথা ঘোরে। আসলে এ আমাদের ‘ক্ষমতার ভাষা’-র (ইংরেজি ও হিন্দি) সঙ্গে গা-ঘষাঘষির ব্যাকুলতা। শ্লাঘা। আত্মার অপমান।

ভারী বিষণ্ণ লাগে, যখন দেখি বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় বই লিখে জাতীয় স্বীকৃতি পাওয়া যায়। আর আমাদের অপেক্ষা করতে হয় ইংরেজি বা হিন্দি অনুবাদকের জন্যে। সেটা আদপে কী দাঁড়াল, তাও আমরা বুঝতে পারি না। লেখক হিসাবে এই দুঃখু জানালাম। আর, তবু তো কলকাত্তাইয়া বাংলা ভাষার একটা মান্য চেহারা আছে। পুরুলিয়া বা কোচবিহারের বাংলা কি এই অমর একুশের আয়োজনে ব্রাত্যই! এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

এক একুশের দিনে এক বন্ধুর সঙ্গে কাফেতে আড্ডা মারতে গেছি। কাফের মেরুন পোশাক পরা তরুণীটিকে ডেকে অর্ডার দিচ্ছি। বাংলায়। মেয়েটি উত্তর দিচ্ছে ইংরেজিতে। আমি বললাম, — আজ কী দিন আপনি জানেন?

মেয়েটি একটু ভেবে বলল — টুডে ইস টোয়েন্টি ফার্স্ট ফেব্রুয়ারি।

— হ্যাঁ। এটা কী দিন জানেন?

মেয়েটি চুপ।

আমি বললাম — আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বলেই মনে হলো ব্যাপারটা মেয়েটির জন্য একটু গুরুভার হয়ে গেল। ‘বাংলা’ করে বললাম — আজ ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে, গট ইট?

— ইয়েস ম্যাম।

— আজ অন্তত বাংলায় কথা বলুন!

— আই কান্ট, ম্যাম। আই উইল লুজ মাই জব।

সত্যি বলছি, আমার কান্না পেয়েছিল। এ কী আত্মবিস্মৃত সভ্যতা আমাদের!

হ্যাঁ, আত্মবিস্মৃত এবং আত্মবিক্রিত। আত্মবিকৃতও তো। যখন দেখি বিরাট ফ্লেক্স খাটানো হয়েছে, তাতে লেখা রবীন্দ্রনাথের ‘শ্রাদ্ধশতবর্ষ’ (এই লেখার পাঠকরা সবাই নিশ্চয়ই জানেন ওঁরা সার্ধ্বশতবর্ষের মানেই বোঝেন না। ফোনেটিক কান-ফিসফিস খেলায় যা শিখেছেন, তা ওইটুকুই), তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না। আমাদের সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাস একটা উদ্দাম ঝড় হয়ে উঠতে পারে না? এইসব ক্লেদ গ্লানি এক ঝটকায় উড়িয়ে দেওয়ার মতো? ‘ওরে ঝড় নেমে আয়, আমার শুকনো পাতার ডালে’ ...। আমাদের শুষ্ক কণ্ঠে প্রতিবাদের স্বর দাও, অমর একুশ! তুমি প্রেমের, তুমি প্রতিবাদের। এসো শেখাও আমাদের সংগ্রামের বর্ণমালা।

হায় রবীন্দ্রনাথ, বাংলা ভাষা-সাহিত্যের ঈশ্বর, তুমি ওদের ক্ষমা করিও ঠাকুর। উহারা জানে না উহারা কী করিতেছে। বাংলা ভাষার ‘সন্মান’ (সম্মান নয়) তছনছ করিয়া দিতেছে।

তার জন্য কারও কোনও মমতা — ইয়ে, মানে, আছে, না নেই?

Featured Posts

Advertisement