মমতার ভয় মানুষকে,
ভরসা তাই হামলায়

চন্দন দাস

৮ এপ্রিল, ২০১৮

তিনি বলেন,‘‘আমি কাউকে ভয় পাই না।’’ সেই তিনি, মমতা ব্যানার্জি এই বর্ষশেষের বাংলায় বুথ দখল, এলাকা দখল, গ্রাম কবজার পর বি ডি ও অফিস ঘেরাওয়ে পৌঁছেছেন। ভোট লুট করে বেশ কয়েকটি নানা নির্বাচন জিতেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এবার সেই দল ভোট আটকাতে নেমেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভয় পাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী।

এই চৈত্রে ফুল ফুটেছে সংগ্রামের। ভাগচাষি, খেতমজুরের মাটির উঠান থেকে কান্না এসে প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্লক অফিসের সামনে। রক্তে ভিজে যাচ্ছে মাটি। সব প্রান্তর নিঃশেষে নলহাটি, ভগবানপুর হয়ে উঠতে চাইছে। আমার চেনা ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা বসুন্ধরা এই বসন্তে প্রতিরোধ-ভালোবাস-যুদ্ধের যৌথখামার হয়ে উঠছে।

কিন্তু কেন?

Bold/ sub head কাজ নেই, তাই সংগ্রাম:

পশ্চিমবঙ্গ গ্রাম-প্রধান। গ্রামে সিংহভাগ মানুষের বাস। ২০০৮-এ হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালের শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচন। সেবার নির্বাচন হয়েছিল। গ্রামবাসীরা ভোট দিয়েছিলেন। সেবার ১৭টি জেলাপরিষদ ছিল। বামফ্রন্ট জিতেছিল ১৩টিতে। পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল। কংগ্রেস জিতেছিল মালদহ এবং উত্তর দিনাপুরে। জেলাপরিষদের ৭০ ভাগ আসনে, পঞ্চায়েত সমিতির ৫৭ ভাগ আসনে বামফ্রন্ট জয়ী হয়েছিল। গ্রাম পঞ্চায়েত পর্যায়ের ৪৯ ভাগ আসনে বামফ্রন্ট বিরোধীরা জয়ী হয়েছিল।

দশ বছর আগে, সেবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে শিল্প এবং জমি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বামফ্রন্টের প্রচারের মুখ্য কথা ছিল — কাজ চাই। তাই চাই শিল্প। তবে চাষের কিংবা রাজ্যের খাদ্যের স্বম্ভরতাকে ক্ষতি করে নয়। পাশাপাশি চাই কৃষির আরও বিকাশ। লক্ষ্য — পঞ্চায়েতের মাধ্যমে মানুষের হাতে আরও ক্ষমতা। অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জিসহ বামফ্রন্ট বিরোধীদের প্রচার ছিল — বামফ্রন্ট জমি কেড়ে নিচ্ছে। কৃষকদের মেরে ফেলবে। সংখ্যালঘুদের জমি বেশি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ওই পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে সিঙ্গুরে প্রায় নব্বই ভাগ তৈরির কারখানা বন্ধ করার ‘সংগ্রামে’ অনেকটা সফল হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। নন্দীগ্রামের ঘটনাকে ঘিরে দেশজুড়ে সি পি আই(এম)-র প্রচার ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর নানা ধরনের বন্ধুরা। পরিস্থিতি অন্যান্যবারের মতো নয়, বামফ্রন্ট বুঝেছিল। তবু বামফ্রন্ট পঞ্চায়েত নির্বাচন ভন্ডুল করার কোনও চেষ্টা করেনি।

প্রশাসনিক ক্ষমতা, সরকার হারানোর আশঙ্কা প্রশ্রয় পায়নি আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ভবনে। ২৬শে মে, ২০০৮ সি পি আই(এম) রাজ্য কমিটির সভা শেষে পার্টির তৎকালীন রাজ্য কমিটির সম্পাদক বিমান বসু বলেছিলেন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করায় জোর দেবে পার্টি। আর সেদিনই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, গরিব মানুষ শুধু নন, গরিবের মধ্যেও যাঁরা খুব গরিব, তাঁদের কাছেও উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়াই শিল্পায়ন কর্মসূচির লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের কৃষি ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন ঘটিয়ে এমনভাবে শিল্প এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের দ্রুত বিকাশ চায়, যাতে তার সুফল গ্রাম ও শহরের গরিবস্য গরিব মানুষের কাছেও পৌঁছোয়। সেদিন একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন ভট্টাচার্য। বলেছিলেন, বিকাশের হার বাড়ল অথচ তার কোনও সুবিধা গরিবের কাছে পৌঁছাল না, এমন উন্নয়ন অর্থহীন।

ভোট লুটের চক্রান্ত হয়নি। নির্বাচনের তুলনামূলক খারাপ ফলের পর্যালোচনার সময়েও গরিবের উন্নয়নের জন্য কর্মসূচি ছিল পাখির চোখ।

কারণ — রাজ্যের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল কাজের সুযোগ তৈরি। যাঁরা বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি তাঁদেরও কাজের দরকার। যাঁরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরাও কাজের খোঁজে ছিলেন।

দশ বছর পর আমরা কোথায়? সেদিনের চ্যালেঞ্জ আজকে সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে। মমতা ব্যানার্জির কোনও লক্ষ্য নেই পশ্চিমবঙ্গের জন্য। তাই কাজের সুযোগ তৈরির কোনও ব্যবস্থা তিনি নেননি। তাঁর কোনও দর্শন, নির্দিষ্ট ভাবনার পথ নেই। ফলে চপের দোকান শিল্পের মহিমা অর্জন করেছে তাঁর আমলে, তাঁরই ভাষণে। ২০০৮-এ কৃষি আর নতুন কাজ তৈরি করতে পারছিল না। ২০১৮-তে তা আরও অসম্ভব। বড় শিল্প হয়নি। ফলে ছোট, মাঝারি শিল্পের অগ্রগতি মূলত রাজ্য সরকারের হিসাবে পাওয়া যাচ্ছে — বাস্তবে চোখে দেখা যাচ্ছে না। ফলে মমতা ব্যানার্জি যখন বলছেন, রাজ্যে ৮১লক্ষ চাকরি হয়েছে। বুথ পিছু ১০৫জনের চাকরি হয়েছে। তাঁর দলের কর্মীরাও হাসছেন।

এমন পরিস্থিতিতে গ্রামের নির্বাচন মমতা ব্যানার্জির পক্ষে বিপজ্জনক। বুথ দখলেও পুরোটা সামলানো যাবে বলে তাঁর মনে হয়নি। তাই বি ডি ও অফিস ঘেরাও। ব্লক অফিসের সামনে বোমাবাজি, হামলা। বৃদ্ধ, মহিলা — কারও রেয়াত নেই।

হামলার কারণ — মমতা ব্যানার্জি ভয় পেয়েছেন।

Bold/ sub head লুট নয়, প্রাপ্য চাই:

আজকের পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতি প্রসারিত। স্রেফ লুটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে পঞ্চায়েত। এই লুটে একাংশের গরিব মানুষকে জড়িয়ে নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা। উদাহরণ — রেগা প্রকল্প। একশো দিনের কাজের এই প্রকল্পে কাজ না হওয়া সত্ত্বেও জব কার্ড পিছু টাকা উঠেছে। তার বড় অংশ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের পকেটে গেছে। অল্প অংশ সেই জবকার্ডধারী পেয়েছেন। গ্রামের রন্ধ্রে দুর্নীতি, লোভ ছড়িয়ে দিয়েছে মমতা ব্যানার্জির দল। কিন্তু এর বাইরে একটি বড় অংশের মানুষ আছেন। যাঁরা লুটের টাকা নেননি কিংবা পাননি। তাঁরা কাজ চান। নিজের প্রাপ্য চান। সন্তানের সামনে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চান। তাঁরা এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। বামফ্রন্ট জানে। তৃণমূল কংগ্রেসও জানে।

যে জমির নামে লড়াই করে মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে পৌঁছেছেন, সেই জমি চুরি হয়েছে গত সাত বছরে — দেদার। রাজ্যের ভূমিমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তাঁর সেই দপ্তর একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা(নং-২৫৫৫) জারি করে জানিয়েছে, রাজ্যের অনেক জমির মালিকের নাম পালটে গেছে। প্রকৃত মালিকের নাম মুছে অন্যজনের নাম বসানো হয়েছে। পাশপাশি পালটে দেওয়া হয়েছে জমির চরিত্র। নির্দেশটিতে রাজ্যের যুগ্ম ল্যান্ড রিফর্মস কমিশনার শেখর দত্ত সই করেছেন গত বছরের ৮ই আগস্ট।

রাজ্যের ল্যান্ড রেকর্ড অ্যান্ড সার্ভেস এবং জয়েন্ট ল্যান্ড রিফর্মস কমিশনারের অফিসের পর্যবেক্ষণ হলো —‘‘এও দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে এই অফিসাররা জমির রেকর্ডস অব রাইট(আর ও আর)-র পবিত্রতা মারাত্মকভাবে নষ্ট করে জমির অধিকারীর নাম মুছে দিয়েছেন অথবা জমির চরিত্র বদলে দিয়েছেন...।’’ এবং ‘‘এই প্রবণতা সব নিয়মকানুনকে বাতাসে উড়িয়ে আশঙ্কাজনক পরিমাণে পৌঁছেছে।’’

অর্থাৎ রাজ্যের প্রচুর জমির প্রকৃত অধিকারীর নাম পালটে দেওয়া হয়েছে, জমির চরিত্র বদলে দেওয়া হয়েছে। আর এই সবই হয়েছে গত কয়েকবছরে জমির নথি কম্পিউটার বন্দি করার সময়। অনেক বর্গাদারের চাষের অধিকারও এই পদ্ধতিতে কেড়ে নেওয়া হয়েছে — জানাচ্ছে ওই নির্দেশই। জমির পরিমাণ কত? সরকার জানানোর ভরসা পাচ্ছে না। কারণ, প্রচুর অভিযোগ, ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে এই নিয়ে। সরকার এখন দাবি করছে ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরের অনেক আধিকারিকরাই দায়ী। কিন্তু শুধু অফিসারদের কাণ্ড এটি হতে পারে না। এত বড় একটি দুর্নীতি, এত মানুষকে জমির অধিকার থেকে ছিটকে দেওয়ার কাজে অফিসারদের মদত দেওয়া, তার থেকে কমিশন নেওয়ার কাজটি তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারাই করেছেন বলে অভিযোগ।

গ্রামবাংলায় এখন এমন জমিচুরির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এমন শক্তি একটিই — তা তৃণমূল কংগ্রেস। এছাড়াও বহু পাট্টাদার, বর্গাদারকে উচ্ছেদ করে গরিবের জমি দখল করেছে শাসকদলের কর্মীরা। তারও পরিমাণ কয়েক হাজার একর। এছাড়া নাণ্টু প্রধানের অভাব নেই তৃণমূল কংগ্রেসে। তারা জোর করে জমি দখল করেছে গরিব গ্রামবাসীদের — তা তিনি সংখ্যালঘুই হোন কিংবা আদিবাসী।

এই দেদার চুরির প্রভাব ব্যালটে পড়বে — আশঙ্কা আছে। তাই ভয় পেয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। বুলেট, বোমা, লুম্পেন ছাড়া আর কে ভরসা হতে পারে এমনকালে?

Bold/ subhead ব্যারিকেডই ঠিকানা কৃষকের:

রাজ্যের গ্রামের আর এক সংকট কৃষিতে। মমতা ব্যানার্জি শিল্প আনতে পারেননি। কৃষিরও বিকাশ ঘটাতে পারেননি। ফল কী হয়েছে? এরাজ্যের কৃষকরা ধান পাট আলু সবজি কোনও কিছুরই দাম পাচ্ছেন না। একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ফসল বিক্রির সময় দাম পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ বাজারে সেই ফসলই বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের ১৬টি রাজ্যে ধানের অভাবী বিক্রি নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। একটি সপ্তাহের পাঁচদিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে সেই রিপোর্টেই দেখানো হয়েছে, ১৬টি রাজ্যের মধ্যে ধানের অভাবী বিক্রিতে শীর্ষে ছত্তিশগড়। দ্বিতীয় স্থানে তামিলনাড়ু। তারপরেই স্থান পশ্চিমবঙ্গের। ১৬টি রাজ্যের ধান বিক্রির পাইকারি বাজারে কত ধান এসেছে, সেই ধান কত দর দিয়ে বিক্রি হয়েছে, এই সব তথ্য বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিবেদনে তৈরি করে পাঠানো হয়েছে রাজ্যগুলিতে। আর তাতেই ফুটে উঠেছে এরাজ্যে ১৬টি পাইকারি বাজারে ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের থেকে কুইন্টাল পিছু ২০০থেকে ৩৫০টাকা কম দরে বিক্রি হয়েছে ধান।

তাড়াতাড়ি এই অবস্থা বদলাতে নাবার্ডের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে রিপোর্টে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কৃষি সমবায়গুলিকে শক্তিশালী করা। সমবায়গুলির ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা এবং সেগুলিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে সমবায়গুলির সদস্য বাড়ানো, বিশেষত যাঁরা ঋণ নেবেন তাঁদের বেশি করে সদস্য করার সুপারিশ করা হয়েছে। সমবায়গুলিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে নাবার্ডের সুস্পষ্ট পরামর্শ হলো — সেগুলি পরিচালনায় গণতান্ত্রিক এবং পেশাদারি মনোভাব নিয়ে সমবায় ব্যাঙ্কগুলিকে পরিচালনা করতে হবে।

যদিও রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ঠিক উলটো করেছে। সমবায়গুলিতে দেদার দুর্নীতি। সমবায়গুলি ধ্বংসের মুখে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, কর্মীরা সমবায় নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। কৃষকরা যেতে পারেন না সমবায়গুলিতে। তৃণমূল কংগ্রেসের দলতন্ত্র এবং দুর্নীতিতে সমবায় ব্যাঙ্কগুলির অবস্থা খুবই খারাপ হয়েছে গত কয়েক বছরে। অনেক সমবায়ে নির্বাচনই হয়নি। যেখানে হয়েছে সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিরোধীদের নির্বাচনে দাঁড়াতেই দেওয়া হয়নি। কৃষকদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই পরিবেশ যথেষ্ট প্রতিকূল হয়েছে — নাবার্ডের রিপোর্ট তাই জানাচ্ছে।

অর্থাৎ কাজের মারাত্মক অভাব, কৃষির সংকট এবং যথেচ্ছ লুট — হয়ে দাঁড়িয়েছে আতঙ্ক। এমন সময়ে কে রক্ষা করতে পারে? প্রবল সন্ত্রাসই হতে পারে রক্ষাকর্তা।

Featured Posts

Advertisement