আফ্রিকান সাফারি - ৩

২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

লেক মানিয়ারা থেকে গেলাম সেরেঙ্গেটি, তখন বেলা ৩টে। এই জঙ্গলে প্রায় তিন হাজার সিংহ, পাঁচ হাজার হাতি, ৫৩ হাজার কেপ বাফেলো, এক হাজার চিতাবাঘ ও অসংখ্য চিতা। আর আছে লক্ষ লক্ষ নানা কমিসের অ্যান্টিলোগ ছড়িয়ে আছে ১৪ হাজার ৭৪০ বর্গকিমি জুড়ে। চোরাশিকারি থেকে বাঁচাতে সমস্ত গন্ডার নির্দিষ্ট স্থানে পুরো সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রচুর সিংহ দেখা হলো তিনদিন ধরে। সিংহীগুলো দিনের বেলায় শাবকগুলোকে কাছেই ঝোপেঝাড়ে রেখে দেয়। সূর্যাস্তের সময় বার করে। জেব্রা, ইম্পালা, গেজেল ধাওয়া করার দৃশ্য দেখতে পাওয়া গেল। একটা সিংহ দিনরাতে প্রায় ১৬ ঘণ্টা ঘুমোয়। কিন্তু সিংহী শিকার ধরলে আগে ছুটে গিয়ে ভাগ বসায়। খুব কাছ থেকেই এসব প্রত্যক্ষ করা গেল। কেপ বাফেলো জলপান করতে নেমেছে জলাশয়ে। দুটো সিংহী আগে থেকে বসে আছে, শিকার ধরবে বলে। উলটে ঐ বিশাল দেহী কেপ বাফেলোর তাড়ায় সিংহীগুলো একেবারে পাড়াছাড়া। চিত্রটা অন্যরকম হতো যদি সিংহীগুলো দলে ভারী হতো। এই সেরেঙ্গেটিতেই দেখা গেল সেক্রেটারি বার্ড।

এখানে জলাভূমিতে অসংখ্য জলহস্তী ও কুমির দেখা হলো। গোল্ডেন ও স্ট্রাইপ্‌ড জ্যাকেল সিংহের ভুক্তাবিশিষ্ট খেতে দেখা গেল। অসংখ্য উটপাখি দেখা গেছে।

এসব প্রত্যক্ষ করার পর অংগানী তাঁবুতে রাত কাটানো, তিনদিনের জন্য। এর চারপাশে কোথাও কোনও বেড়া নেই। সামরিক ধাঁচের তাঁবু। মাটিতে খুঁটি দিয়ে পোঁতা, ফাসনার দিয়ে পুরোটা আটকানো। ৬টার মধ্যে ২টো তাঁবু বরাদ্দ। তাঁবুর মধ্যেই একপাশে টয়লেট। রোজ পরিষ্কার করা হয়। স্নানেরও ব্যবস্থা আছে। ৫০ ফুট দূরে আর একটা তাঁবু, খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। রুটি, মাখন, নানাবিধ ফল, মুরগি বা ভেড়ার মাংস, চা কফি অফুরন্ত। তাঁবুর বাইরে বসে সূর্যাস্তের সময় দেখা যাবে মাত্র কয়েক হাত দূরে জলহস্তী, ইম্পালা বা জেব্রা চলেছে। তাঁবু থেকেই শোনা যাবে হায়না বা সিংহের ডাক। এমনই এক রাতে সিংহগুলো ডেকেই চলেছে আর ক্রমশ তাঁবুর কাছাকাছি আসছে। শেষে উপস্থিত হয়েছে একেবারে তাঁবুর গায়ে। একমাত্র ভরসা এরা মানুখেকো নয়। কোনো কারণে একবার মানুষখেকোতে পরিণত হলে এদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়। এমতাবস্থায় বন্ধুবর পরামর্শ দিচ্ছেন ‘চুপ করে শুয়ে থাকুন’।

মোট আটদিনে এই বিশাল বনাঞ্চল পুরোটা দেখা সম্ভব নয়। তানজানিয়া আর কেনিয়া সীমান্তে আছে মারা নদী। ১৫ লক্ষ সাদা দাড়ি ওয়াইল্ড বিস্ট, দেড় লক্ষ জেব্রা খাবারের সন্ধানে বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় এই নদী পেরিয়ে কেনিয়ার মাসাইমারা বনভূমিতে প্রবেশ করে। নদীতে কুমিরের পেটে যায় এর একটা অংশ। সময়ের হেরফেরে এটা দেখা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে একদিন শয়ে শয়ে জেব্রা ছোট নদীতে জল খাওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল কিন্তু জলে নামছে না। কারণ অদূরেই কতকগুলি সিংহী শিকার ধরার উৎসাহে দাঁড়িয়ে আছে। দুপক্ষই অধৈর্য। শেষে দৌড়ে পালানোর পথ রেখে জেব্রাগুলো একটু দূরে গিয়ে জলপান করতে জলে নামলো। ব্যর্থ মনোরথ মাংসাশীরা ফিরে গেল। অনেক হায়না, কাচ্চাবাচ্চাসহ দেখা গিয়েছে অনেকবার।

সেরেঙ্গেটিতে তিনদিনের বেশি কাটিয়ে এবার গোরোংগোরো। কোনো এক আদ্যিকালে এটা ছিল এক আগ্নেয়গিরি। লাভা উদ্‌গীরণ পর্ব শেষ হয়ে যাবার পর পুরো পাহাড়টা ধসে পড়ে। দশ বর্গকিমি জু‍‌ড়ে বাটির আকারে বনভূমি। ইংরেজিতে বলে ক্রেটার। চারিদিকে উঁচু পাহাড় মাঝখানে নিচু সমতলভূমি। ঘাসে ঢাকা কিন্তু মোটামুটিভাবে বৃক্ষহীন। দলে দলে তৃণভোজীর আবাসস্থল। আর তৃণভোজী থাকলে সিংহও থাকবে। আছেও।

সাফারির সময় কোম্পানি সিল করা পর্যাপ্ত জলের বোতল জিপে তুলে দেয়। এর বাইরে যাতায়াতের পথে জলপান করতে গেলে কিনতে হবে। রোদ দশমা, টুপি, সম্ভব হলে একটা ভালো ক্যামেরা আর অল্প কিছু জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন এই জীবজগতের উদ্দেশ্যে। জীবনে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসুন।

অতিরিক্ত : আফ্রিকান সাফারিতে যাওয়ার আগে সেৎসি মাছির উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে, ইয়েলো ফিভারের প্রতিষেধক ইনজেকশন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কলকাতা বিমানবন্দর হেল্‌থ অথরিটি এই পরিষেবা দেয়।

এই সফরে যেতে উৎসাহীরা যোগাযোগ করতে পারেন : ৯৪৩৩৩৪৫০০৮ বা ৯১২৩০৩৫৩৫৫ নম্বরে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement