‘মানুষ’ চৈতন্যের খোঁজে

১০ মার্চ, ২০১৮

এমনই মনে হবে, চৈতন্যদেবের জন্ম এবং মৃত্যু রহস্যের উন্মোচনই ‘মহাপ্রস্থানের অন্তরালে’-র মূল লক্ষ্য। কিন্তু দেবাশিস দীঘালের এই নাটকের অভিনয় শেষে কখনো মনে হয়‌নি, মূল লক্ষ্য এমনটাই। বরং মনে হয়েছে, এই লক্ষ্যের পথ ধরে নাট্যকার পৌঁছাতে এবং পৌঁছে দিতে চে‌য়েছেন, নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ ‘মানুষ’ চৈতন্যদেবের কাছে, তাঁর দর্শন, আদর্শের কাছে, যে আদর্শ এবং দর্শন অন্ধত্ব আর কু-আচারের শিকলে বন্দি বাংলার নিস্তরঙ্গ জীবনে প্রবল ঢেউ তুলেছিল। সেই ঢেউ বা আ‍‌লোড়ন আতঙ্কিত করেছিল তাদের, যারা জা‍‌তিভেদ, অলৌকিকতা, কু-সংস্কারের অন্ধকারকে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকার অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে।

আজ এই দেশে সম্প্রীতির সেতু ভেঙে ফেলা হচ্ছে। মানুষকে ভাঙা হচ্ছে, জাতি-ধর্মে। এখন প্রয়োজন চৈতন্যের মানব-ধর্মের আলোয় নিয়ে আসা এই দেশকে। শিল্পীর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। ‍তিলজলা আয়াস এই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছে।

‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ এই সত্যের খোঁজে নাট্যকার দেবাশিস নানা গুরুপূর্ণ গ্রন্থের সাহায্য নি‍‌য়েছেন। এই তালিকায় রয়েছে এল টি কেনেডি, দীনেশচন্দ্র সেন, রোমিলা থাপারের গ্রন্থ।

এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে বিতর্ক তৈরি করবে। বিতর্ক হোক, আলোচনা হোক।

নাটকটির কিছু সম্পাদনা এবং সংযোজনার প্রয়োজন। চৈতন্যদেবের যে বর্ণময় যাত্রা, তা যতটা উল্লেখ করা হয়েছে, ততটাই নাট্যক্রিয়ার মধ্যদিয়ে উপস্থিত করা হয়নি। চাঁদ কাজির নীতির ‍‌বিরুদ্ধে মশাল মিছিল, পণ্ডিতদের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে তর্ক-সংঘাত, যবন হরিদাস-পর্বর মতো চৈতন্য-জীবনের উজ্জ্বল কিছু দিক তুলে ধরা যেতো না?

ভালো লাগল, নির্দেশক দেবাশিস দীঘাল সেই অর্থে ছকে ফেলে নির্মাণ করেননি, নাটকের মঞ্চরূপ, চৈতন্যর জীবন-আখ্যানের মঞ্চরূপ ছক মানে না।

আসলে চৈতন্যর ভূমিকাভিনেতা আর্যচন্দ্রর বয়স বড় কম। দেবাশিস দীঘালকে চৈতন্যর ভাই নিতাই হিসেবে মেনে নিতে অসুবিধা হয়েছে। তবু অভিনয় দিয়ে দেবাশিস এই বাধা পার হয়েছেন, অনেকটাই। আর্যচন্দ্রর সামনে পার না হওয়া পথ অনেকটা। চমৎকার মানিয়েছে তাঁকে। প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তাঁর অভিনয়ে। তবু এই বহুমাত্রিক চরিত্রের আলোছায়া রঙ পুরোপুরি খুঁজে পেতে যে পরিণত অভিনয়ের প্রয়োজন, তা সবটা পাওয়া গেল না। কিছুটা দুর্বলই লাগল হোসেন শা, ইসলামবাদী, মুজাভিরদের অংশ। অভিনয়ে ছিলেন অরুণ দাস, নীলাঞ্জন রায়চৌধুরি ও সঞ্জয় দে। জগন্নাথ মিশ্র ও গোবিন্দ বিদ্যাধরের অন্যরকম ব্যক্তিত্বের সবটা ছুঁতে পারেননি, অলীপ ভুঁইয়‌া। জয়ন্তদীপ চক্রবর্তী থিয়েটার শিল্পের দীর্ঘপথ পার হয়েছেন। বৃদ্ধর ভূমিকাভিনয়ে সেই পথ পার হওয়ার অভিজ্ঞতার ছাপ। তাঁর পরিণত শিল্পবোধ বৃদ্ধের অন্তরের ছন্দকে আবিষ্কার করেছে। স্বাগতা সেনগুপ্ত (শচী), ঐন্দ্রিলা পুরকাইত (হরিপ্রিয়া) বেশ পৌঁছেছেন চরিত্রের ভিতরে। শর্মিষ্ঠা মিত্র, বিষ্ণুপ্রিয়াকে আরো খুঁজতেই পারেন। দেবব্রত মণ্ডলের বাচস্পতিকে বাচস্পতি বলেই মনে হলো। এছাড়া অভিনয়ে ছিলেন চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, পার্থ দাস, শান্তনু হালদার। তরুণ সৈকত মান্নার আলো (উপদেষ্টা সন্তু সাধুখাঁ) দেখে মনে হলো সে থাকতে এসেছে। আলো-অন্ধকারের সংঘাত এখানে। অন্ধকার কখনো আলোকে ছাপিয়ে যায়নি। তবে প্রক্ষেপণে সময়ের সামান্য হেরফের হয়েছে। বুদ্ধিদীপ্ত আবহ করেছেন পারমিতা চৌধুরি। কীর্তন এখানে সম্প্রীতির সংগীত হয়ে উঠেছে। সুর আর শব্দের ব্যবহারে সতর্ক থেকেছেন পারমিতা। নাটকের সংলাপ এবং সংঘাতে যে শব্দ আর সুর রয়েছে, তাকে বিব্রত হতে দেননি। তবু মনে হলো, আরো নীরবতার সংগীত এসে মিশুক এই সংগীতে। মঞ্চ ঠিক তেমন, যেমন চেয়েছিল থিয়েটার। সেমিডায়াসের জ্যামিতিক বিন্যাসে কতটা প্রাসঙ্গিক মঞ্চ করা যায়, মঞ্চব্যপ্তি আনা যায়, তা এর আগে বার বার দেখা গেছে। সেই কথা মনে রেখেই সম্ভবত তৈরি হয়েছে, এই নাটকের মঞ্চ।

যত বৈচিত্র্য আসবে কম্পোজিশনে, ততই এই নাটকের অন্ত‍‌রের ছন্দ ডানা মেলে দেবে। দেবাশিস প্রয়াসী থেকেছেন এই বৈচিত্র্য আনতে। সন্ধান চলতে থাক।

রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়

Featured Posts

Advertisement