গোল্ডকোস্টে সোনার
সন্ধানে সোনিয়া

১৮ মার্চ, ২০১৮

এপ্রিলে শুরু হবে কমনওয়েলথ গেমস। সেখানে অ্যাথলেটিক্সে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করবেন সোনিয়া। রায়গঞ্জের নেতাজীপল্লির মেয়ের। অনেক বাধা টপকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছেছেন। পদক জয়ের লক্ষ্যে অবিচল এই বঙ্গ কন্যাকে নিয়ে লিখলেন বিশ্বনাথ সিংহ।

----------------------------------------------------------

কখনও মাঠে, কখনও বা অনুশীলনে, একের পর এক বাধাকে অতিক্রম করেই বিশ্বের দুয়ারে পৌঁছালো ছিপ ছিপে ছোট্ট মেয়েটা। বয়স তখন ১১ বছর। ফর্সা, ছিপছিপে, রোগা মেয়েটা  উদয়পুর স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠে পৌঁছাতেই বাধ সাধল বয়স। এত ছোট্ট মেয়ের অ্যাথলেটিক্সে অ্যাডমিশন সম্ভব নয়। বাবার হাত ধরে মাঠের এক কোণে চোখের জল ফেলেছে। হাল ছাড়তে রাজি হয়নি। খেলার প্রতি অদম্য জেদ।

কাছে ডেকে নিলেন রায়গঞ্জের কোচ কৃষ্ণচন্দ্র রায়। যার পোশাকি নাম কেসিদা। একদা সেনাবাহিনীর রক্ষী কেসিদা জীবনের শেষদিনটাও ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার তালিম দিতে রায়গঞ্জের উদয়পুর মাঠটাকে আঁকড়ে ছিলেন। কেসিদা ছোট্ট মেয়ের কান্না দেখে ব্যায়াম চর্চার নির্দেশ দিলেন। উদয়পুর মাঠের এক কোণ থেকে দৌড় শুরু। সেখান থেকেই শুরু হয়ে গেল জীবনের অধ্যায়। রায়গঞ্জের একটা বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়াশুনার চাপ, তার উপর খেলাধুলা। দুই চাপকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিল। এই উদয়পুর মাঠ থেকে বেড়ে ওঠা আরও কয়েকটা ছেলে মেয়ের। ছোট্ট মেয়েটা ১০০/২০০/৪০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতা দিয়েই আত্মপ্রকাশ। তখন বয়স ১২-১৩ হবে। উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ শহরের নেতাজীপল্লির সোনিয়া বৈশ্য। বাবা বরেণ বৈশ্য, মা মমতা বৈশ্য। দুই মেয়ে তানিয়া আর সোনিয়া, ছেলে বিশালকে নিয়েই বৈশ্য পরিবার। ২০০৭ সালের মাসটা মনে না পড়লেও সালটা খুব ভালো করে মনে পড়ে গেল মা মমতা বৈশ্যর। চরম প্রতিবন্ধকতা। উদয়পুর মাঠের সোনিয়ার নাম সিলেক্ট করে জেলা ক্রীড়া সংস্থা পাঠিয়েছে কলকাতায়। সল্টলেকে অনুশীলন হবে। বাবা বরেন বৈশ্য মেয়েকে সঙ্গে করে অনুশীলন কেন্দ্রে পৌঁছালেন। আবার সেই বয়সের প্রতিবন্ধকতা। ছোট্ট মেয়েটার এই আসরে জায়গা হবে না।

মাঠে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আরও অনেক মেয়ে। রায়গঞ্জ থেকে কলকাতা সব বাধাকে টপকে জিততেই হবে সোনিয়াকে। অনুশীলন মাঠের দায়িত্ব অ্যাথলেটিক কোচ জ্যোতির্ময়ী শিকদার। তিনি জানতে পারলেন। সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসে কাছে ডেকে নিলেন ছোট্ট সোনিয়াকে। প্র্যাক্টিসের পর প্র্যাক্টিস চালিয়ে যায় সোনিয়া। অনূর্ধ্ব ১৪ বিভাগে ৮০০ মিটার দৌড়ে এবং লং জ্যাম্পে রাজ্যে ২য় স্থান করে নিয়েছে সোনিয়া। রায়গঞ্জের ছোট্ট মেয়ে সোনিয়া বৈশ্যর যৌবনে উজ্জ্বল দীপ্তিতে উদ্ভাসিত প্রতিটা মুহূর্তে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অদম্য জেদ এক্কেবারে সামনে এনে দিল ২০১৫ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর  জাতীয় গেমসের প্রতিযোগিতায় সোনার পদক। সোনার পদক ছিনিয়ে নিতেই চারিদিকে পরে গেল তুমুল হই চই। শুভেচ্ছার পর শুভেচ্ছা।

১৮তম এশিয়ান গেমসের আমন্ত্রণী প্রতিযোগিতায় ৪০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় সোনা জিতে আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলার নাম গৌরবান্বিত করেছে রায়গঞ্জের মেয়ে সোনিয়া বৈশ্য। লড়াইয়ের মাঠ এটা। একার লড়াইটাও একটা অধ্যায় সোনিয়ার কাছে। লাইফ ফর স্ট্রাগল স্ট্রাগল ফর লাইফ। জীবন সংগ্রামে একের পর এক বাধার কাঁটা তুলে সাফল্যের শিখরে উদয়পুর মাঠের অনুশীলনের সেই ছোট্ট মেয়েটা। বয়স এখন ২২। বয়স কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল উদয়পুর থেকে সল্টলেক। বাংলার খেলাধুলার পরিবেশ পরিকাঠামো জর্জরিত। সেদিনের ছোট্ট সোনিয়ার ঘাম ঝরানো লড়াইয়ের মাঠে বাবা বরেণ বৈশ্য মা মমতা বৈশ্যর সাহচার্য অনুপ্রেরণা। একার লড়াইয়ে সামনে এশিয়ান গেমস। লক্ষ্য ভেদের নজর এখন সেদিকেই। 

রায়গঞ্জের নেতাজীপল্লি এলাকার বাসিন্দা সোনিয়া এশিয়ান গেমসে ইনভিটেশন টুর্নামেন্টে দেশের হয়ে ৪০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় কমনওয়েলথ গেমসে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে। ১৫ই মার্চ দিল্লী থেকে দুপুরে রওনা দিল সোনিয়া। অস্ট্রেলিয়ায় গোল্ডকোস্টে শুক্রবার ভারতীয় সময় সকালেই পৌঁছালো সোনিয়া। কমনওয়েলথ গেমসে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে চলেছে রায়গঞ্জ তথা এ দেশের গর্ব সোনিয়া বৈশ্য। ৪০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় সে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার ডাক পেয়েছে। গত অক্টোবর মাস থেকেই পাঞ্জাবের পাতিয়ালাতে অনুশীলন শুরু করে দিয়েছে সোনিয়া। পাতিয়ালাতে ব্যাপক ঠান্ডায় অনুশীলনে বাধা। নভেম্বর মাস থেকে কেরালার ত্রিবান্দ্রমে অনুশীলন শুরু হয়। বিদেশি অ্যাথলেটিক কোচ গালিনার তত্ত্বাবধানে অনুশীলন চলতে থাকে শীতের মরশুমটায়। ত্রিবান্দ্রমের তালিম শেষে ১২ই ফেব্রুয়ারি।

সংবাদ মাধ্যমে খবর চাউর হতেই সোনিয়ার নেতাজীপল্লির বাড়িতে তাঁর পরিজনদের শুভেচ্ছা জানাতে পৌঁছে যান অনেক ক্রীড়ামোদী। এখবর পেয়ে সোনিয়া বৈশ্যকে টেলিফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরোর সদস্য সাংসদ মহম্মদ সেলিমও।  মহম্মদ সেলিম সোনিয়াকে ও তার পরিবারকে জানিয়েছেন, ন্যাশনাল ক্যাম্পে অথবা অন্যত্র কোনওরকম প্রয়োজনে সর্বোতভাবে সহায়তায় তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement