হাসি নেই জঙ্গলমহলে

সত্যব্রত ভট্টাচার্য

২২ এপ্রিল, ২০১৮

কাঁদছে জঙ্গলমহল। এখনও নিভৃতে কাঁদছেন সেই শালকু সোরেনের মা। সংকট বাড়ছে আদিবাসীদের।

তার মধ্যেই চোয়াল শক্ত করে জোটও বাঁধছেন সবাই। অশান্তির ঝাড়গ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ভরসা সেই লালঝান্ডাই, বুঝেছেন তামাম জেলার মানুষ।

তাই বামকর্মী বা বিরোধীদের নমিনেশন দিতে বিশেষ বাধা দিতে পারেনি শাসকদল। লালঝান্ডা সোচ্চারে বার্তা দিয়েছে শাসকদলের নেতা কর্মীদের— ‘এবার যাও’।

পঞ্চায়েত ভোট এবার জমে উঠতে চলেছে ঝাড়গ্রামে।

জমবে নাই বা কেন। নিজেদের দলের ওপরেই আর বিশেষ আস্থা রাখতে পারছেন না তৃণমূলেরই অনেকেই। লালগড়ে গিয়েই মালুম হয়েছিল তা। তার ওপর এখন জায়গা নিচ্ছে সঙ্ঘ। বিপদ গুনছে তৃণমূল।

মাত্র কয়েকদিন আগেই মুখ্যমন্ত্রী ঝাড়গ্রামে এসে মন্তব্য করেছিলেন ঝাড়গ্রামে শান্তি ফিরেছে। মুখে বলতে পারেননি কেউই। কিন্তু মনে মনে প্রতিবাদ করেছিলেন অনেকেই। কিসের শান্তি? কোথায় শান্তি? শান্তি পেয়েছেন কি শালকু সোরেনের মা-এর মতো আরও অনেকেরই পরিবার পরিজনেরা? শালকুকে কুপিয়ে খুন করার পর ক্ষতবিক্ষত দেহ এনে ধরমপুর পার্টি অফিসে ফেলে রেখেছিল তৃণমুল- মাওবাদীরা। ছেলের দেহ সৎকার করতেও দেয়নি মা-কে। এখন মাওবাদী উপদ্রব হয়তো কমেছে। কিন্তু মনের অশান্তি? খিদের জ্বালা? কাজ না পাওয়ার জ্বালা? আশ্রয়হীনতার জ্বালা? সে তো মেটেনি। বলছিলেন ধরমপুরের ৮৫ বছরের প্রবীণ নিবারণ মুর্মু।

তাই তো চোখের জল এলেও তা মুছে লালঝান্ডা হাতে শক্ত হয়ে দাঁড়ান শালকু সোরেনের মা।

‘কি যেন বলছিলাম? হ্যাঁ অশান্তির কথা।’— সম্বিত ফেরে বৃদ্ধের। চোখে মুখে বলিরেখা। কুঁচকানো চামড়া, চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে প্রান্তিক এই মানুষটির। ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ছেলেদের একটা কাজ দিতে পারেন? ৩টি ছেলে বেকার। তবে মুখ্যমন্ত্রী যে বলেছেন, জঙ্গলমহলের ৩৫ হাজার ছেলেমেয়ে পুলিশে চাকরি পেয়েছে। ৩ লক্ষ মানুষকে জমির পাট্টা দেওয়া হয়েছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানান প্রকল্পে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে মানুষকে। জঙ্গলমহল নাকি হাসছে! অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন বৃদ্ধ।

কোথায় কি? ভোট আসুক না আসুক ভাগের টাকা পেলেই হলো। এমনই হাভভাব তৃণমূল নেতাদের। সে টাকা ছড়াতে সুবিধা, আবার টাকার জোরে ভয় দেখানোও চলে গুন্ডাবাহিনীকে দিয়ে। সব লুটেপুটে খাচ্ছে ঘাষফুলের দল। যেখানে তারা পিছিয়ে পড়ছে সেখানে ঘাটি গাড়ছে পদ্মফুল। শয়ে শয়ে বামকর্মী শহীদ হওয়ার পর এখন মাওবাদী উপদ্রব একটু কমেছে বটে। কিন্তু অশান্তি কমেনি, বরং বেড়েছে ঝাড়গ্রামে, তা আরও বাড়ছে ক্রমশ। হুঁস নেই প্রশাসনের। জেলা জুড়ে পতাকা লাগাতে শুরু করেছে বি জে পি। সুযোগ খুঁজছে তারা। তৃণমূলও যে খুব একটা স্বস্তিতে নেই তা বোঝা গেল আবার লালগড়ের কিছু যুব তৃণমূল কর্মীদের কথায়। সাংবাদিক শুনে এগিয়ে এসেছিলেন বিষ্ণু, নিরাপদ, সত্যেনরা। কেউ সদ্য কলেজ থেকে বেরিয়েছেন, আবার কেউ স্কুলে কলেজে পড়তে পড়তে পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। যাই হোক দলের নামে কোনও নিন্দা শুনতে রাজি নন। কিন্তু দলের কাজকর্মে আস্থাও রাখতে পারছেন না বিশেষ। কারণ হাতে কাজ নেই তাদের। নেতারা বলেছিলেন কাজ মিলে যাবে- মেলেনি এখনো।

কাজ, কাজ, একটা কাজ— মাথা খুঁড়ে মরছে গোটা ঝাড়গ্রাম। কোথায় কাজ? বহু মানুষ খুঁজছেন থাকার মতো একটা ঘর। কোথায় কি? মানুষের ঘরে যদি অশান্তি থাকে তাহলে গোটা জেলায় কি করে শান্তি থাকে। প্রবীণ সি পি আই (এম) নেতা ডহরেশ্বর সেন এবং পার্টির জেলা সম্পাদক পুলিনবিহারী বাস্কে বারে বারে বলছিলেন সেকথাই। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। গোটা ঝাড়গ্রাম দিনের পর দিন চষে বেড়িয়ে এই অভিজ্ঞতাই সঞ্চয় করেছেন পার্টি নেতৃত্ব। লুটের পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে এবার প্রতিবাদ প্রতিরোধে একজোট মানুষ। নয়াগ্রামের বৃদ্ধা সরলা ক্যুইলারও বক্তব্য, এবার ভোট জমবে ঝাড়গ্রামে।

নতুন জেলা হওয়ার পর এবার প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন। ৮টি ব্লক ঝাড়গ্রাম, জামবনী, সাঁকরাইল, বেলিয়াবেড়া, গোপীবল্লভপুর, নয়াগ্রাম, লালগড়, বেলপাহাড়ি-তে ভোট হচ্ছে। ১৬টি জেলা পরিষদ, ১৮৭টি পঞ্চায়েত সমিতি আর ৮০৬টি গ্রাম পঞ্চায়েত মিলিয়ে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন ঝাড়গ্রামে। সাঁকরাইল ছাড়া ব্লকগুলির বেশিরভাগ আসনেই প্রার্থী দিয়েছে বামফ্রন্ট। এক একটা ব্লকে রয়েছে ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েত। কোথাও সন্ত্রাসের কারণে তৃমূলকে হটাতে সমর্থন করেছে নির্দলকে। সাঁকরাইল, জামবনী, নয়াগ্রাম এলাকায় সন্ত্রাস অব্যাহত। এছাড়াও নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে আদিবাসী ভূমি মুণ্ডা কল্যাণ সমিতি। মূলত ঝাড়খণ্ড লাগোয়া বাঁশপাহাড়ি-ভুলাভেদা অঞ্চলে তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সবকটি জায়গায় প্রার্থী দিয়েছে তৃণমূলের একদা সঙ্গী বি জে পি-ও। নয়াগ্রামে আবার মাওবাদীরাই তৃণমূলে নাম লিখিয়ে বাড়ি বাড়ি ভোট চাইছে হুমকির সুরে। এ দৃশ্য রোজই দেখছেন মানুষ।

ভোট চাইতে এসে তৃণমূলের বক্তব্য আমরা উন্নয়ন করেছি। সত্যিই তো হয়েছে। সুন্দর প্রধান সড়ক হয়েছে। পলিটেকনিক, আই টি আই কলেজ হয়েছে। বিধবা ভাতা প্রকল্পের আওতায় ১৪ হাজার নাম নাকি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব কথা বলছেন তৃণমূলের নেতা কর্মীরা। কিন্তু বলছেন না গ্রামের ভেতরে ভেতরে রাস্তার অবর্ননীয় দশার কথা। টাকা তো গায়েব। রাস্তা কই? মাত্র একটা কি দুটো উদাহরণই যথেষ্ট। সাবিত্রীমন্দির থেকে বাঁশতলা হয়ে যে রাস্তা গেল তা চলার অযোগ্য। টাকা মঞ্জুর হয়ে আছে, কাজ হয়নি। বাঁধগড়া গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে সরদিহা স্টেশনের দিকে ৪ কিলোমিটার রাস্তা হওয়ার কথা ছিল- সে টাকা কোথায়? প্রশ্ন তুললে জবাব দিতে পারেন না তৃণমূলকর্মীরা। যদি প্রশ্ন করা যায় টেকনিক্যাল স্কুল কলেজ তো হয়েছে কিন্তু ছেলে মেয়েদের কাজ নেই কেন। সেই উত্তরও নেই তাদের কাছে। যে গোপীবল্লভপুরে মুখ্যমন্ত্রী এসে ১০০ দিন ২০০ দিন কাজের কথা বলেছিলেন, সেই গোপীবল্লভপুরেই রেগার কাজের মজুরি বাবদ বকেয়া ছিল ২ কোটি টাকার মতো। মানুষ এমনই অভিযোগ করেছিলেন।

রাজ্য জুড়ে পরিস্থিতি একই। ঝাড়গ্রামও বাদ নেই। কেন্দুপাতা,শালপাতা তুলে বিক্রিবাটা করে যাও বা চলত, তৃণমূলের লোকজন এসে খবরদারি শুরু করল। বলছিলেন বেলপাহাড়ির বছর ৩০-এর শ্রীমণি লোধা। বললেন, পঞ্চায়েত দপ্তরে গিয়ে বলেছিলাম অন্তত কেন্দুপাতা, শালপাতা তুলে বেচতে দাও। ওরা বলল সে সব আমাদের লোকজন বুঝে নেবে। বুঝে নেওয়া মানে খবরদারি করা। টাকা পয়সার বড় অভাব। আগে তবু ছত্তিসগড়ে ওগুলো বেচে কিছু পয়সা পাওয়া যেত। এখন ওরা যা বলবে তাই করতে হবে। শ্রীমণির স্বামী আগে পাথর ভাঙতেন, এখন বাবুই চাষ করে দড়ি তৈরি করেন। কিন্তু চলতে হব তৃণমূলের পছন্দ ও কথামতো। তারাই বলে দেবে সে সব কোথায় বেচতে হবে না হবে।

আর বিধবা ভাতা- বার্ধক্য ভাতা? ঘরে ঘরে মানুষের আর্ত আবেদন, আমাদের বাঁচান বাবু। পঞ্চায়েত প্রধানের লোকেরা সব পাচ্ছে। আমাদের কি হবে। নয়াগ্রামের সেই সরলা ক্যুইলার বলছিলেন তাঁর পরিবার বিধবা ও বার্ধক্য ভাতার টাকা কিছুদিন পেয়েছিলেন। তারপর আর খবর নেই। কিন্তু তাঁদের এলাকায় তো অনেকে ওই টাকার মুখই দেখেননি। বললেন, অনেক হয়েছে। এবার ভোটটা আসুক, তারপর দেখছি। শুধু কি তাই? প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার বাড়ির টাকাও তো উধাও। মানুষের প্রশ্ন ছিল সরদিহা গ্রাম পঞ্চায়েতের যে সেই প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকার তহবিল উধাও হয়ে গিয়েছিল, অভিযোগ উঠেছিল সচিবের বিরুদ্ধে— তার কি হলো? আমডিহার বাসিন্দা প্রফুল্ল মাহাতোর ঘরের ছাউনি তো স্থানীয় মানুষই চাঁদা তুলে লাগিয়ে দিয়েছেন। পঞ্চায়েতের বাবুরা কেউ তো খোঁজও নেননি। মানুষ প্রশ্ন করেছিলেন চন্দ্রি গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা একজনেরটা অন্য নামে করায় প্রধানকে টাকা যে টাকা ফেরত দিতে হয়েছিল সে সব তথ্য লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল কেন তৃণমূলীদের। জলসেচের ব্যবস্থা সমস্ত জায়গায় হয়ে গিয়েছে বলে প্রশাসন থেকে যে বারবার বলা হচ্ছে তাহলে সেই জলসেচ থেকে বেলপাহাড়ি বাদ গেল কেন। তার টাকা কোথায় গেল। এই প্রশ্নও রয়েছে মানুষের মনে। মাত্র একটা উদাহরণই যথেষ্ট।

আসলে ঝাড়গ্রাম শহরটুকু দেখলে ভেতরটা চেনা যাবে না- বলছিলেন ডহরেশ্বর সেন। সত্যিই তাই। বামফ্রন্ট আমলে অনেকগুলি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল কর্মসংস্থান। গত ৬-৭ বছরে সেই ক্ষেত্রটাই সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুর সংলগ্ন চন্দ্রি গুপ্তমণি অঞ্চলে শিল্প তালুক ভালোভাবে গড়ার উদ্যোগকে শেষ করে দিয়েছে শাসকদল আর সরকার। জেলায় রাইসমিলগুলি প্রায় সবই বন্ধ। ওদিকে লালগড়ে কংসাবতীতে বালি মাফিয়ারা অত্যন্ত সক্রিয়। পরিষ্কার দিনের আলোয় চলছে টাকা পয়সার লেনদেন, ভাগ বাঁটোয়ারা। ওদিকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে চলে গিয়েছে। বাঁশপাহাড়িসহ এমন অনেক গ্রাম রয়েছে যেখান থেকে কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে একবেলা পেরিয়ে যায়। গাড়ি ছাড়া যাওয়া যায় না। তাতে টাকা লাগে বিস্তর। আর গেলেও চিকিৎসা হয় না সেখানে। মুখ্যমন্ত্রীর সাধের সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল ভবনে পৌঁছানো স্বপ্ন তাঁদের কাছে।

যেমন চিকিৎসা হয়নি জঙ্গলমহলের লালজলের লক্ষীকান্ত শবরের। গাছ থেকে পড়ে পা ভাঙলেও প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের জামতাগোর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনও চিকিৎসাই হয়নি তাঁর। টাকা পয়সাহীন লক্ষীকান্ত এখন ভালো করে হাঁটতেও পারেন না। আবার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে পৌঁছেও চিকিৎসা হয়নি পাশের গ্রামের হরিনাথ শবরের। হাসপাতাল থেকে বলে দিয়েছে এখন ডাক্তার নেই। এই ঝাড়গ্রামেই সভা করে মুখ্যমন্ত্রী একবার বলেছিলেন জঙ্গলমহলের প্রতি ব্লকে মাসে দুবার নাকি চিকিৎসা শিবির হবে। চালু হবে মোবাইল চিকিৎসা পরিষেবা ভ্যান। সে সব কোথায়? প্রশ্ন তুলছেন বাসিন্দারা। উত্তর নেই এলাকার পঞ্চায়েতের কাছে। কাকে ভোট দেবেন জিজ্ঞাসা করলে এই মানুষগুলির উত্তর, যাঁদের আমলে বহুদিন ভালো ছিলাম তাঁদেরই দেব। এখন তো আমরা ভালো নেই।

এই বেলপাহাড়ি, বাঁশপাহাড়ি, কাঁকড়াঝোর সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় বিচ্ছিন্ন এক জনজীবন গোষ্ঠীর বাস। ভোট তো হচ্ছে সেখানেও। তীব্র অনাহার যাঁদের নিত্যসঙ্গী। ইঁদুর, মরা সাপ আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাওয়াই যাঁদের ভবিতব্য হয়ে গিয়েছে। উঠোনের এক কোনায় আগুনে পিঁপড়ের ডিম খেতেই যাঁরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, আর সেই সব ক্ষুধার্ত ছোট ছোট ছেলেমেয়ের দল তাইই গোগ্রাসে খাচ্ছে। সেখানে তৃণমূল যাবে কোন মুখে? এলাকার মাতব্বর বিপলে শবরকে প্রশ্ন করায় উত্তর মিলেছিল, আমরা তো ফিরাইনি, ওরাই আর আসতে সাহস পায় না যে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে এ যেন এক অন্য বিচ্ছিন্ন ঝাড়গ্রাম। মানুষ রয়েছেন শুধুমাত্র চারটি বাঁশের খুঁটি আর মাথার ওপর একটা ছাউনি ভরসা করে। উন্নয়ন এই ক্ষুধার রাজ্যে স্তব্ধ। মমতা ব্যানার্জির হাসি তাঁরা কোনওদিনও দেখেননি। পঞ্চায়েতের দেওয়া জব কার্ড বা ১০০ দিনের কাজের কথা জিজ্ঞাসা করলে বলেন, শুনেছি বটে, চোখে দেখি নাই। আবার পাশেই অন্য আর একটি এলাকায় মানুষ খাচ্ছেন ডোবার জল। টিউবওয়েল আছে বটে অনেক দূরে একটা। সেটা প্রাইমারি স্কুলের মধ্যে। অনেক সময়ে আপত্তি করে তারা। আর একটা আছে, সেটা খারাপ। সারাই হয় না। কিন্তু পঞ্চায়েতের বাবুরা বলেছেন এই তো ডোবার জল খেয়ে দিব্যি বেঁচে থাকা যায়— খারাপ কি? গ্রামের গৃহবধূদের বক্তব্য, ওদের মুখেই আবার উন্নয়ন নিয়ে বড় বড় বুলি। ভোট চাইতে আসবে ওরা কোন মুখে।

ভালো নেই ঝাড়গ্রামের মানুষ। ভালো নেই আদিবাসীরা। কেন ভালো নেই? কথা হচ্ছিল লোধাশুলীর জীবন লোধার সঙ্গে। ছোট ছেলে মেয়েদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত আছেন, কাজ করেন একটি এন জি ও-তে। চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে বলছিলেন, জানেন তো, ছেলে মেয়েদের হস্টেলগুলিতে ছাত্রছাত্রী প্রায় নেই। কেন? খিদের জ্বালা বুঝলেন তো। আদিবাসীরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে- কোনও উন্নয়ন নেই। টাকা কোথায় হাতে? সরকারের ১০০ দিনের কাজ করলে তো পয়সা সঙ্গে সঙ্গে মিলছে না। অনেক সময়ে মিলছেই না একেবারে। রোজকার দিন আনা দিন খাওয়া জীবন এঁদের। তাই রেগার কাজ করতে রাজি হচ্ছে না অনেকে। গাছ কেটে, পাথর ভেঙে রোজকার কিছু দৈনিক মজুরি পাওয়া যেত, তাও বন্ধ। পড়াশোনা করাবেন কি করে ছেলেমেয়েদের? কিছু তো খরচ আছেই। ওই কিছু পাওয়ার আশায় সঙ্ঘের স্কুলে গিয়ে ভর্তি হচ্ছে অনেকে। সরকার থেকে উদ্যোগ নিলে এটা হতো না।

কথাটা সত্যি। কি-ই বা করবেন তাঁরা। ঘরে খাবার না থাকলে যা হয় আর কি- তাই হচ্ছে। জীবন লোধার বক্তব্যে সহমত জানিয়ে যোগ দিলেন মনু শবর। চাষবাস করেন। চায়ের গ্লাস হাতে নিয়ে বললেন, রেশনের চালে আর কতদিন যায়? চাষিদেরও তো সেদিন নেই আর। সরকার একটা কিষান মান্ডিই দিতে পারে না ঠিকঠাক। ৫০-৫২ কিলোমিটার যেতে হবে বিনপুর ১ ব্লকের কিষান মান্ডি পেতে। আর ঝাড়গ্রামের উপকণ্ঠে তো বন্ধই হয়ে গিবেছে মান্ডি। পুরো জেলার কি হাল বুঝতে পারছেন তো?

সবাই এবার সবকিছু বুঝতে পারছেন। প্রচার চলছে বিভিন্ন দলের। পথে নেমেছেন অনেক শালকু সোরেনের মা, ভাই, বোনেরা। লড়াই শুরু হয়েছে জঙ্গলমহলে। এই লড়াই বাঁচার লড়াই, অধিকার রক্ষার লড়াই। তা বলতেই সাধারণ মানুষের কাছে ঘরে ঘরে পৌঁছাচ্ছেন বামপন্থীরা। এলাকায় এলাকায় উঠছে অনেক প্রশ্ন। তৃণমূল নয়, সেসবের উত্তর দিচ্ছেন সি পি আই (এম) কর্মীরাই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement