জলের আয়নায় চৌখাম্বার

অভিজিৎ দাস

১১ মার্চ, ২০১৮

রুদ্রপ্রয়াগ জেলার অন্তর্গত ছোট্ট একটি গ্রাম—সাড়ি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা ৬৫৫৪ ফুট। সাড়ি গ্রাম থেকে প্রায় ৩ কিমি হাঁটা পথে প্রায় ৭৯৯৯ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত জলাশয় নাম দেওরিয়াতাল। পৌরাণিক মহাকাব্য মহাভারতের পাণ্ডবরা নাকি একবার এই তালের কাছেই মুখোমুখি হয়েছিলেন যক্ষের। কথিত আছে দেবতারা নাকি এখানে স্নান করতেন। তাই অনেকে স্থানটিকে দেবরিয়াতাল বলে উল্লেখ করে থাকে।

দেওরিয়াতাল আসা এই নিয়ে দ্বিতীয়বার। ২০১০ সালে তুঙ্গনাথ হয়ে কেদারনাথ যাওয়ার পথে উখিমঠে একরাত কাটিয়ে সকালে গাড়ি নিয়ে (১৪ কিমি) সাড়ি গ্রাম এসে ‘দেওরিয়াতাল’ ঘুরে গিয়েছিলাম। তাই এবার প্রস্তুতির সময়েই ৪ মাস আগে — ক্যাপ্টেন বুড়োদা (অভিজিৎ মুখার্জি) ও বর্ষীয়ান অভিজ্ঞ সদস্য চিকলাইদাকে (মিলন চ্যাটার্জি) অনুরোধ করেছিলাম প্ল্যানে রাখতে দেওরিয়াতালে রাত্রিবাস। গত মে মাসে বন্ধু অনুপম দে এখানে এসেছিল। তাই তথ্যের কমতি কিছু ছিল না। প্রসঙ্গত, আমরা ৬ জনের দলের সকলেই যাদবপুর-সন্তোষপুরের বাসিন্দা হলেও ২০১০-র দলের সদস্য এবার আমরা এই তিনজনই। প্রণবদা, নীরেনদা ও সুবীর দা-র এবারে দেওরিয়াতাল প্রথম। আর একটি ব্যাপার, আমাদের দলের ৬ জন সদস্যের ৪ জনই এবার ৬০ প্লাস।

কথা দিলেও চিকলাইদা ও বুড়োদা সফর সূচিতে দেওরিয়াতাল-এ রাত্রিবাস রাখতে পারলেন না। দিন বাঁচাতে, হরিদ্বার না হয়ে একরাত্রির রেল সফরে (আকালতকত) নাজিবাবাদ-কোটদ্দার হয়ে উখিমঠ-র ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের গেস্ট হাউসে আসতেই দিনের আলো প্রায় শেষ লগ্নে। ওখান থেকে আরও ১৪ কিমি গাড়িতে ও ৩ কিমি হেঁটে দেওরিয়াতাল-এ পৌঁছানো একটু ঝুঁকি সাধ্যই হয়ে যেত। শরীরও বিশ্রাম চাইছিল। তখন সঙ্গে সঙ্ঘের নিরামিষ বাংলা খাবার। নাজিবাবাদ থেকে ২০০ কিমির বেশি পথ — ৭ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। হরিদ্বার থেকেও ২০০ কিমি পথ — সাড়ি গ্রাম।

সাড়ি গ্রামের বাস স্টপের কাছেই দেওরিয়াতালের যাবার প্রবেশ পথের তোরণ। সাড়ি গ্রাম — আয়তনে ছোট-বড় হোটেল নেই এখানে। তবে রাত্রিবাসের জন্য বেশ কয়েকটি হস্টেল আছে। ছিমছাম গ্রামটির প্রবেশ পথ পেরিয়ে খানিকটা উঠলেই একটি শিব মন্দির। ২০০০ সালে নির্মিত এই মন্দিরের পূজারি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী। সংসার নিয়ে মন্দিরের পা‍শেই বাড়ি তার। সবুজ জঙ্গলের পথে পুরোটাই চড়াই পথ। গাইড বা ঘোড়া পাওয়া গেলেও আমাদের চেনা পথ — রাস্তা হারানোর প্রশ্নই নেই। আলো ফুটলেও — কেমন একটা ধোঁয়াশা রয়েছে পরিবেশে। যতই তাড়াহুড়ো করে দেওরিয়াতাল চলে আসি সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে আকাশ পরিষ্কারের জন্য। সুবীরদা ও আমি গল্প করতে করতে এগোলাম হাঁটার একটা ছন্দ রেখে। চিকলাইদাও আছে কাছাকাছি। বাকিদের দেখা যাচ্ছে একটু উপরে।

পথে বসার জায়গা করে দিয়েছে বনদপ্তর। বেশ কয়েকটি চায়ের দোকানও রয়েছে পথযাত্রীদের জন্য। ঘণ্টা দেড়েকের একটু বেশি সময় লেগে গেলো তালের কাছাকাছি পৌঁছাতে। বাকিরা ১০/১৫ মিনিট আগে। প্রবেশমূল্য রয়েছে তালে ঢোকার জন্য। জনপ্রতি ১৫০ টাকা প্রতি ভারতীয় নাগরিকের জন্য। রাত্রিবাসের জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে তালের ধারে বুগিয়ালের উপর নানা ধরনের চেনা, খাওয়া-দাওয়া সমেত জনপ্রতি দিনে ৭০০-১০০০ টাকার মতো। চিকলাইদা ও নীরেনদার সরকারি সংবাদপত্র ও বিশেষ অনুরোধে শুধুমাত্র ঘণ্টাখানেকের ঘুরতে আসার জন্য প্রবেশমূল্য মাফ করে দিলো কেয়ারটেকার।

পাহাড়ের উচ্চতা যাদের টানে — তাদের অপার আনন্দের হাতছানি নিয়ে সেজে আছে দেওরিয়াতাল। জঙ্গলে ঘেরা অসাধারণ সরোবর বা লেক — টলটলে জলে ভরা, জঙ্গলে ঘেরা এই জলাশয়ের সাথে রয়েছে হিমালয়ের এক নিবিড় সান্নিধ্য। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে তুষারশৃঙ্গগুলি। কেদারনাথ, সুমেরু, বান্দরপুলু প্রভৃতি। তাদের মাঝে বিশাল শরীর দাঁড়িয়ে চৌখাম্বা, সকালে পরিষ্কার আকাশে সরোবরের জলে তার প্রতিবিম্ব মন ভরিয়ে দেয়। সরোবরের চারপাশে সবুজ চাদর বিছানো বুগিয়াল আর বিভিন্ন ধরনের আলপাইন বৃক্ষ। বসার জায়গাও রয়েছে বেশ কয়েকটি। সব যেন মনের মতো সাজানো।

দেওরিয়াতালে রাত্রিবাসের অভিজ্ঞতা এবার না হলেও এর একটা আনন্দ রয়েছে অন্যরকম। তবে প্রচার ও বিভিন্ন এজেন্সির দৌলতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক আসছে অনেক। দেওরিয়াতাল থেকে জঙ্গলের পথে সরাসরি চোপতা জল যাওয়ার পথ থাকায় (বাঙ্গে তাঁর আবশ্যিক) বিদেশি পর্যটক ও ছাত্রছাত্রীদের ভিড় বাড়ছে দিন দিন। লোক বাড়ার সাথে সাথে এলাকায় উন্নতির সম্ভাবনা দেখা দিলেও তা‍‌লের পরিবেশের নীরবতায়ও ব্যাঘাত ঘটছে। তালের জলটি যদি বনদপ্তর থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে রোজ পরিষ্কারের ব্যবস্থা রাখে তবে খুব ভালো হয়।

ঘণ্টাদুয়েক দেওরিয়াতালের সৌন্দর্য উপভোগ করে ফিরে আসার পালা। আজকের রাত্রিবাস চোপতাতে কাল সকালে তুঙ্গনাথ। সাড়িগ্রাম থেকে গা‍‌ড়ি পথে জোগলভিটা হয়ে চোপতার দূরত্ব মাত্র আড়াই ঘণ্টার। গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে অনিন্দ্যসুন্দর উপত্যকা চোপড়া (৮৭৯৩ ফুট) যেখান থেকে সূর্যোদয়ের ও সূর্যাস্ত — দুই-ই সুন্দর। চোপড়া থেকে পঞ্চ কেদারের উচ্চতম স্থান তুঙ্গনাথ (১২০৭২ ফুট) যাত্রার শুরু ৩ কিমি যাত্রাপথের পুরোটাই চড়াই।

Featured Posts

Advertisement