সবই এক, তবে পৃথক কিসে?

প্রবীর দাস

১০ মার্চ, ২০১৮

উভয়ের আকাশ একটাই। মাটির রূপ, রস, রঙ, গন্ধ এক। বাতাস অভিন্ন। গাছপালা পরস্পর আলিঙ্গনে আবদ্ধ। আর ভাষা, সে তো অভিন্ন বটেই। বাংলায় কথা বলা, গান গাওয়া, শোনা। অর্থাৎ যাকে বলে মাতৃভাষা বাংলা। রাস্তা, উঠোন, স্নানের পুকুর সবার। শুধু দেশ ভিন্ন ভিন্ন।

পানিতর। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া একটি গ্রাম। সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি বিজড়িত। বয়ে যাওয়া ইছামতীর পূর্ব পাড়ে যার অবস্থান। ১০-১৫হাজার মানুষের বাস। বসিরহাট ১নং ব্লকের ইটিন্ডা পানিতর গ্রাম পঞ্চায়েতের ৫টি বুথ এলাকা নিয়ে এই গ্রাম। অধিকাংশ গ্রামীণ শ্রমজীবী। আছে সরদার পাড়া, কারিগর পাড়া, মোল্লা পাড়া। আর আছে গাজী পাড়া। যার খবর কেউ রাখে আবার, অনেকেই রাখে না। সেই অর্থে নাহলেও বলা যায় বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। অর্থাৎ পানিতরে বিচ্ছিন্ন পানিতর গ্রাম। যার স্পর্শে হাড়োদাহ। এটাও একটি গ্রাম। প্রতিবেশী আর পাঁচটা গ্রামের মতো বাংলাদেশের একটি গ্রাম। ভারতের পানিতরের বিচ্ছিন্ন পানিতর আর বাংলাদেশের হাড়োদাহ।

বসিরহাট থেকে যার দূরত্ব১০কিমি। মাঝে ইছামতী নদী। ইটিন্ডা বাজার ভেদ করে বিভূতিভূষণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, গ্রন্থাগার পেরিয়ে সীমান্তের কাঁটাতার ঘেঁষা। কাঁটাতার নেই। দা়ঁড়িয়ে আছে মোরচে পড়া লোহার খুঁটি কতক। এপারে বি এস এফের কড়া নজরদারি। ওপারে বি বি জির। চার দিকটা মেছো ভেরী। সবুজ গাছপালা। বছরে চাষ একবারই হয়। আমন ধানের চাষ। নোনা এরিয়া। বর্ষার জল পেলে নোনাভাব কেটে যায়। জ্যৈষ্ঠে বীজতলা। ভাদ্রে চারা রোয়া। অগ্রহায়ণে ধান ঘরে তোলা। এছাড়া বাকি সময় ইটভাটায় কাজ অথবা মাছ কিনে বাজারে বিক্রি।

হজরত সরদার নিয়ে গেলেন লাগোয়া বিচ্ছিন্ন পানিতর, হাড়োদাহ গ্রামে। শুকনো এলো খাল পেরোতেই কর্তব্যরত বি এস এফের জওয়ানের প্রশ্ন কিধার জানা হ্যায়? কিউ? হজরত সরদার জবাব দিলেন, হামারা দামাদকা দোস্ত হ্যায়। ঘুমনে আয়া। হজরত সরদারের বাড়ি ওই গ্রামে। তাঁকে চেনে। পূর্বে কাঁটাতারের বেড়া রেখে মিনিট মিনিট চার পাঁচ হাটতেই বি এস এফ ক্যাম্প। সেই একই প্রশ্ন। ইছামতীর বাঁধানো পাড় ধরে মিনিট দুই তিন হাঁটতেই হজরতদার নির্দেশ, দাঁড়ান। বললেন, এটাই জিরো পয়েন্ট। অদ্ভুত! ইট বাঁধানো রাস্তার দু থেকে তিন ফুট বাংলাদেশের। বাকি এপাশ ওপাশ ওদের কথায় ইন্ডিয়ার। রাস্তার পশ্চিমে ইছামতীর পাড়ে গ্রাম ধলতিথা, নলকোড়া, সোলাদানা। পূর্বে পানিতর। ভেরির রাস্তা থেকে তিন চার ফুট নিচে নেমে গুণে গুণে ৩০-৪০ পা হাঁটতেই কাঙ্খিত সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম। যাদের আকাশ, মাটি, আলো বাতাস, ভাষা, পরিচয় একটাই। যেখানে পুকুর, রাস্তা, উঠান অভিন্ন। ভিন্ন শুধু দেশ। ভারত আর বাংলাদেশ। পানিতর আর হাড়োদাহ। পানিতরে বাস করে ৩০-৩৫ ঘর। হাড়োদাহে ১০-১২ঘর। সাপের মতো এঁকে বেঁকে গিয়েছে সীমানা। তাকে বোঝানোর জন্য রয়েছে বাংলা নামাঙ্কিত পিলার আর খুঁটির মাথায় শ্বেত পতাকা। কোথাও দু আড়াই ফুটের রাস্তার একদিকে হাড়োদাহের মোল্লা পাড়া। অন্য ধারে পানিতরের গাজী পাড়া। কোথাও একটাই উঠান। উঠানের একদিকে শোয়ার ঘর মোল্লা পাড়ায় তো রান্নার ঘর গাজী পাড়ায়। আবার কোথাও যাতায়াতের রাস্তা একটাই। রাস্তার পুরোটাই মোল্লা পাড়া অর্থাৎ বাংলাদেশের। তার দক্ষিণ পাশে ভারতের পানিতরের গাজী পাড়া। যাতায়াতের বিধি নিষেধ নেই। হঠাৎ দু ফুটের রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলাম। মোল্লা পাড়ার গৃহবধূ তানজিলা পার বারান্দায় রান্না করছিলেন। কী রান্না হচ্ছে? মুরগির মাংস। বাড়িতে জামাই মেয়ে এসেছে। কোথা থেকে কিনলেন? কেন বাজার থেকে। ভারতের বাজার অর্থাৎ পানিতরের বাজার থেকে। না না, হাড়োদাহ বাজার থেকে। হাফ মাইল দূরে। ওপাশে আমরা যাই না। কথা হয়, গল্প হয়। কিন্তু যেতে পারি না। দু পাড়ার কেউ অসুস্থ হলে একটু দেখেই চলে আসি। দুই পাড়ার মধ্যে বিয়ে-থাওয়া হয়? তখন বি এস এফ, বি বি জি-র অনুমতি নিতে হয়। মোল্লা পাড়ার মেয়ে তো গাজী পাড়ার ছেলে আবার উল্টোটা। বলে একগাল হেসে ঘরে চলে গেলেন। তাহলে সবাইতো বেশ আনন্দেই আছে। না বলে দিলে বোঝার কোন উপায় নেই এক আঙিনায় দুই দেশ। পরস্পর পরস্পরের সুখ দুঃখের সাথী। বাধা একটাই,লক্ষ্মণের গণ্ডি পেরোনো যাবে না। পাড়া দুটি ঘুরে এসে একটু জিরিয়ে নিতে গিয়ে বসলাম মাছ ব্যবসায়ী ইসমাইল গাজীর বাড়িতে। সেখানে দেখা হলো ষাটোর্ধ্ব রহমান গাজির সাথে। কেমন আছেন চাচা? ভালো নেই বাবা। শরীর ঠিক আছে? তা আছে। গ্রামে একটাও কল নেই যে পানি খাবো। ভাত রান্না করতি, খেতি ঐ ছুটতি হয় হাড়োদাহে। দু মাইল পথ হাটতি হয়। গ্রামে পানীয় জলের কল নেই! বিবিজি জল নিতে যেতে দেয়? মাঝেসাঝে দেয় না। তখন কী করেন?

পাঁচ ছ মাইল ঠেঙিয়ে ঘোজাডাঙায় যেতে হয়। আর কিছু? বার্ধক্য ভাতা পাই না। গ্রামে একটা বাচ্চাদের স্কুল নেই। স্বাস্থ্য কেন্দ্র নেই। সব আছে সেই পাঁচ কিমি দূরে। একবছর হলো গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। নদী যেভাবে ভাঙছে দেখবেন খুঁটি কোনদিন উপড়ে নদীতে পড়বে। বিধবা ভাতা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ঘর, একশো দিনের কাজ সবই অধরা এদের কাছে। অথচ একি উঠোনে খেলাধুলো করা হাড়োদাহের মোল্লা পাড়ার শিশুরা স্কুলে যায় আর পানিতরের গাজী পাড়ার শিশুরা স্কুল কী তা আজও জানলো না। একটু বড় হলে হয় ইটভাটা নতুবা বাবার সাথে মাছের ব্যবসার কাজে লেগে পড়া। একটা সময় মূলত পাটনিরা থাকতো এই গাজীপাড়ায়। ইছামতীতে নৌকায় লোক পাড়াপাড় চলতো। সেটাই ছিল আড় পথ। এখন সেসব বন্ধ। গ্রামে একটি মসজিদ আছে। যিনি নামাজ পড়ান তিনি আবার হাড়োদাহের বাসিন্দা। নাম সবুর গাজী। বি এস এফ ঝামেলা করে বলে এখন আর আসেন না। বর্তমানে কোন ইমাম নেই। তবে অতীতের সেই স্মৃতি আজও স্পষ্ট রহমান গাজীর। না পাওয়ার যন্ত্রণা যেমন আছে তেমনি যুবক বয়সে সাক্ষাৎ মৃত্যু মুখ থেকে ফিরে আসার আনন্দ আছে।

১৯৭১সাল। মুক্তিযুদ্ধের সময়।পাকিস্তানের খান সেনারা ভুল করে সীমানা বুঝতে না পেরে ঢুকে পড়ে গাজী পাড়ায়। আমাদের২০-২৫জন যুবককে ধরে নিয়ে যায়। লাইনে সারি করে দাঁড় করিয়ে গুলি করতে যাবে এমন সময় মহেন্দ্র পাটনি গিয়ে বলে এদের মারবেন না। এরা ভারতীয়। মানচিত্র আনা হলো। খান সেনারা দেখল সত্যি গাজী পাড়া ভারতের মধ্যে। মনে পড়ে সেই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে পাক সেনারা গুলি করে মেরে ফেলে চলে গেল।

দুই দেশ দুই গ্রাম ঘুরে এসে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত গ্রন্থাগারের কাছে আসতেই দেখা এক সময়ের ইটিন্ডা পানিতর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান আনন্দ চক্রবর্তীর সাথে। বিভূতিভূষণ স্মৃতি বিজড়িত পানিতরে কবেপ্রথম বিদ্যুৎ আসে? বললেন, ১৯৮৩সালে। তখন তিনি প্রধান। তাহলে এতদিন পরে অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন পানিতরের গাজী পাড়ায় এক বছর আগে বিদ্যুৎ ঢুকলো কেন। আরও আগে কেন সম্ভব হয়নি? পরবর্তীতে পঞ্চায়েত চলে যায় কখনো কংগ্রেস কখনো তৃণমূলের হাতে। তবে এতদিন কী সন্ধ্যা নামলে মোল্লা পাড়ায় আলো জ্বলতো আর গাজী পাড়া থাকতো অন্ধকারে! এখন হয়তো আলো জ্বলে ঘরে। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টা বাজলে চালু হয় বি এস এফের কড়া আইন। গ্রামে ঢোকা বেরোনো বন্ধ। বিশেষ কাজে সময় মতো ফিরতে না পারলে রাত কাটে রাস্তায় রাস্তায় বা কোন গাছের নিচে সেই অন্ধকারে। অপেক্ষা কখন সকাল ৬টা বাজবে। গাজী পাড়ার অধিকাংশ ঘরে রেশন কার্ড দুভাগে বিভক্ত। একই পরিবারে চারটে কার্ড দু টাকা কেজি চাল পায় বাকি চারটে কার্ডে তের টাকা কেজি দরে চাল পায়। তবে বিস্তীর্ণ পনিতরের একটাই অসুবিধা রেশন আনতে ছুটতে হয় পাঁচ কিমি দূরে ইটিন্ডায়।

সবারই দাবি পানিতরে একটি রেশন দোকান চাই। জগৎ বিখ্যাত বসিরহাটের মুনসির গামছা আজও তৈরি হয় এই পানিতরে। একশো একশো সূতোর মুনসির গামছার পানিতর সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থেকে আর কতদিন বঞ্চনার জাল বুনবে?

Featured Posts

Advertisement