আসে কোন তরুণ অশান্ত

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার

২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

কে এই অশান্ত তরুণ যে আসতেই পৃথিবী রঙে রঙে সেজে উঠল? গাছে গাছে পাতায় পাতায় ধুলোয় মাটিতে? পৃথিবীর বুকের ভেতর যে এত রঙ তা কি জানা ছিল আগে? এই সেজে ওঠা পৃথিবীর রঙের সাজে পাল্লা দিতেই মানুষের সমাজে কারা যেন রঙের খেলায় মেতে ওঠে। কেউ ছোটে শান্তিনিকেতন, কেউ বৃন্দাবন। কিন্তু কবি যে বলেছেন, যে বসন্তে কোকিল কেশে কেশে রক্ত তোলে গলায় সে কীসের বসন্ত? কুশমণ্ডির সেই আদিবাসী মানসিক প্রতিবন্ধী তরুণী তো এই বসন্তেই ধর্ষিতা হলো প্রেমিকের ছদ্মবেশে আসা পশুদের দ্বারা। এই বাজপাখির দল শুধু শরীরী লালসাই নিবৃত্ত করেনি, পৈশাচিক উল্লাসে মেয়েটির যৌনাঙ্গে ধাতব রড ঢুকিয়ে তাঁকে রক্তাক্ত করেছে। এই বসন্তেই মেয়েটি মালদহ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। ওদিকে শান্তিনিকেতনে হোটেলে জায়গা নেই। যা-ও আছে তার ভাড়া আকাশছোঁয়া। রবীন্দ্র গানে নৃত্যে মুখরিত প্রাঙ্গণে দোলের উৎসবে যোগ দেবে বলে নাছোড়বান্দা মধ্যবিত্ত বাঙালি। এরা বসন্তপ্রেমিক। আবার বৃন্দাবনে ভক্তদের ঢল আশা করছে পর্যটক সংস্থাগুলি। প্রেমের ঠাকুরের দোল উৎসবে অংশ নিয়ে পুণ্য অর্জন করার বাসনায় পৃথিবীর নানা দেশ থেকে কৃষ্ণভক্তরা এসে সমবেত হবেন বৃন্দাবনের লীলাপ্রাঙ্গনে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ, দিল্লিতে আবার নির্ভয়াকাণ্ড। চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ করে পথের ধারে কারা ফেলে গেল এক অসহায় যুবতীকে। মালবাজারের এক হবু বর হুমকি দিয়েছে তার ভাবী বধূকে, যদি কন্যাসন্তান জন্ম দাও বিয়ের পর তবে পত্রপাঠ তালাক দেব। সদ্যোজাত কন্যার ঠাঁই হবে হোমে। অপমানে আত্মঘাতী হয়েছে বিবাহ প্রতীক্ষারতা জারিনা খাতুন। তাঁর বসন্ত আলেয়ার মতো অলীক মিথ্যে হয়ে গিয়েছে। দেশের সাধারণ জনতার মাথার ঘাম পায়ে করা সঞ্চয়ের টাকা নিয়ে ‘নীরব’-এ উধাও হয়েছে এক তস্কর। এ খবর চাউর হতে না-হতেই সামনে এসেছে আরও নীরব সরবদের সংবাদ। কে নাকি মাঝরাত্তিরে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে চমকে উঠেছে। পাঞ্জাব ন্যাশন্যাল ব্যাঙ্কের সামনে হাজার হাজার গ্রাহকের ভিড়, এক্ষুনি টাকা তুলে নেবে সবাই। কারণ কে কবে কার টাকা নিয়ে বিদেশে সটকে পড়বে নীরবে কে জানে। কষ্টার্জিত ধন সব খোয়া যাবে। কিছুদিন আগেই আইন হয়েছে ব্যাঙ্ক লোকসানে গেলে দায় নেবে না সরকার। ভার বইতে হবে সাধারণ গ্রাহককেই। রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ‘বসন্ত’-এ মন্ত্রণাসভা ছেড়ে পালিয়েছেন রাজা। কারণ রাজকোষ শূন্য, সচিবেরা যার যার পাওনা বরাদ্দ চেয়ে তাকে পাগল করে তুলছে। দেশে একদিকে ব্যাঙ্কের ভাঁড়ার শূন্য করে বিদেশে ফেরার হচ্ছে তস্করের দল। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক মন্ত্রণাসভা সংসদকে এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দেশের ‘রাজা’ প্রধানমন্ত্রী। বসন্তের কোকিলের মতো হঠাৎ হাজির হয়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উত্তরে শোনাচ্ছেন নির্বাচনী বসন্তগান। কার জয়ের মালা গাঁথবে এবারের বসন্তের ফুল? কারণ নীরব এবার সরব হয়ে বলেছেন, করব না শোধ ঋণের টাকা। বসন্ত এসেছে প্রকৃতিতে, কিন্তু ভারতবর্ষ নামের এই দেশটি ক্রমেই রবীন্দ্রনাথের অচলায়তন সদৃশ হয়ে উঠছে যেখানে আলোবাতাসহীন কয়েদ হয়ে থাকা মানুষগুলো আর্তনাদ করছে, বেজে ওঠে পঞ্চমে স্বর/ কেঁপে ওঠে বন্ধ এ ঘর/ বাহির হয়ে দুয়ারে কর কেউ তো হানে না/ আকাশে কার ব্যাকুলতা বাতাস বহে কার বারতা/ এ পথে সেই গোপন কথা কেউ তো আনে না।

কিন্তু বসন্ত তো শুধু ফোটা ফুলের মেলা নয়। এখানে শুকনো পাতা ঝরা ফুলের পদাবলীও রয়েছে। যারা ফুটে উঠতে পারেনি অবহেলায় অনাদরে, যারা সহায় সম্বলহীন মৃত্যুর প্রান্তে এসে ধুঁকছে, বসন্তে ফুঁসে ওঠে ওরাও। প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ায় কৃষ্ণচূড়ার বনস্পতির মতো। এই আগল ভাঙার ডাকও আসে বসন্তের গভীর থেকে। সেই বসন্ত বাতাস দ্রোহের ধ্বজা উড়িয়ে গুঁড়িয়ে দেয় প্রতিষ্ঠানের দম্ভের প্রাসাদ। রাজপথ রঙিন হয়ে ওঠে শিমূল পলাশের পতাকায় ফেস্টুনে। বিলাস আর বিনোদনের মূঢ় আয়োজন ছেড়ে বিদ্রোহী বসন্তে কোকিলের কণ্ঠে বেজে ওঠে প্রতিবাদী সংগীত, ‘সব দিবি কে সব দিবি পায় আয় আয় আয়, ডাক পড়েছে ওই শোনা যায় আয় আয় আয়।’ ধর্মীয় বিদ্বেষ আর মৌলবাদী হিংসায় জর্জরিত এই উপমহাদেশে বসন্ত মানে এক বিনিময়ের সমন্বয়ের সংস্কৃতিও। এই বসন্তেই পাকিস্তানে ঘুড়ির উৎসব আর গানে নাচে উৎসবময় হয় পাঞ্জাবের মানুষ ভাঙড়ার ছন্দে। মিথ্যা হয়ে যায় দ্বিজাতি তত্ত্বের কারাগার। বসন্ত পঞ্চমীতে যখন সরস্বতী পুজো করে হিন্দুরা ঠিক তখনই এক অন্য উৎসবে সেজে উঠে দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরবার। হলুদ বসন পরে, হলুদ ফুলে সেজে যে গান হয় দরগায় সারাদিন তাতে রয়েছে বসন্তের সঙ্গে সরস্বতীর বন্দনা। কথিত আছে, একদা হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। দিনের পর দিন যায়, মাসের পর মাস হজরতের বিষাদ কাটে না। তাঁর মুখে হাসি দেখে না কেউ। তাঁর প্রিয় শিষ্যরা নানা গান করেন, নানা কথা বলেন, কখনো নেচে ওঠেন, তবু নির্বিকল্প বিষাদ কাটে না হজরত নিজামুদ্দিনের। এমনই এক বিষাদের সময়পর্বে বসন্ত পঞ্চমীতে হলুদ বসন পরে হলুদ ফুলে সেজে সরস্বতীর বন্দনা গান গেয়ে নেচে নেচে রাজপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন নগরীর রমণীকুল। হজরতের এক শিষ্যের মনে হলো, এই উৎসবমুখর নারীদের সজ্জায় এই গান গেয়ে সামনে হাজির হলে বিষাদ কাটতে পারে তাঁর। এই ভেবে তাঁর এক শিষ্য হলুদ বসন পরে, হলুদ ফুলে সেজে নাচতে নাচতে থাকলেন হজরত নিজামুদ্দিনের সামনে এসে। আশ্চর্য, দীর্ঘ সময়পর্বের বিষাদ মেঘ সরে গেল। নাচ গান শুনে হাসি ফুটে উঠল হজরত নিজামুদ্দিনের মুখে। সেই থেকে বসন্ত পঞ্চমী পালিত হয় হজরত নিজামুদ্দিনের দরগায়ও। হলুদ ফুলে সাজানো হয় দরগা, হলুদ বসনে সাজেন ভক্তরা। সারাদিন পরিবেশন করেন সরস্বতীর বন্দনা গীত। এভাবেই বসন্ত এখানে তৈরি করে এ সামাজিক মিলনের সেতু। এক অভিন্ন সমারোহে মেতে ওঠেন ভিন ধর্মের মানুষেরা। পূর্ণতার অনুভব থেকে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া এই ঋতু বসন্ত, এমনটাই বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই এই বসন্তের ডাকেই একুশের প্রতিবাদী মিছিলে লুটিয়ে পড়ে ঢাকার রাজপথে সালাম রফিক বরকত জব্বার শফিউর অহিউল্লাহ। তরুণ হাসির আড়ালে থাকা আগুন নিয়ে কলকাতার রাজপথে লুটিয়ে পড়ে বসন্তসৈনিক সুদীপ্তর লাশ। অন্য এক বসন্তে উদ্ধত সামরিক ট্যাঙ্কের পথ রুখে দাঁড়ায় কায়রোর তরুণ, তিউনিসিয়ার জনতা। এই বিদ্রোহী বসন্তেরই নাম কখনো একুশ, কখনো তাহরির স্কোয়ার, কখনো একাত্তর, কখনো শাহবাগ, কখনো সুদীপ্ত।

বসন্তের এই বিদ্রোহী সত্তাকে চিনেই কী রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছিলেন বিদ্রোহী কবি নজরুলকে?

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement