ঝুপড়ি থেকে বোল্টের ডেরায়

সায়ন কর্মকার

২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

স্বপ্ন। শব্দটির ব্যাপ্তি বেশ প্রশস্ত। একটু ভেঙে বললে অসীম কিংবা সীমাহীন। দিবা স্বপ্ন, আর রাতে ঘুমানোর সময় স্বপ্ন দেখে মানুষ। স্বপ্নের ছায়াপথে হাঁটতে সব মানুষেরই ইচ্ছা থাকে। যেখানে খুশি মানুষ যেতে পারে। অনেকে আবার অপূরণীয় আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করে স্বপ্নের দেশে। কেউ আবার রূপকথার নায়কে বদলে যান! সেরকমই ক্রীড়াবিদদেরও স্বপ্ন থাকে, নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে বসানোর বাসনা থাকে। যে চূড়ায় চাইলেই ওঠা যায় না। প্রচুর বাধা অতিক্রম করতে হয়। পেরোতে হয় কাঁটাযুক্ত পথ। রূঢ় বাস্তবকে হারিয়ে সাফল্যের সরণিতে প্রবেশ করা কারোর পক্ষে সম্ভব হয়। আবার কেউ হারিয়ে যায় যাত্রাপথেই।

স্বপ্ন এবং কঠিন বাস্তবের সেতুবন্ধনের কাজে ব্যস্ত দাঁড়িয়ে দিল্লির আজাদপুরের ছেলে নিসার আহমেদ। দিল্লির আজাদপুরের ৪ নম্বর রেল গেট। বাদ বাগের রেল ঝুপড়ির ছেলে নিসার আহমেদ। এই মুহূর্তে ভারতের জুনিয়র পর্যায়ে এক নম্বর ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড দৌড়বিদ। যিনি উঠে এসেছেন খেলো ইন্ডিয়া স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে। প্রতিদিন রেল লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট নিসার চলন্ত ট্রেনের দুরন্ত গতিতে ছুটে যাওয়া খুব কাছ থেকে দেখতেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মনে আশা জাগে যদি তিনি ট্রেনের থেকেও দ্রুত গতিতে ছুটতে পারেন? অতঃপর ৬ বছর বয়স থেকেই ট্রেন লাইন ধরে দৌড়ানো শুরু করেন ছোট্ট নিসার। জীবনের কঠিন যাত্রাপথের শুরু তখন থেকেই। রেল লাইনের কঠিন পাথরের উপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে আজ সে ভারতের উদীয়মান অ্যাথলিট। খেলো ইন্ডিয়া স্কুল গেমসের পাশাপাশি রাজ্য এবং জাতীয় স্তরে স্কুল বিভাগের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্টে প্রচুর সোনা জিতেছেন নিসার।

দিল্লির অশোক বিহার স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রথমবার স্কুলের ফিজিক্যাল এডুকেশনের শিক্ষক সুরেন্দর সিংয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নিসার। নিসার সেই স্কুলের ক্লাস ১১-র ছাত্র। সেখান থেকে খেলো ইন্ডিয়া স্কুলের প্রতিযোগিতায় আগমন। এরপর দিল্লি সাইয়ের কোচ এবং ভারতের প্রাক্তন মহিলা অ্যাথলিট সুনিতা রাইয়ের কাছে নিসারকে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে আসেন সুরেন্দর। খেলো ইন্ডিয়ার ১০০ মিটার স্প্রিন্ট ফাইনালে ৩ নম্বর লেনে ১৫৪ নম্বর ভেস্ট গায়ে বিদ্যুতের গতিতে ছোটেন ভ্যান চালকের ছেলেটি। মাত্র ১০.৭৬ সেকেন্ডে ১০০ মিটার সম্পূর্ণ করার পর অবাক সকলেই। গতি দেখে রীতিমত উচ্ছ্বসিত হন জাতীয় কোচ সুনীতা।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের রৌদ্রোজ্জ্বল লাল রঙের ট্র্যাকে দেখা গিয়েছিল আগুনের ঝলকানি। রেসের ট্র্যাকে আগুন ছুটিয়েছিলেন ১৬ বছরের ছেলেটি। কিন্তু ভারতের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে জাতীয় রেকর্ড ১০.২৬ সেকেন্ড। এখনও ০.৫০ সেকেন্ড কম করতে হবে তাঁকে। গতি বাড়াতে হবে। ২০১৭ সালে তিনবার ১০০ মিটার দৌড়ে ১১ সেকেন্ডের কম সময় নিয়েছেন নিসার। নভেম্বরে বিজয়ওয়াড়াতে জুনিয়র অ্যাথলেটিক্স মিটে অনূর্ধ্ব ১৬ বিভাগে ১০.৮৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে জাতীয় রেকর্ড গড়েছেন। এক মাস আগে ভোপালে সময় নিয়েছিলেন ১০.৭৬ সেকেন্ড। সেপ্টেম্বরের দিল্লি অ্যাথলেটিক্সে ১৬ বছর বিভাগে ১০০ (১১ সেকেন্ড) ওবং ২০০ মিটারে (২২.০৮) রেকর্ড করে সাড়া ফেলে দেন নিসার। বাড়িতে এসে মাকে খুশির আলিঙ্গনে আবৃত করে নিসার বলেছিলেন, ‘আজ হাম দো দো রেকর্ড তোড় দিয়া।’ সময়ের উন্নতির জন্য নিসারের পিছনে সর্বদা নজর রাখছেন কোচ সুনীতা। প্রশিক্ষণে সময়ের উন্নতি না দেখে বারকয়েক বকাবকি করেন সুনীতা। কাঁদতে কাঁদতে পালিয়ে যায় ছেলেটি। পরে জিজ্ঞাসা করে সুনীতা জানতে পারেন সেই ভয়ংকর সত্য কথাটি। কোচ সুনীতা বলেন, ‘ওকে জিজ্ঞাসা করি টেকনিকগত কোনও সমস্যা নই। তা হলে কোথায় সমস্যা হচ্ছে? ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলে আমি সারাদিনে ঠিক মতো খেতে পাই না। দুবেলা খাবার জোগাড় করার সামর্থ্য নেই আমার মা বাবার। অর্থের দাবির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছেন না আমার গরিব বাবা-মা।’ ভারতে তাঁকে দিল্লির চিতা বলা হয়। কিন্তু এসবে গা ভাসাতে নারাজ তিনি। বরং তাঁর আদর্শ জাস্টিল গ্যাটলিনের হওয়ার চেষ্টায় মগ্ন তিনি।

চোখে অলিম্পিক পদক জয়ের স্বপ্ন। বুকে বল। উদীয়মান অ্যাথলিটের বক্তব্য, ‘লক্ষ্য একটাই, দেশের হয়ে অলিম্পিকের পদক জিতে আসা। দিনের পর দিন বাবা-মায়ের চোখের জল আর দেখা যাচ্ছে না।’ যে স্কুলের হয়ে জাতীয় মিটে অংশগ্রহণ করেছেন সেই স্কুল থেকে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের জন্য একজোড়া জুতো অনুদান দেওয়া হয়নি। এমনকি কোনও সাহায্য করা মেলেনি।

প্রতিদিন ভোর ৫টায় উঠে সকালের প্রার্থনা সেরে মডেল টাউনে জিম করতে যায়। সকাল ৯টার মধ্যে ঘরে ফিতে কোনোরকমে খাবার খেয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ১২টা থেকে দুপুর ৩টে পর্যন্ত ক্লাস করে ছত্রসল স্টেডিয়ামে ট্রেনিং চলে বিকাল ৭টা পর্যন্ত। ৮টার মধ্যে বাড়ি ফিরে দ্রুত ঘুমোতে যেতে হয় তাকে। কারণ পরের দিন আবার সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে আরও পরিণত করার জন্য তৈরি হয় সে। ‘মা যে বাড়িতে কাজ করে সেই বাড়ি থেকে আমার জন্য দুধ পাঠানো হয়’, সংবাদমাধ্যমকে জানাচ্ছে ১৬ বছরের ছেলেটি।

নিসারের বাবার নাম নানকু। দিল্লিতে ভ্যান চালক। মা শাফিকুনিসা, লোকের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন। সর্বসাকুল্যে মাসে মোট আয় মেরেকেটে ১০,০০০ টাকার কাছাকাছি। ছেলের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের এক জোড়া জুতোর মূল্য ১৬,০০০ টাকা। বাবা বলছেন, ‘দেশকে গৌরবান্বিত করার জন্যই তো আমার ছেলে চেষ্টা করছে। নিসার তো দেশের গর্বের ছেলে। সরকার একটু সাহায্য করতে পারছে না? খেলো ইন্ডিয়ায় সাময়িক ভরতুকিতে কতদিন চলবে? স্থায়ী চাকরি না দিলে আমরা আর কতদিন ধার দেনা করে চালিয়ে যাব?’

উত্তরপ্রদেশ থেকে ৩০ বছর আগে দিল্লির ঝুপড়িতে এসে ওঠে নিসারের পরিবার। মা শাফিকুনিসার কথায়, ‘ইন্দিরা গান্ধীর আমলে আমরা এই বস্তিতে আসি। চারজন ছোট বাচ্চা ছিল। তার মধ্যে অপুষ্টিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।’ জুড়লেন, ‘বড় মেয়ে রাজিয়াকে কোনও রকমে বিয়ে দিয়েছি। ধার দেনা করে। আজও আমরা লোকের কাছে ঋণী। কবে এই ঋণ শোধ হবে জানা নেই।’ বললেন, ‘ওর বাবা যেমন ভ্যান চালিয়ে জীবন চালিয়েছে। নিসারের যেন এরকম পরিস্থিতি না আসে। ওর খরচের জন্য আমার ছোট মেয়ের বিয়ে পিছিয়ে দিতে কুন্ঠা বোধ করিনি। দাদার স্বপ্নপূরণে সম্মতি দিয়েছে আমার মেয়ে।’

দিল্লির চিতাবাঘ হিসাবে তিনি এখন দেশে খ্যাত। তাঁকে আবার অনেকে বোল্টের সঙ্গে তুলনা করছেন। কারণ বিদ্যুৎ মানব উসেইন বোল্টের জীবন কাহিনি অনেকটা এরকমই। অ্যাথলেটিক্স জগতে সর্বকালের সেরা উসেইন বোল্ট জীবনের শুরুতে মুখরোচক খাবার দেখে ছুটে যেতেন খাওয়ার জন্য। তারপর তিনি আজ রেসের ট্র্যাকে শাসনকর্তা। ভেঙেছেন অজস্র রেকর্ড। তেমনই গড়েছেন। ফেব্রুয়ারির শুরুতে খেলো ইন্ডিয়ার সেরা অ্যাথলিটদের রেস ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের শ্রেষ্ঠ পরিকাঠামো জামাইকার রেসার্সে পাঠানো হয়েছে। সেখানে নিসার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বোল্টের কোচ গ্লেন মিলসের অধীনে। যাঁর হাত ধরে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে রাজত্ব কায়েম করেছেন বোল্ট, ইয়োহান ব্লেকরা। রেসার্স ট্র্যাক ক্লাবের হেড কোচ মিলস। ইয়োহান ব্লেকের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আহমেদ। সেই অভিজ্ঞতার সম্পর্কে জানিয়েছে, ‘ইয়োহান ব্লেক আমাদের সঙ্গে দৌড়েছেন। দুরন্ত গতি। বাজপাখির মতো পাশ দিয়ে চলে গেল বুঝতে পারিনি। সঙ্গে আমাদের টেকনিক, স্টার্ট আপ, পিক আপ সব কিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন। অসাধারণ পরিকাঠামো। এরকমই আমাদের দেশে প্রয়োজন।’

বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়াই করে চলেছেন নিসারের মা-বাবা। দিন আনা দিন খাওয়া তাঁদের জীবনের অঙ্গ। সরু গলির মধ্যে যে স্থানে নানকু এবং তাঁর পরিবার থাকেন পচা গলা জলে ভর্তি ড্রেন। জলবাহিত রোগ নিত্যসঙ্গী। ভালো জল খেতে প্রায় ২ কিলোমিটার যেতে হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এলাকায় শৌচালয় নেই। দিল্লির আজাদপুর স্টেশনের রেললাইনের গায়ে লাগোয়া এমনই ঝুপড়িতে ৮ ফুট লম্বা, ৮ ফুট চওড়া এক কামরা বিশিষ্ট একটি ছোট্ট ঘরে মাথা গোঁজার মতো জায়গা রয়েছে নিসারের। ছোট জায়গায় বোন, বাবা, মা এবং নিসারকে থাকতে হয়। এক কামরা বিশিষ্ট ঘরের অর্ধেক জায়গা ভরে গেছে নিসারের পদক, ট্রফি এবং মেডেলে। যে জয়ের প্রতিটি মুহূর্তে মিশে রয়েছে নিসারের ঘামের বিন্দু। ট্রফিতে লেগে রয়েছে বাবা, মায়ের কষ্টের চোখের জল। এক বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের অপেক্ষায় দিন গুনছে নিসারের পরিবার।

Featured Posts

Advertisement