বদলে যাওয়ার কথা

বিশ্বনাথ সিংহ

১০ মার্চ, ২০১৮

মুলিবাঁশের বেড়ার দেওয়াল, নদীর ধারে। সংসারের আসবাবপত্র বলতে মাটির কলসি, ভাতের জন্য মাটির হাড়ি, গোরুর দুধ আগলে রাখতে পাটের দড়ি দিয়ে তৈরি শিঁকে। হাতে গোনা কয়েকটা পরিবার। চারিদিকে জঙ্গল। শহরে যাওয়ার জন্য মেঠো আলপথ। শহরে যেতে গোরুর গাড়ি অথবা সাইকেল ভরসা। তাও আবার সঙ্গে করে জামা-ধুতি নিতে হবে।

সে সব এখন অতীত। বন্যার জলে ভাঙছে নাগর নদীর দুকুল। গ্রামের নাম তাজপুর। একটা সময় নদী গর্ভে চলে যায় আস্ত গোটা তাজপুরের গ্রাম।  দারিদ্রের চেনা ছন্দে একে একে পূর্ব মহল্লায় শুরু হয় নতুন করে সংসার পাতার পর্ব। মাইলো ভাত, শাকপাতা, নাগরিক জীবনের একঘেয়ে ওঠা পড়া। দিন আনা দিন খাওয়া জীবনযাপনের সঙ্গে বেড়ে ওঠা ভাটোল গ্রাম। 

সে সবও এখন স্মৃতি।

হাত বাড়ালেই অধুনা বাংলাদেশ। ওপার বাংলার এপার বাংলার মানুষের সম্পর্ক ছিল নিবিড়। মাঝে একটা নাগর নদী। বাংলাদেশে নদীর উৎপত্তি। দিনাজপুর জেলার ভাটোল হয়ে, ৩৪ নং জাতীয় সড়ককে অতিক্রম করে মহানন্দা নদীতে গিয়ে মিশে গেল সেই নাগর। সেই ফুলে ফেঁপে ওঠা নাগর নদী গ্রাস করেছে তাজপুর জনবসতিকে। ১৮০৭-১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর জেলার ইতিহাস পুরাতত্ত্ব, সংখ্যাতত্ত্ব, ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বিবরণ বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ সংকলন থেকে জানা যায় দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর থানার বৈরাট্টা গ্রামে প্রথম একটা শামি বৃক্ষ ছিল। শামি বৃক্ষ দেখতে অনেকটা ছাতিম গাছের মতো। তবে আকৃতি বট গাছের। পরবর্তীতে অনেক সময় পরে প্রায় ১৯০০ শতাব্দীর গোড়ায় আরও একটা শামি বৃক্ষ দেখা যায় রায়গঞ্জ ব্লকের তাজপুর গ্রামে। সেই শামি বৃক্ষর তলায় বসেই সূর্যাপুর পরগনার রাজস্ব সংগ্রহের বন্দোবস্ত ছিল। তাজপুর গ্রাম থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে আরেক নতুন করে গড়ে ওঠা বসতি ভাটোল গ্রাম। চারিদিকে বনাঞ্চল। তাজপুর থেকে ভাটোল গ্রামের মাঝে ছেদ টেনেছে নোনা নদী। মাত্র কয়েকটা পরিবারের বসতির ছোট্ট একটা গ্রাম ভাটোল। রায়গঞ্জ ব্লকের ১নং গ্রাম পঞ্চায়েতের ভাটোল গ্রামে একটা মাত্র গ্রামীণ দাতব্য চিকিৎসালয়। ভাটোলের হাট বসে বুধবার আর শনিবার। সাপ্তাহিক দুদিনের হাটে গ্রামের মানুষের আনাগোনা। শহরের পথে যাওয়া সে এক দুর্গম কাহিনি।

বর্তমান ভাটোল যা আগে ছিল না। সময়টা হয়ত ১৯৪৭ সালের কাছাকাছি । ঘন জঙ্গলে ভরা।  জনবসতি ছিল না বললেই চলে। কয়েকটি পরিবারের বাস ছিল। এখানকার যা জমি প্রায় এক ফসলি চাষ আবাদ হতো। ভাটোল এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে হলুদ চাষ হতো। ভাটোলের আবাদি হলুদ রপ্তানি হতো অন্যান্য রাজ্যেও। পরবর্তী সময়ে প্রধান শস্য হয়ে ওঠে আমন ধান। এই এলাকার ভাটগঞ্জের কৃষকরা তুলাই পাঞ্জি ধান আবাদ শুরু করেন। কাঁঠাল, আম, পেঁপে কলা, লিচু প্রচুর আবাদ হতো এলাকায়। ষাটের দশকের শেষ দিকে ডোঙা সেচের ব্যাপ্তি থেকে আউশ চাষে জোর দেন কৃষকরা। পরবর্তী সময়ে নাগর  নদী ধারের কিছু জমিতে পাট চাষ বাড়তে থাকে। লঙ্কা চাষ হয়ে আসছিল বরাবর সময়জুড়ে। মাটির উর্বতায় দুফসলী চাষ বাড়তে থাকলে আউশ ধানের চাষে জোর দেন কৃষকরা। জমি থেকেই এলাকার মানুষের সংসার নির্বাহ হয়। শিক্ষার বিস্তারে জুনিয়র হাই স্কুল হয় এলাকায় সাতের দশকে। নোনা নদীর পশ্চিমের গ্রাম ভাটোলের পুরোটাই নাকি প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরির পৈতৃক সম্পত্তি। জমিদারের সেরেস্তাদের এক সহৃদয় ব্যক্তি গ্রামে বসবাস করতেন। আস্তে আস্তে বহু মানুষ ধীরে ধীরে ভাটোল গ্রামে বসতি শুরু করেন। সেবামুলক কাজে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে। ভাটোলের নতুন বসতি একটু জমে উঠতেই মানুষের সেবা থেকেই নাকি সেবাগ্রাম নামের উৎপত্তি। বর্তমানে যা ভাটোল নামে পরিচিতি লাভ করে।

দিনাজপুরের ইতিহাস থেকে জানা যায় আকবরের সময়কালে  তাজপুর জাগীর নামে একটি শহর ছিল। সেই তাজপুরে এখনো কিছু ধংসাবশেষ আছে। যদিও পুরোটাই মাটির নিচে। বর্তমানে ভাটোল একটি ঘন জনবসতি এলাকা। ভাটোলকে কেন্দ্র করে রায়গঞ্জ ব্লকের ১ নং ভাতুন গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা।

ভাটোল গ্রামে থাকেন একদা রায়গঞ্জের বিধায়ক প্রাক্তন মন্ত্রী খগেন্দ্রনাথ সিংহ।  তিনি জানান, ১৯৮০ সালের পরে ভাটোল, জগদীশপুর, পাঁচভায়া, হালালপুর, ভাটগঞ্জ, কদমতলি এলাকার হাজার হাজার মানুষের দাবিকে মর্যাদা দিয়ে ৩৪ নং জাতীয় সড়ক থেকে ভাটোল হাট পর্যন্ত সরকার পাকা রাস্তা তৈরি করে। এই ১০ কিলোমিটার ঝা চকচকে রাস্তা হওয়ার পর থেকেই এলাকায় একে একে উন্নয়নের জোয়ার আসে। যানবাহন চলাচল শুরু হয়। পরে তিস্তা খনন কাজ শুরু হয়। ১২৭৮ কোটি টাকার বরাদ্দ হয়। ইতিহাস প্রসিদ্ধ তাজপুর এলাকায় পরিকল্পনামাফিক নাগর ডাউক মেল ক্যানেলের কাজ শুরু হলেও উন্নয়নে বাদ সাধে এই রাজ্যের পরিবর্তনে। অনেক দূর কাজ শেষ হওয়ার পরেই ২০১১ সালে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এলাকায় এখনো তিস্তা খনন কাজের জন্য বড় বড় পিলার দাঁড়িয়ে আছে।

ভাটোল গ্রামের উত্তরের চারিদিকে বাংলাদেশের হরিপুর থানা। বর্ধিষ্ণু গ্রাম। গ্রামের পশ্চিমে নাগর নদী, উত্তর পশ্চিমে নোনা নদীর ধারে তিন সম্প্রদায়ের বসবাস।  এলাকায় রাজবংশী সম্প্রদায়ের সাথে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। এছাড়াও এলাকায় আদিবাসীদের বসবাসে সম্প্রীতির পীঠস্থানে ভাটোল গ্রাম। কৃষি প্রধান ভাটোল এলাকায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট সংখ্যক।  মাত্র একটা জুনিয়র স্কুল ছিল। এখন সেই স্কুল উচ্চমাধ্যমিক উন্নীত হয়েছে, এলাকায় দুটি বেসিক স্কুল ছাড়াও ১৮টা প্রাইমারি স্কুল, কারিগরি জনস্বাস্থ্য দপ্তর বিশুদ্ধ পানীয় জল থেকে দাতব্য চিকিৎসালয় থেকে গ্রামীণ হাসপাতাল হয়েছে এই তিন দশকে।

মাত্র তিন দশকে এতটাই উন্নতি গ্রামীণ ভাটোলের চেহারটা বদলে গিয়েছে।

Featured Posts

Advertisement