বাইপোলার অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার

দেবশ্রী মুখার্জি

১৮ মার্চ, ২০১৮

বর্তমান সমাজে হতাশা বা ডিপ্রেশন একটি বহুচর্চিত সমস্যা। পারিপার্শ্বিক ও যান্ত্রিক উন্নয়ন আমাদের অনেকাংশে এগিয়ে দিলেও, হতাশা আমাদের জনসংখ্যার বেশ কিছু মানুষকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

এবার আসা যাক ‘ডিপ্রেশন’ কাকে ব‍‌লে সেই প্রসঙ্গে। ডিপ্রেশন এমন একটি অবস্থা যে অবস্থায় মানুষ পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। তাঁর আত্মবিশ্বাস ও লক্ষ্য চলে যায় সমসাময়িক পরিস্থিতি থেকে সরে যায়। সবসময় সে বিষাদ অনুভব করে।

ডিপ্রেশন মূলত ‍‌তিন প্রকার হয়। (১) ডিসথেমিয়া, (২) মেজর ডিপ্রেশন, (৩) বাইপোলার অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার। প্রতিটি বিষয়টি যথেষ্ট আলোচনার বলেই এখানে শুধুমাত্র বাইপোলার অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বা বি এ ডি নিয়ে আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রাখা হলো।

এই ডিসঅর্ডারে ব্যক্তির মনের দোদুল্যমানতা বা মুড সুইং দেখা যায়। কখনও মন খুব ভালো থাকে, কখনও বা খারাপ থাকে। এই বি এ ডি পুরুষ ও নারীদের মধ্যে সমান হারে হয়ে থাকে। প্রতি ১০০জনে ১ জনের এই রোগ হয়। ৫-৬বছর থেকে ৫০ বছর অবধি বা তারও বেশি বয়সে এই রোগ হয়ে থাকে। পারিবারিক সমস্যাকে প্রত্যহ মুখোমুখি করার জন্য বিবাহিত লোকেদের এই রোগ কম হয়। স্বল্পশিক্ষিত লোকেদের এই রোগ বে‍‌শি দেখা যায়। কারণ এঁরা সমস্যাকে যুক্তি দিয়ে তেমন করে বিচার করতে পারেন না।

বি এ ডি এর বৈশিষ্ট্য : এই রোগের বৈশিষ্ট্য অনেকটা এই রকম। (১) মুড : (ক) ইউথিমিক মুড বা যখন অল্প আনন্দ থাকে। (খ) এক্সপ্যানসিভ মুড বা যখন আরেকটু বেশি আনন্দ থাকে। (গ) ইলেশান বা অনেকটা আনন্দ। (ঘ) ইনফেকশাস বা নকলিকৃত মুড। (ঙ) সুইং মুড বা কখনও ভালো, কখনও খারাপ।

(২) এই রোগীদের চিন্তন প্রক্রিয়া: এরা কখনও বা বেশি কথা বলে, কখনও বা কম কথা বলে। এদের কথার সংগতির অভাব দেখা যায়। কখনও বা এরা নিজেদের কেউকেটা মনে করে।

(৩) আচরণ: (ক) এঁরা সাধারণত হাত-পা সঞ্চালন করতে বেশি পছন্দ করে। (খ) এঁরা নিজেরা ম‍‌নে মনে গান বা নাচ করে থাকে। (গ) এদের মধ্যে ঘুমের অভাব দেখা যায়। (ঘ) এরা কথা বলতে কখনও বেশি পছন্দ করে, কখনও বা চুপচাপ থাকে। (ঙ) অপ্রয়োজনীয় জিনিসের প্রতি এঁরা বেশি দৃষ্টি দেয়। (চ) আনন্দদায়ক কাজকর্মে এঁরা নিযুক্ত থাকতে পছন্দ করে। (ছ) নিজের মনে এরা কোনও লক্ষ্য তৈরি করে এবং সেটি নিয়েই এগিয়ে যায়।

(৪) কথা বলার ধরন: এঁরা যেমন মন, তেমন কথা বলে। এদের কথা বোঝা শক্ত হয়। স্পিচ ডিসটার্বড হয়। এরা কখনও কখনও খুব তাড়াতাড়ি কথা বলে। অনেক রকম রঙ্গরসিকতা দেখা যায় এদের কথার মধ্যে। মাঝেমধ্যে এদের কথার মধ্যে অসংগতি দেখা যায়। আর দেখা যায় ‘নিওলগিজম’ বা নতুন শব্দ গঠনের।

(৫) এদের কোন কিছু পরিলক্ষণে সমস্যা দেখা যায়।

(৬) সেনসেশন এবং কগনিশন (ভাবা): এরা কোনও জিনিস ভালোই সম্পর্কযুক্ত (রিলেট) করতে পারে। এঁদের স্মৃতিশক্তি ভালো।

(৭) এঁরা সাধারণত হঠকারী হয়।

(৮) এঁরা সঠিকভাবে বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। নিয়ম ভাঙতেও এঁদের দেখা যায়। বদলা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় এঁদের।

(৯) সাধারণ মানুষ এঁদের তেমন করে বিশ্বাস করতে পারে না।

চিকিৎসা : (১) এই ধরনের রোগীদের হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করা যেতে পারে। তবে দেখতে হবে হাসপাতালের পরিবেশ যেন রোগীদের উপযুক্ত হয়। (২) কগনিটিভ থেরাপি : এই থেরাপি’র বেশ কয়েকটি ধাপ আছে। যার সাহায্যে ওই ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রিত সম্ভবপর। (৩) ইনটারপার্সোনাল থেরাপি — এই থেরাপির সাহায্যে ইনটারপার্সোনাল বা ফ্যামিলির মধ্যে কার সঙ্গে রোগীর আচরণ কেমন এবং তাঁর সঙ্গে রোগীর মুডের কোনও সম্পর্ক আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হয়। (৪) বিহেভিয়ার থেরাপি — এই থেরাপিতে রোগীর সঠিক আচরণ কি হবে সে বিষয়ে গাইড করা হয়। এছাড়াও রয়েছে (৫) সাইকোঅ্যানা‍‍‌লিটিক্যালি ওরিয়েন্টেড থেরাপি আর (৬) ফ্যামি‍‌লি থেরাপি। এই সব প্রক্রিয়াগুলির সাহায্যে প্রধানত বি এ ডি আক্রান্ত রোগীদের স‍‌ঠিক পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ওই ধরনের মানসিক সমস্যার রোগীদের প্রথমে চাই একটু সহচর্য। তাঁরা যেন কখনই নিজেদের একাকী বলে মনে না করেন। সমস্যা দেখা গেলে প্রথমেই ওই ব্যক্তির চিকিৎসা করা বাঞ্ছনীয়। না হলে মানসিক বিকার অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে। সর্বোপরি এই রোগে পরিবারের ভূমিকা অনেকটা।

Featured Posts

Advertisement