আলোর রং-২

১১ মার্চ, ২০১৮

গত সংখ্যায় তাপমান অনুযায়ী আলোর রং-এর যে লম্বা ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছিল, তাতে আশা করি ঘাবড়ে যাননি। আগে ফিল্ম বা স্লাইড তৈরি করা হতো 5500 কেলভিন কালার টেম্পারেচারের আলোর—মানে সাদা আলোর—উপযোগী করে। ফলে দিনদুপুরে সূর্যের নিরপেক্ষ (মানে সাদা) আলোয় ছবি তুলেছেন যখন, যেটা যেমন রং-এর ছবিতে সেটা তেমন রং-এরই উঠেছে। কিন্তু যেইমাত্র জ্বলন্ত দেশলাইকাঠি বা রাত্রে নিয়ন-আলোয় সাহসী হতে গেলেন, অমনি চিত্তির। সমস্ত রংটঙ গুলে গিয়ে এক্কেবারে রং-কানা ভ্যানগখ। অথচ যে কোনও ডিজিটাল ক্যামেরাতেই আপনি WB বা হোয়াইট ব্যালান্স বোতামটা টিপে যে আলোয় ছবি তুলছেন সেই আলোর চরিত্রটা ক্যামেরাকে জানিয়ে দিতে পারেন। ধরুন খামোখা প্রিয়জনকে উত্ত্যক্ত করে এমনি অন্ধকারে শুধু একটা মোমবাতির আলোয় তার ছবি তোলার ইচ্ছেটা আপনার মনে চাগাড় দিয়ে উঠল। আপনি শ্যুটিং মেনু থেকে বা WB বোতামটা টিপে ধরে কম্যান্ড ডায়াল ঘুরিয়ে, কালার টেম্পারেচর করে দিলেন 2000 কেলভিন। ক্যামেরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল যে উৎস-আলো বা যে আলো আপনার প্রিয়জনের মুখে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে লেন্সের ভিতর দিয়ে সেনসরে ঢুকে আসবে, সেই আলোর রং কমলা। ক্যামেরা সেইমাফিক সাবধান হলো এবং আপনি বিকট কমলার পরিবর্তে আপনার প্রিয়জনের মোটামুটি বাস্তবরকম একটা কম-কমলা মুখচ্ছবি পেলেন। ঐ একই উৎপাত আপনি ধরুন আবার করতে চাইলেন মোমবাতির আলোর বদলে একটা টাংস্টেন বাল্বের আলোর মুখোমুখি প্রিয়জনকে বসিয়ে। টাংস্টেন বাল্বের আলো ফ্যাকাসে হলুদ এবং তার কালার টেম্পারেচরা, কাছাকাছি, 3000 কেলভিন। WB সেট করলেন 3000 কেলভিন এবং পাণ্ডুর না হয়ে চলনসই, নিরপেক্ষ একটা মুখ হলো ছবিতে।

কোনও কোনও ক্যামেরায় কেলভিন স্কেল-এ কালার টেম্পারেচার বেঁধে দেওয়ার সুবিধা নাও থাকতে পারে। যে যে আলোয় আপনার ছবি তোলার প্রয়োজন হতে পারে, ক্যামেরা প্রস্তুতকারক সেই সেই আলোয় কালার টেম্পারেচার বুঝতে সুবিধা হয় এমন চিহ্নের মাধ্যমে আপনাকে বেছে নেওয়ার একটা সুযোগ দেয়। সেক্ষেত্রে WB মেনু-তে গিয়ে যদি দেখেন ক্যামেরা আপনাকে হোয়াইট ব্যালান্স সেট করতে দিচ্ছে একটা ইলেকট্রিক বাল্বের ছবিতে যার পাশে লেখা রয়েছে incandescent—আপনি বুঝে যাবেন যে যখন এমন বাল্বের হলদেটে আলোয় আপনি ছবি তুলছেন, তখন ক্যামেরাকে চেতিয়ে দেওয়ার জন্য ঐ বাল্বের ছবি incandescent-এ হোয়াইট ব্যালান্স সেট করতে হবে। তেমনই টিউবলাইটের আলোয় ছবি তুলতে হলে WB করতে হবে টিউবলাইটের ছবি বা fluorescent। দিনের বেলায় সরাসরি সূর্যের সাদা আলোয় ছবি তুলবেন যখন, বেছে নেবেন সূর্যের ছবি বা direct sunlight। বুঝতেই পারছেন কালার টেম্পারেচরের সরাসরি মূল্যমান না বলে এইসব ছবির মাধ্যমে ক্যামেরা একটু সহজ করে একই কথা বলতে চাইছে। যেহেতু কেলভিন স্কেল আপনি আয়ত্ত করেছেন ধরেই নিচ্ছি, তাই আশা করি বোঝা যাচ্ছে যে বাল্বের ছবি incandescent মানে এমন হলুদ আলো যার কালার টেম্পারেচার 3000-3500 কেলভিন। টিউবলাইটের ছবি fluorescent মানে সবজেটে আলো যা 4000-4500 কেলভিন। তেমনই সূর্য daylight 5500 কেলভিনের সাদা আলোর জন্য, মেঘ cloudy 7000-7500 কেলভিনের গাঢ় নীল আলোর জন্য, ইত্যাদি। আর WB যদি সরাসরি কেলভিন স্কেলে সেট করা যায়, তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল। যে কোনও আলোয় যে কোনও বস্তুর আসল রং ছবিতে তুলে আনতে আপনি পারংগম হয়ে উঠেছেন ধরে নিচ্ছি।

এখন প্রশ্নটা হচ্ছে সূর্যের শেষ আলো হলুদ দেওয়ালে পড়ে যে গনগনে আগুনের মতো অন্য মাত্রার একটা হলুদ রং তৈরি করল, আমি কি ছবিতে সেই নাটকীয় হলুদ রংটা চাইব? না কি আপতিত আলোর রং সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে হলুদ দেওয়ালটা দুপুরের নিরপেক্ষ সাদা আলোয় যেরকম হলুদ দেখায়, সৎভাবে সেই এমনি-যেমন হলুদ রংটা ছবিতে ধরব? কোনও বিশেষ আলোয় কোনও এমনি বস্তু যখন তার পরিচিত বাস্তবের চেহারা ছাপিয়ে কোথাও অচেনা হয়ে ওঠে, আমরা তখনই তার ছবি তুলি। ঠিক এই কারণেই দুপুর বারোটায় ছাদে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে প্রিয়জনকে দাঁড় করানোর বদলে আপনি প্রদীপের আলোর চৌহদ্দিতে তাকে বসিয়েছেন। অতএব শেষ রোদ্দুরে হলুদ দেওয়ালের ম্যাজিক রংটাই আমার এবং আপনার চাই। ছবিতে ঐ গনগনে হলুদ ভাবটা থাকতেই হবে। এখন আপনি কেলভিন স্কেল শিখেছেন বলে যদি হোয়াইট ব্যালান্স বেঁধে দেন 3200 কেলভিন বা incandescent, ক্যামেরা বুঝে নেবে যে ভীষণ এক হলুদ আলোয় আপনি কোনও কিছুর ছবি তোলার প্রয়াস নিয়েছেন। সে সতর্ক হয়ে আপতিত আলোর বাড়তি হলুদটুকু কাটিয়ে দেবে এবং একটা অতি অনাটকীয় হলুদ দেওয়ালের ছবি আপনি পাবেন। এই বিপর্যয় ঠেকাতে হলে আপনি স্রেফ একটা কাজ করুন—প্রথম রোদ্দুর থেকে শেষ রোদ্দুর পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে ছবি তুলছেন যখন, কালার টেম্পারেচার করে নিন 5500 কেলভিন। কেলভিন স্কেল WB মেনু-তে যদি না থাকে, তাহলে সোজাসাপটা direct sunlight। প্রয়োজনমাফিক নাটকীয়তা ছবিতে যেটুকু থাকার এতেই তা থাকবে। বাদ পড়বে না এবং সমস্ত নাটকীয়তা ছবি থেকে উবে যাবে যদি হোয়াইট ব্যালান্স করে দেন ‘অটো’ বা AWB। কেন? আগেও বলেছি আপনার ক্যামেরা অতি বিশ্বস্ত লোক এবং তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত। সে সবসময় চেষ্টা করে যাবে আলোর খামখেয়ালিপনায় প্রভাবিত না হয়ে আপনি যাতে একটি নিরপেক্ষ ও সুষম ছবি তোলেন। সুষম ছবির সংজ্ঞা হিসেবে ক্যামেরা বোঝে যে VIBGYOR-এর সাতটা রং ছবিতে কাছাকাছি অনুপাতে থাকতে হয়, নতুবা ছবি কোনও বিশেষ রঙের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতে পরে। আপনি যে সমস্ত হৃদয় দিয়ে এই পক্ষপাতিত্ব করতে চাইছেন ক্যামেরা সেটা বুঝবে না। ধরুন সূর্যোদয়ের বেশ খানিক আগে চরাচর যখন চমৎকার নীল, তখন সেই আলোর মোহে পড়ে আপনি ঐ নীল নিসর্গ ছবিতে ধরতে চাইছেন। এদিকে হোয়াইট ব্যালান্স রেখেছেন ‘অটো’। আপনার ক্যামেরা দারুণ মুনশিয়ানায় আলোকে বিশ্লেষণ করছে এবং দেখছে সেই আলোয় 92% নীল, 4% সবুজ, 3% কমলা, 1% হলুদ। যেহেতু হোয়াইট ব্যালান্স ‘অটো’ (AWB) করে ছবিতে রং নিয়ন্ত্রণের গোটা দায়িত্বটাই আপনি আপনার ক্যামেরাকে দিয়েছেন, সে নিরপেক্ষ থাকার দায়িত্ববোধে ছবিতে নীল রঙের এমন মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি কিছুতেই সহ্য করবে না। তাই ছবিটা তৈরি করছে যখন, সে তার ছবিতে রঙের সুষম বিন্যাসের ধারনা থেকে হয়তো 70% নীল রাখবে আর সবুজ-কমলা-হলুদকে বাড়িয়ে করবে, যথাক্রমে, 14%, 8%, 6%। এমন কি ছবিতে 2% লাল রংও হয়তো সে মিশিয়ে দেবে। সুতরাং যে স্বর্গনীলে মাতোয়ারা হয়ে আপনি শাটার টিপেছিলেন ছবিতে দেখলেন সেই নীল তেমন দানা বাঁধলো না। কেমন একটা মরচে-ধরা নীল হয়ে গেল। দায়টা কার? আপনার ক্যামেরার?

সূর্যোদয়ের বেশ খানিক আগে যে নীল রংটা দেখে আপনি মেতে উঠেছিলেন সেই রঙের কালার টেম্পারেচার, আনুমানিক, 8000 কেলভিন। হোয়াইট ব্যালান্স AWB না হয়ে যদি হত 5500 কেলভিন বা direct sunlight, আপনার ক্যামেরা ধরে নিত আপনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটা ফকফকে সাদা আলোয় ছবি তুলছেন, যে আলোয় VIBGYOR-এর সাতটা রং সমান (100/7)% = 14.29% করে মিশে আছে। ক্যামেরা তখন কোনোরকম মাতব্বরি করত না এবং আসল আলোর 92% নীল রং ছবিতে ঠিক অতটাই থেকে যেত। আর আপনি যদি আরেকটু বেশি ধুরন্ধর হতেন, তাহলে ক্যামেরাকে বিপথে চালিত করতেও পারতেন। পদ্ধতিটা অতি সহজ। হোয়াইট ব্যালান্স করলেন 5000 কেলভিন। বোকা ক্যামেরা বুঝল আপনি যে আলোয় ছবি তুলছেন তা নিরপেক্ষ সাদা নয়, তাতে অল্প সবুজ রং মিশে রয়েছে। ক্যামেরা ধোঁকা খেয়ে সেই বাড়তি সবুজটুকু কাটাতে সবুজের বিপরীতে সাদা আলোর অন্যপারে যে রং—মানে নীল—তাই ছবিতে আরেকটু বেশি মিশিয়ে দিত। ফলে আপনার আসল আলোর 92% নীল ছবিতে হয়তো হয়ে যেত 95%। অর্থাৎ নীল আরেকটু জমাট বাঁধত।

এই একই নিয়ম মেনে বৃষ্টি ও কুয়াশার ছবিতে আবছা নীল আবহটা পেতে চাইলে হোয়াইট ব্যালান্স নিন 5200 কেলভিন। শহরে ধোঁয়াশার ছবি তুলছেন যখন, তখন নাগরিকতার নিরক্ত ধূসর ভাবটা ছবিতে ধরার জন্য হোয়াইট ব্যালান্স হোক 5800-6000 কেলভিন। বরফের ছবি তুলছেন যখন, তখন বরফের ধবধবে সাদা ভাবটা ছবিতে রাখতে চাইলে হোয়াইট ব্যালান্স হতে হবে 6000 কেলভিন। নচেৎ আকাশ বরফে প্রতিফলিত হয়ে বরফকেও নীল করে দেবে। আর বসন্তের শিমুল-পলাশ? বৈপ্লবিক রক্ত-লাল না বিষণ্ণতার ধুলো-লাল? সিদ্ধান্তটা আপনার। মানে আপনার জাগ্রত হৃদয়ের। অটো-মস্তিষ্কের নয় নিশ্চয়ই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement