আমরা আছি, থাকব
রাত পাহারায়

প্রবীর দাস

২১ এপ্রিল, ২০১৮

‘হাতা, খুন্তি, বঁটি— যা আছে ঘরে, তাই নিয়েই আমরা প্রস্তুত।’

সোচ্চার কণ্ঠে বলছে, ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের ১১৬পরিবার।

শুরু হয়েছে রাত পাহারা। শুরু করেছে বাদুড়িয়া। কৃষক আন্দোলনের জমিতে দৃপ্ত স্বর, ‘ওদের আছে আগ্নেয়াস্ত্র, আমাদের আছে মানুষ।’ জনগণই বাদুড়িয়ার শক্তি। যে শক্তি ১৮৩১সালের ১৯শে নভেম্বর ইংরেজদের বিরুদ্ধে দেখিয়েছিল কৃষকের ঘরের সন্তান মীর নিসার আলি। প্রাণ দিয়েছিলেন, কিন্তু স্বীকার করেননি বশ্যতা। জমিদার, জোতদারের রক্ত তাই তৃণমূলকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তেও নারাজ। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় হোক। ‘না হয় আরও একবার যমুনা, ইছামতীর শান্ত জলে লাল রক্তের ধারা মিশিয়ে দিতে আমরা প্রস্তুত’, বলছিলেন প্রবীণ কৃষকনেতা নীহারেন্দু চ্যাটার্জি, মহম্মদ সেলিম গায়েন, গোলাম মণ্ডলরা।

পঞ্চায়েত নির্বাচন আসন্ন। বসিরহাট মহকুমাজুড়ে তৃণমূলীদের তাণ্ডব চলছেই। চলবেও। কার্যত অঘোষিত নির্দেশ দলের সুপ্রিমোর। ফলে বিরোধীশূন্য ১০টি ব্লকের মধ্যে প্রায় আটটি ব্লকই। এখনও পর্যন্ত বাদুড়িয়া, স্বরূপনগর লড়াই জারি রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাই ৯৯ শতাংশ আসনে বামফ্রন্ট লড়াই করছে বুক চিতিয়ে, মেরুদণ্ড সোজা রেখে। হুমকি, বাইক বাহিনীর দাপাদাপি, বহিরাগত দুষ্কৃতীদের আনাগোনায় নজর তাই তীক্ষ্ণ।

পাট উৎপাদনের খ্যাতি মাথায় নিয়ে তিতুমীরের দেখান পথে ফসলের দাম না পাওয়া বাদুড়িয়ার কৃষকসমাজ অতীতে বহু লড়াই সংগ্রামের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে, আরও একবার যার প্রস্তুতি ঘরে ঘরে। ওঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ‘লুটের পঞ্চায়েত নয়। ফের তৈরি করব মানুষের পঞ্চায়েত।’

বাদুড়িয়ার মোট জনসংখ্যার ৬২শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত বাদুড়িয়া। মৌজা সংখ্যা ১১০। আয়তন ২০৯.৮বর্গ কিমি। ইতিহাস প্রসিদ্ধ বাদুড়িয়া দেখেছে, নীলকরদের অত্যাচার। ইংরেজরা মুসলমানদের কাছ থেকে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে ভাগ হয়েছিল হিন্দু-মুসলমান। পরবর্তীতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে, শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে তিতুমীরের আন্দোলন সাম্প্রদায়িক ছিল না। হিন্দু-মুসলিম প্রত্যেককে ঐক্যবদ্ধ করে তিতুমীরের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল নিপীড়িত কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ শ্রেণি সংগ্রাম। সেদিন ইংরেজ শাসক প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল, তিতুমীর সাম্প্রদায়িক। সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান তৃণমূল শাসকের মধ্যশিক্ষা পর্ষদও চেষ্টা চলিয়েছিল, ফের তিতুমীরকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেওয়ার। বাদুড়িয়ার বামপন্থী নেতৃত্ব জোড়াল প্রতিবাদ জানায়। পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন মধ্যশিক্ষা পর্ষদের কর্তাব্যক্তিরা।

বাদুড়িয়ায় মূলত রায়তী সম্পত্তির মালিকানাধীনদের বসবাস ছিল বেশি। বসিরহাট মহকুমায় গড়ে ওঠা তেভাগা আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন সেভাবে প্রভাব ফেলেনি বাদুড়িয়ার বুকে। তবে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে প্রধান অভিমুখ ছিল, খেতমজুর আন্দোলন। ন’সিকা অর্থাৎ ২টাকা ২৫ পয়সা ছিল মজুরি। তখন চালের কেজি ছিল ২ টাকা।

সাল ১৯৭২-৭৩সাল। সংসারের অন্যান্য খরচ টানতে হিমসিম খেতেন খেতমজুররা। ৮ টাকা ১০ পয়সা মজুরির দাবিতে শুরু হলো পদযাত্রা। যদুরহাটী, রঘুনাথপুর, যশাইকাটি গ্রামে পদযাত্রায় হামলা চলল। ইটবৃষ্টি হলো। তা সত্ত্বেও ৭ দিন ধরে ৭৫টি গ্রাম পরিক্রমা করে এই পদযাত্রা। কার্যত তখন চলছিল জরুরি অবস্থা। পাট জলে ভেজানো। ধান রোয়ায় সময়। নয়া বস্তিয়া, কুলিয়া, কাঁকড়াসূতিসহ বিভিন্ন গ্রামে শুরু হলো খেতমজুরদের ধর্মঘট। চলল এক সপ্তাহ ধরে। এমনকী, কংগ্রেস সমর্থনকারী খেতমজুররাও ধর্মঘটে শামিল হন। মধ্যবিত্ত কৃষকরা আপস মীমাংসায় রাজি হন। সেদিন সেই আন্দোলনের প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন গোলাম কাসেম সিদ্দিকী, নীহারেন্দু চ্যাটার্জি, শম্ভু বিশ্বাস, মহম্মদ সেলিম, গোলাম মণ্ডল, সহিদুর রহমানরা। পরে কমরেড হেমন্ত ঘোষালের তত্ত্বাবধানে কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠে বাদুড়িয়ায়। যার মূল ভিত্তি ছিল, খেতমজুর আন্দোলন। রাতের অন্ধকারে টেমি (গ্রাম্য ভাষা) জ্বালিয়ে গোপনে কাজ চালাত কৃষকসভা। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে থাকল কৃষকসভা। যার ফলস্বরূপ ১৯৭৮সাল থেকে কৃষক সমাজের একটা বড় অংশ পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামফ্রন্টকে ঢেলে ভোট দিত। মাঝে ২০০৮ সালে কংগ্রেস বাদুড়িয়া পঞ্চায়েত সমিতি দখল করে। বাকি সময়কাল বামফ্রন্টের দখলে ছিল পঞ্চায়েত সমিতি। ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ৮টিতে জয়ী হয় বামফ্রন্ট। পঞ্চায়েত সমিতির ৪১টি আসনের ২৭টি এবং তিনটি জেলাপরিষদ আসন এল বামফ্রন্টের দখলে। রাজ্যের ক্ষমতায় তৃণমূল কংগ্রেস, খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক হুঙ্কার ছাড়লেন,

‘বাদুড়িয়া, দেগঙ্গা পঞ্চায়েত সমিতি আমার চাই।’ ময়দানে নামলো কৃষকসভা। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্মেলন হলো দেগঙ্গায়। প্রকাশ্য সমাবেশ হলো। সূর্য মিশ্র প্রধান বক্তা। দশ হাজার মানুষের জমায়েত জবাব দিল মন্ত্রীর হুঙ্কারের। দেগঙ্গা থাকল দেগঙ্গাতেই। নাকাল হয়েও থেমে থাকলেন না খাদ্যমন্ত্রী। নজর গিয়ে পড়ল বাদুড়িয়া পঞ্চায়েত সমিতির উপর। বাদুড়িয়ায় তৃণমূলের রাজনৈতিক সম্মেলনে ‘মুখ্য চরিত্র’-এ খাদ্যমন্ত্রী। তিন হাজার কর্মী বাহিনী এল। জমিয়ে হলো বিরিয়ানি ভোজন। ফের হুঙ্কার। তিন মাসের মধ্যে চাই বাদুড়িয়া পঞ্চায়েত সমিতি। কিন্তু দেগঙ্গার মতো সতর্ক বাদুড়িয়া। ‘অফার’ গেল রাহেমা বিবির কাছে। পাঁচ লক্ষ টাকা। খেত মজুর পরিবারের গৃহবধূ। রাজি হলেন না। জামাইকে গ্রেপ্তার ক‍রানো হলো ৩০৭ধারায়। রাহেমা বিবি তা সত্ত্বেও দমলেন না। এরকমভাবে ৮-১০ জন পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য হাজার প্রলোভনকে ফুৎকারে উড়িয়ে থেকে গেলেন সি পি আই (এম)-র সঙ্গে। ফের নাকাল হলেন মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্য মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যমন্ত্রী।

সেদিন ইংরেজ শাসক তিতুমীরকে খুন করে নিপীড়িত কৃষকের ঐক্যবদ্ধ শ্রেণি সংগ্রামকে ধ্বংস করতে একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিল বাদুড়িয়ার বুকে। আর আজ তৃণমূল কংগ্রেস লালঝান্ডার তলায় সমবেত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে দলে টানতে ষড়যন্ত্রের নতুন জাল বোনা শুরু করেছে।

২০১৭ সালের ২রা জুলাই। বাদুড়িয়ার সেই কালো দিন। সোশ‌্যাল মিডিয়ার ঘৃণ্য পোস্ট হাতিয়ার করে মুসলিম সমাজকে উসকে দিতে আসরে নেমে পড়ল তৃণমূল। তৈরি হয় অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। এক ঘণ্টায় ৭-৮হাজার মুসলিম জমায়েত হলো রুদ্রপুর বাজারে। মাগুরখালি গ্রামে সোশ‌্যাল মিডিয়ার ঘৃণ্য পোস্টে অভিযুক্তের বাড়ি আক্রমণ করা হলো। সুযোগ পেয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়ল আর এস এস, হিন্দু সংহতি নামক হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন। অন্যদিকে পৌরপ্রধান, জামায়াত প্রধানের লক্ষ্য মুসলিমদের উসকে দিয়ে তৃণমূলের অনুকূলে নিয়ে আসা। যার পুরো ফসলটাই তোলা সম্ভব হবে আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে। পুলিশকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ করে তাণ্ডব চলল বাদুড়িয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। ঘৃণ্য পোস্টের অভিযোগে শৌভিককে গ্রেফতার করতে হবে। রাস্তা কাটা হলো। দোকান-বাজারে হামলা হলো। আক্রমণ চলল থানায়ও। পুলিশের গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। শান্তি প্রতিষ্ঠায় পথে নামেন বামপন্থীরা। প্রশাসনকে সর্বদলীয় সভার প্রস্তাব দিল। প্রশাসন ছিল নীরব। ফিরে এলো ৬৪’র দাঙ্গা ২০১৭’তে। ছড়িয়ে পড়ল বসিরহাট মহকুমার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। উত্তপ্ত হলো বসিরহাট শহর ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রাম। হিন্দু, মুসলিম উভয় সম্প্রদায় নেমে আসে রাস্তায়। আতঙ্ক ছড়ায় ঘরে ঘরে। বাদুড়িয়ায় সি পি আই (এম)-কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ, মসজিদ কমিটির সম্পাদক বার্তা দিলেন, ‘দাঙ্গা নয় শান্তি চাই।’ প্রাক্তন বিধায়ক মহম্মদ সেলিম গায়েন, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সোমা আড়তদার, সি পি আই (এম) নেতা অনিমেষ মুখার্জিরা দিন-রাত এক করে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেলেন। আর্তি একটাই, দাঙ্গা নয়। শান্তি চাই। প্রশাসনের দরজায় বারবার কড়া নাড়লেন, শান্তি মিছিল করুন। থানা তখন ব্যস্ত পৌরপ্রধান এবং জামায়েত প্রধানকে নিয়ে বৈঠকে। বামফ্রন্ট, কংগ্রেস প্রতিবাদ ক‍রল। প্রত্যেককে নিয়ে সভা করুন। সভা হলো না। একমাস অপেক্ষা করে প্রশাসনের প্রবল বাধা অতিক্রম করে ৬ই আগস্ট বামফ্রন্ট, কংগ্রেস সভা করল বাদুড়িয়ার নতুন হাটে। পাঁচ হাজার মানুষের জমায়েত হলো। সুজন চক্রবর্তী, আব্দুল মান্নান বক্তব্য রাখলেন। অন্যদিকে, পুলিশ দেড় হাজার মানুষের মাথায় মামলার বোঝা চাপিয়ে দিল। এখন ভয় দেখানো হচ্ছে তৃণমূলকে ভোট না দিলে দাঙ্গায় জড়িয়ে দেওয়া হবে। ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে গিয়েছে। বামফ্রন্টের মনোনয়ন জমার দিন বিপুল মানুষের জমায়েত হলো। দাবি উঠল, ফের মানুষের পঞ্চায়েত গড়তে হবে বাদুড়িয়ায়। তাই কোনও অশান্তি মেনে নেব না। প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি, গ্রামে গ্রামে নানা গুজব রটছে। সতর্ক হোন। আমরা আছি, থাকব রাত পাহারায়, নির্বাচনের দিন পর্যন্ত।

Featured Posts

Advertisement