রূপের সন্ধানে রূপকুণ্ড

সুপর্ণা চক্রবর্তী

৮ এপ্রিল, ২০১৮

উচ্চতার সাথে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার কথা মাথায় রেখে দুদিন ওয়ান গ্রামে থেকে রূপকুণ্ডর উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করব এমনই ট্যুরের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ভারতীয় রেলের কৃপায় চব্বিশ ঘণ্টা দেরিতে যখন হরিদ্বার স্টেশনে ঢুকলাম তখন পূর্ব পরিকল্পনা বাতিল করা হলো। হরিদ্বার থেকে তখনই চলে গেলাম ঋষিকেশে। কারণ ওয়ান গ্রামে পৌঁছানোর জন্য যে গাড়ির সাথে অন্তত চার মাস আগে কথা হয়েছিল সেই ড্রাইভার আমাদের জন্য ঋষিকেশে অপেক্ষা করছিলেন। সেদিন ঋ‍‌ষিকেশে রাত কা‍টিয়ে পরদিন ভোর পাঁচটায় ওয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পাহাড়ি পথ, বহু জায়গায় ‘ল্যান্ড স্লাইড’-এর কারণে বড় বড় পাথরখণ্ড প‍‌ড়ে আছে। ত‍‌বে আমাদের ড্রাইভারের হাত অসম্ভব ভালো ছিল ফলে কখনই বিপদের সম্ভাবনা আছে এটা মনে হয়নি। মাঝখানে খাওয়ার জন্য দুজায়গায় দাঁড়ানো ছাড়া টানা ৩১১কি.মি. রাস্তা পাড়ি দিয়ে যখন ওয়ানে পৌঁছালাম তখন প্রায় বিকেল। লোহার জং-এ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আমাদের পোর্টার গাইড মান সিং পিমোলি। প্রায় আট মাস আগে যখন রূপকুণ্ড ট্রেনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল তখনই আমরা যোগাযোগ করেছিলাম মান সিং-এর সাথে।

মান সিং-এর ব্যবস্থাপনায় আমাদের চারজনের সে রাত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হলো একটা ‘হোম স্টে’ তে। ওয়ানে পৌঁছে ঠান্ডায় ঘরে সিটিয়ে না গিয়ে হাঁটতে বেরোলাম একটু এদিক-সেদিক। তবে প্রায় যখন ছটা তখন স্থানীয় মানুষজন রাস্তায় এভাবে ঘুরে বেরতে নিষেধ করলেন কারণ রাতে নাকি ভালুক বেরোয়। এতোটা রাস্তা গাড়িতে আসায় সবাই আমরা বেশ ক্লান্ত ছিলাম। তা ছাড়া পরের দিন সাড়ে আটটায় বেরতে হবে এমনই নির্দেশ ছিল গাইডের। তাই নটার মধ্যেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, একটি দুটি নেটওয়ার্ক ছাড়া ফোনের কোনো যোগাযোগই ছিল না। তাই একটা ফোন থেকেই আত্মীয়স্বজনকে জানিয়ে দেওয়া হলো, আগামী ছদিন আমরা সভ্যতার আধুনিকতম ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত থাকবো।

পরদিন সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে প্রাতঃরাশ খেয়ে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও বেরতে কিছুটা দেরিই হয়ে গেল। ট্রেকিং-এর প্রথম শর্ত যতটা সম্ভব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া, কারণ বেলা বাড়লে একদিকে ক্লান্তি অন্যদিকে আকাশ মেঘে ঢেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে পথ চলতে বেশ অসুবিধা হয়। ওয়ান গ্রামটা চারিদিকে সবুজে ঘেরা। প্রচুর আলু আর রামদানার চাষ হয়েছে। খানিকটা হাঁটার পরই একটা রাস্তা উঠে গেছে লাটু মহারাজের মন্দিরের দিকে। এই লাটু মহারাজ দুর্গা বা পার্বতীর ভাই। সারা ভারতে এঁর এই একটাই মন্দির। পুরাণ মতে, পার্বতী শিবের ধ্যানে মগ্ন হয়ে নন্দাদেবী পর্বতের দিকে যেতে গিয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছিলেন। তখন পার্বতীর ভাই লাটু মহারাজ ছদ্মবেশে ঘোড়ায় চেপে এসে পার্বতীকে ঠিক পথ বলে দিয়েছিলেন। পার্বতী খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে। লাটু মহারাজ নিজের রূপ ধারণ করে বর চান যে, যারাই এই রাস্তা দিয়ে যাবেন প্রত্যেকেই যেন লাটু মহারাজের পুজো দিয়ে যান— সেই থেকে এই মন্দির সৃষ্টি। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আমাদের সঙ্গে গাইড মান সিং ছাড়াও তার পরিবার (স্ত্রী ও পুত্র) আমাদের সঙ্গে ছিল, যারা ইতিমধ্যে ৫-৬বার রূপকুণ্ড গিয়েছে। ছেলেটি পড়ে ক্লাস এইটে। বাবার মতোই তারও ইচ্ছা ভবিষ্যতে গাইড হওয়ার। আমরা বাঁ হাতে লাটু মহারাজের মন্দিরকে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি পাহাড়ই পথ বেয়ে। আমাদের আজকের গন্তব্য ১২কি.মি. দূরে বেদিনী বুগিয়াল। স্যাঁতসেঁতে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অল্পবিস্তর চড়াই ভেঙে দু’কিলোমিটার যাওয়ার পর আমরা এসে পৌঁছালাম রন-কা-ধারে। এখানেই যাত্রীদের নাম নথিভুক্ত করতে হয়। সবাই মিলে লেবু-চা খেয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে সোজা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নামতে লাগলাম নীল গঙ্গা নদীর তীরে। কংক্রিটের সেতু পেরিয়ে এবার শুরু হলো চড়াই। দমফাটা চড়াই। আগের দুদিন বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা বেশ কিছুটা পিচ্ছিল। তাছাড়া খচ্চর যাওয়ার ফলে রাস্তার অবস্থাও ভালো নয়। ক্লান্তি কাটানোর মাঝে মাঝে কাজু, কিসমিস, লজেন্স অথবা গ্লুকোজ খেয়ে নেওয়া হচ্ছে। দুপুর দুটো নাগাদ পৌঁছালাম ঘরেলি পাতাল। সেখানেই সারা হলো খিচুড়ি আর পাঁপড় ভাজা সহযোগে মধ্যাহ্নভোজ। আবার পথ চলা। চলার পথে স্থানীয় মানুষজন বিশেষ চোখে পড়ে না। কিছু ট্রেকার্স যারা নেমে আসছেন রূপকুণ্ড দেখে তারা আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। প্রচণ্ড চড়াই পার হয়ে প্রায় সন্ধ্যে ছটার সময় গিয়ে পৌঁছালাম বেদিনী বুগিয়ালে। তখনও যেন পরিস্কার আকাশে খানিকটা সূর্যালোকের আভা রয়ে গেছে। চারিদিক সবুজ ঘাসে মোড়া। দূরে মাথা তুলে আছে চৌখাম্বা, ত্রিশূল, নন্দাঘুণ্টি, হাতি, খোড়ি, বন্দেরপুচ্ছ, রন্টি, কাশীডাক। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে কর্ণাটক থেকে আসা একদল ছেলেমেয়ের কলধ্বনি। কোনো এজেন্সির সাথে এসেছে রূপকুণ্ড ট্রেকে। গন্তব্যে পৌঁছানোর সাথে সাথে মান সিং আর তার সঙ্গীদের আতিথেয়তায় সারাদিনের পথচলার ক্লান্তি দূর করল। বেশ কয়েকটা ডোম টেন্ট ছাড়াও ইউথ হোস্টেলের দুটি স্থায়ী টেন্ট ছিল। আমাদের গাইড সেখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করল। কারণ, পুরো টেন্টটা টিনের তৈরি, মাটিতে কাঠের পাটাতন ফেলা। ঠান্ডাটা তুলনায় কম লাগবে তাই এই বন্দোবস্ত। আর সবার জন্য ঠান্ডাটা এবার বেশ মালুম হচ্ছে। রাত আটটার মধ্যেই নৈশ আহার সেরে সোজা ঢুকে পড়লাম স্লিপিং ব্যাগে।

পরদিন ভোরবেলা যখন ঘুম ভেঙে বাইরে এলাম যে দৃশ্য অবর্ণনীয়। চারিদিকে যেন সবুজের কার্পেট। এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম এই বুগিয়ালের কথা অনেক শুনেছি। আজ নিজের চোখে দেখা। নিচের দিকে পাইন গাছের ঠাস বুনোট আর উপরের দিকে সবুজ ঘাসের গালচে, দূরে গভীর খাদ, আর সামনে দৃশ্যমান শ্বেতশুভ্র বরফাচ্ছাদিত শৃঙ্গরাজ। মন যেন বলে ওঠে, ‘‘স্বর্গ যদি কোথাও থাকে। নামাও তারে মাটির পর।’’ কথিত আছে, বেদব্যাস এখানে বসেই বেদ রচনা করেন। তাই তার নাম বৈদিনী বা বেদিনী। এখানেই আছে বেদিনীকুণ্ড আর তার পাশে পাথরের ছোট্ট মন্দিরে বিরাজমানা অষ্ট ধাতুর ‘দেবি দুর্গা’ আর একটি মন্দিরে নাকি রয়েছে ব্যাসদেবের খড়ম। বৈদিনী কুণ্ডের জলে পড়েছে ত্রিশূল, নন্দাঘুণ্টি, রণ্টির দুধ সাদা শৃঙ্গের ছায়া। এক অপার্থিব সৌন্দর্য। কুণ্ডটাকে বাঁদিকে রেখে বুগিয়ালের ধার দিয়ে উঠতে লাগলাম। ওপর দিয়ে রাস্তা গেছে। এরপর মোটামু‍‌টি ভালো রাস্তা। দুকিলোমিটার পথে এলো ঘোড়া লোটানি। পাহাড়ের ধার দিয়ে রাস্তা, ডানদিকে গভীর খাদ। বেদিনীর পরই গাছের সংখ্যা একদম কমে যাওয়ায় অক্সিজেনের খানিকটা অসুবিধা শুরু হয়ে যায়। দুকিলোমিটার মোটামুটি ভালোরাস্তার পর যত্রতত্র বেশ কিছু বোল্ডার পড়ে থাকতে দেখা গেল। পাশেই দেখলাম পর পর বেশ কয়েকটা গভীর বড় গর্ত। কথিত আছে, প্রাচীনকালে কনৌজের রাজা যশদয়াল তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন লোকলস্কর নিয়ে। এই স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রাজাকে মুগ্ধ করে। রাজা তীর্থের কথা ভুলে গিয়ে আমোদ প্রমোদে ডুবে যান নর্তকীদের নিয়ে। দেবতা রুষ্ট হন, শুরু হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নন্দাদেবীর কোপ পড়ে নর্তকীদের ওপর। তিনি অভিশাপ দিয়ে তাদের পাথরে পরিণত করেন। সেই কারণেই নাম হয় পাথর নাচুনি। পাথর নাচুনি থেকে সারা রাস্তা ঝুরো পাথরে ভর্তি। খাদের ধার দিয়ে হাঁটার সময় বাতাসের প্রাবল্য বেশ মালুম হতে থাকে। কঠিন চড়াই পথ পাড়ি দিয়ে মন্দিরের ধ্বজা দেখে বোঝা গেল কালুয়া বিনায়ক এসে গেছে। পনের মিনিট চা পানের বিরতি। এখানে ছোট্ট কষ্টি পাথরের দ্বারপাল গণেশ। মন্দির চত্বর ছাড়িয়ে এগতেই চোখে পড়ল। ব্রহ্মকমল ফোটার আসল সময় জুলাই আগস্ট। কিন্তু পুজোটা এবার সেপ্টেম্বরে হওয়ায় এটা আমাদের বাড়তি পাওনা। হাজারে হাজারে ফু‍‌টে আছে পাহাড়ের গায়ে। আমাদের দ্বিতীয় দিনের টেন্ট ফেলা হলো এই পাথর নাচুনিতেই। ঠান্ডা যে ক্রমশ বাড়ছে তা এখানে এসে বেশ বোঝা গেল। দুপুরে খিচুড়ি, পাঁপড়ভাজা, আচার সহযোগে বেশ জমিয়ে খাওয়া হলো। সূর্য অস্ত না যাওয়া পর্যন্ত বাইরে একটু ঘোরাঘুরি। গল্প, ছবি তুলে সময়টা কাটিয়ে দিলাম। কারণ ক্লান্ত দেহে একবার টেন্টের ভেতর স্লিপিং ব্যাগে সেঁধোলে আর উঠতেই ইচ্ছা করবে না। মান সিং-এর স্ত্রীয়ের আমাদের প্রতি আন্তরিকতা, যত্ন, অনেক সময়ই যেন নিকটাত্মীয়ের সাথে সময় কাটানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। মাঝে মাঝেই গরম চা, স্যুপ শরীর গরম রাখার যাবতীয় বন্দোবস্ত। আর তার মাঝেই ‘অক্সিমিটারে’ মান সিং দেখে নিচ্ছে আমাদের শরীরের অক্সিজেনের পরিমাপ।

পরের দিন আবার সকাল ৮টায় পথচলা শুরু হলো। আমাদের আজকের গন্তব্য ভাকুয়াবাসা। যেখানে আমাদের যাওয়ার পথে শেষ ক্যাম্পটা ফেলা হবে। দুপুর বারোটায় ভাকুয়াবাসা পৌঁছানোর সাথে সাথে কোথা থেকে মেঘ উড়ে এসে চারিদিকটা ছেয়ে ফেলল। তারপরই শুরু হলো বরফবৃষ্টি (....)। বেশ মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ পরের দিন আমাদের রূপকুণ্ড ওঠার শেষ ট্রেইল। বেশি বরফ পড়ে গেলে রাস্তা আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। তবে আধঘণ্টার মধ্যেই সেই বরফ পড়া কমে গেল। টেন্টে বসেই দেখতে পেলাম পরিষ্কার আকাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিশূল আর নন্দাঘুণ্টি। বেশ খানিকক্ষণ বাইরে থাকার পর প্রচণ্ড ঠান্ডায় তাঁবুর ভেতর আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। সারা সন্ধ্যে স্লি‍পিং ব্যাগে পা গলিয়ে একের পর এক গান গেয়ে চললাম আমরা। কখন যে নৈশ আহারের সময় হয়ে গেল বুঝিনি। পরের দিন যেহেতু রাত্রি তিনটের সময় বেরিয়ে পড়তে হবে তাই গাইডের নির্দেশে আটটার মধ্যেই শুয়ে পড়তে হলো। রাত তিনটের সময় মোবাইলে অ্যালার্ম বাজতেই তৈরি হয়ে নিলাম আমাদের লক্ষিত পথের উদ্দেশে। প্রত্যেকের মাথায় হেড টর্চ। যত রকম ঠান্ডার পোশাক সঙ্গে ছিল তা গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রূপকুণ্ড-জুনারগলি পাসের উদ্দেশ্যে। ঘন অন্ধকার, প্রচণ্ড হিমেল হাওয়ায় শরীর যেন জমে যাচ্ছে। গোটা রাস্তাটা শুধুই বোল্ডার, চড়াই ভেঙে উঠে যাওয়া। আগের দিন বরফ বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা বেশ পিচ্ছিলও হয়ে গিয়েছিল। স্লেটের মতো পাথর চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো। এক জায়গায় সিঁড়ির মতো ধাপ উঠে গেছে। মান সিং এর স্ত্রী আমাদেরকে প্রায় হাত ধরে তুলল সেখানে। ভাকুয়াবাসা থেকে রূপকুণ্ড প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। রাস্তার দুধারে কোনো কোনো জায়গায় হালকা বরফ পড়ে আছে। চড়াই এতোটাই বেশি, উঠতে বেশ দম লাগে। প্রচণ্ড ঠান্ডা হাওয়ায় গ্লাভস পরেও হাতের আঙুল নীল হয়ে যাচ্ছিল। হুনিয়াথর থেকে আরও এক কিলোমিটার চড়াই পথে উঠে এলাম চিড়িয়ানাগে। প্রায় দুকিলোমিটার রাস্তা আরও বাকি। এখানেও একটা চায়ের দোকান, আমাদের দশ মিনিটের চা পানের বিরতি। আমাদের হাতের এই অবস্থা দেখে চায়ের দোকানদার গ্লাভসগুলো নিয়ে তার স্টোভের তাপে একটু তাড়াতাড়ি গরম করে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু এতো হাওয়া যে দশ মিনিটও এক জায়গায় বসে থাকা অসাধ্য বলে মনে হচ্ছিল, আমাদের গাইড আমাদের মনের জোর বাড়ানোর জন্য মাঝে মাঝেই বলে যাচ্ছিল ‘‘থোরা সা।’’ চিড়িয়ানাগের পরে এল ‘রানি-কা-সুলেহা’। একটা গর্ত দেখিয়ে আমাদের গাইড বলল, কথিত আছে, এখানে রানির প্রসব বেদনা হওয়ায় তিনি আর এগতে পারেননি এবং নন্দাদেবী রুষ্ট হয়ে অভিশাপ দেওয়ার ফলে তাঁর এখানেই সমাধি হয়। প্রায় শেষ চড়াই-এর কাছে এসে দম বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ওপরে একটা রিজে উঠে দেখি এক বিশালাকায় গর্ত। এটাই রূপকুণ্ড। ১৬,৮০০ মিটার উঁচুতে এক বিস্ময়কর সরোবর। কোথাও বিক্ষিপ্ত, কোথাও ঢিবির মতো কেউ সাজিয়ে রেখে‍‌ছে অসংখ্য হাড়গোড়। আমাদের গাইড মান সিং বলল, আগে আরো অনেক ছিল, প্রচুর চুরি হয়ে যাওয়ায় তার খানিকটা মাত্র এখানে আছে। মনে করা হয় ৭০০ বছর আগের তুষার ঝড়ে মৃত মানুষের কঙ্কাল আজও এভাবে পড়ে আছে। আবার স্থানীয় মানুষেরা বলেন, ক‍‌নৌজরাজ যশদয়াল সিং-এর সঙ্গীরা, অন্যমতে ডোগরা-ফেন-জোরায়া সেনাবাহিনী জম্মু থেকে তিব্বতের পথে হিমালয় পার হতে গিয়ে ১৮৪১ সালে তুষার ঝঞ্ঝার শিকার হয়। হিমালয় যেমন সুন্দর তেমনই ভয়ংকর, এ যেন এক জাজ্বল্যমান প্রমাণ এই রূপকুণ্ড। এ রহস্য আজও অবগুণ্ঠনেই ঢাকা পড়ে আছে।

দেখলাম, চারিদিকে সাদা বরফে ঢাকা গা বেয়ে ত্রিশূল পর্বত উঠে গেছে। আর নিচে ডিম্বাকৃতি রূপকুণ্ড। রূপগঙ্গার উৎসও এই কুণ্ডে। রহস্যময়ী, মোহময়ী রূপকুণ্ডের রহস্য আজও উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি। রূপকুণ্ড দেখে সার্থক। খানিকটা সময় সেখানে থেকে উলটোদিকের রাস্তা দিয়ে সোজা গেলাম জুনারগলি পাসের দিকে। ৪০০ মিটার খাড়াই পথ। এই পথ দিয়ে হোমকুণ্ড হয়ে রণ্টি যাওয়া যায়। অত্যন্ত কষ্টসাধ্য রাস্তা ধরে জুনারগলি পাসে পৌঁছে চোখের সামনে যে দৃশ্য দেখা দিল তা আমাদের সমস্ত পরিশ্রমকে সার্থক করে তুলল। প্রায় ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে রণ্টি, নন্দাঘুণ্টি, ত্রিশূল। তলায় দেখা যাচ্ছে শিলা সমুদ্র। এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। সার্থক হলো এই কষ্টসাধ্য পাহাড় চড়ায়। বারো বছর অন্তর নন্দাদেবীর ‘রাজজাত’ হয়। তখন তীর্থযাত্রীরা এই রূপকুণ্ডে পু‍জো দিয়ে এগিয়ে যায় হোমকুণ্ডে। সেখানে নন্দাদেবীর বিশাল পুজো হয় ও মেলা বসে। আশ্চর্যের ব্যাপার, একটি চার সিংওয়ালা ভেড়া এই যাত্রার সম্মুখে যায় এবং হোমকুণ্ডে সেটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কোথায় যে সে হারিয়ে যায় কেউ জানে না।

এবার ফিরে আসার পালা। কঠিন উৎরাই বেয়ে নেমে এলাম ভাকুয়াবাসা। জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম পাথর নাচুনির উদ্দেশে। ওখানে রাতে থাকা। পরের দিন বেদিনী হয়ে সোজা নেমে এলাম ওয়ানে। শেষ দিন কুড়ি কিলোমিটার টানা উতরাই-এ ক্লান্ত শরীরে সে রাত ওয়ানের হোমস্টেতে কাটিয়ে পরের দিন নেমে এলাম হরিদ্বারে।

Featured Posts

Advertisement