এই নীরবতার নেতা কে?

রবীশ কুমার

২২ এপ্রিল, ২০১৮

আপনারা ইংরেজি ‘ওপেন’ পত্রিকায় রাহুল পণ্ডিতিয়া এবং ‘এনডিটিভি ডট কম’-এ নজির মাসুদির লেখা পড়বেন? আমি আপনাদের নীরবতাকে বুঝতে পারি। জানোয়ার হয়ে যাওয়ার পর আপনাদের বলাও অনর্থক হয়ে দাঁড়াবে। অক্ষরকেও আপনারা হিন্দু-মুসলিমের মতো দেখতে শুরু করার আগেই নিচে লেখা শব্দগুলি আপনারা পড়বেন এই আশা রাখতে পারি? আমি রাহুল পণ্ডিতিয়া এবং নজীর মাসুদির রিপোর্টের সারকথা আপনাদের সামনে হাজির করছি।

২০১০সালে একজন মানুষ বোনের মেয়েকে দত্তক নিয়েছিলেন। বকরওয়াল যাযাবর সম্প্রদায়ের সেই মানুষটি জম্মুকেই নিজের আবাসস্থল বানিয়ে নিয়েছেন। যেখানে পাঁচ বছর থেকে সেখানকার ডোগরা হিন্দুদের মনে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভয় তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। রোহিঙ্গা মুসলিমদের এখানে থাকতে দেওয়া নিয়েও জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করা গেছে। এদের মনের ভিতরের বিষ উপরে আসতে শুরু করে যে জম্মুও মুসলিমে ভরে যাবে। যেন দেশের ভিতরে মুসলিমদের জন্য কোনও দেশ নেই। রাহুল পণ্ডিতিয়া লিখেছেন, হিন্দু এবং বকরওয়ালদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সন্দেহ এবং ঘৃণা আট বছরের একটি মেয়েকে শিকার বানিয়ে নিল। যদি আপনি চার্জশিটটা পড়ে দেখেন তাহলে এই লোকেদের ভয়ংকর চেহারাটা আপনাদের সামনে উঠে আসবে।

চার্জশিটে লেখা হয়েছে, এই ধর্ষণ-হত্যায় মন্দিরের পূজারি ৬০বছরের সঞ্জি রাম এবং পুলিশ অফিসার দীপক খাজুরিয়া যুক্ত ছিল। এলাকা থেকে বকরওয়ালদের তাড়ানোর পরিকল্পনা করতে থাকা সঞ্জি রামের কিছুদিন ধরেই এই শিশুকন্যার উপরে নজর ছিল। যা সঞ্জি রাম দীপক খাজুরিয়া, নিজের ছেলে এবং ভাইপোর সাথে মিলে সম্পূর্ণ করে। ভাইপোর বয়স আঠেরোর কম হওয়ায় তার নাম বলছি না। তিন মাস আগে একটি মেয়ের সঙ্গে আপত্তিকর ব্যবহার করায় তাকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশ অফিসার দীপক খাজুরিয়া ওষুধের দোকানে যায় এবং বেহুঁশ করার ওষুধ কিনে আনে। তারপর ভাইপোকে বলে সে যদি মেয়েটিকে অপহরণ করে আনতে পারে তাহলে চুরি করে পরীক্ষা পাশ করানোর জন্য তাকে সে সাহায্য করবে। ভাইপো নিজের বন্ধু পরবেশ কুমারকে বলে। ৯ই জানুয়ারি ভাইপো এবং পরবেশ গিয়ে নেশার চারটি ওষুধ কেনে। আমি বারবার বলেছি ঘৃণার এই রাজনীতি আপনাকে অথবা আপনার বাচ্চাদের ব্যবহার করবে এবং খুনি বানিয়ে দেবে। দেখুন, কীভাবে দুই বাচ্চাকে ব্যবহার করা হলো।

১০ই জানুয়ারি ভাইপো শুনতে পায় সেই মেয়েটি কোনও মহিলার থেকে নিজের খচ্চরদের সম্পর্কে জানতে চাইছে। ভাইপো তাকে বলে সে জঙ্গলে তার ঘোড়া দেখেছে। পরবেশ এবং ভাইপো মেয়েটির সাথে যেতে থাকে। পুলিশের রিপোর্ট অনুসারে মেয়েটির কিছু সন্দেহ হয় এবং সে পালাতে শুরু করে। ভাইপো তাকে ধরে ফেলে এবং ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। জোর করে তাকে মাদক দেয়। মেয়েটি বেহুঁশ হয়ে যায়, ভাইপো তাকে ধর্ষণ করে। তারপর পরবেশও ধর্ষণের চেষ্টা করে কিন্তু পারে না।

মেয়েটিকে উঠিয়ে একটি ছোট মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়, যার পূজারি সঞ্জি রাম। পরের দিন দীপক খাজুরিয়া এবং ভাইপো তাকে দেখতে আসে। দীপক খাজুরিয়া মেয়েটির মুখে বেহুঁশ করার দুটি ট্যাবলেট ঠেসে দেয়। দুজনেই ধর্ষণ করে পরপর। সন্ধ্যায় ভাইপো সঞ্জি রামের ছেলেকে ফোন করে। সে মীরাটে কৃষি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ের পড়ুয়া। তাকে বলা হয়, লালসা তৃপ্ত করতে চাও তো জলদি চলে এসো। পরের দিনই বিশাল জম্মু পৌঁছে যায় এবং দুই ঘণ্টা পরে মেয়েটিকে বেহুঁশির তিনটে ট্যাবলেট দেওয়া হয়। ফের ধর্ষণ চলতে থাকে। তখনও পর্যন্ত মেয়েটিকে কিছুই খেতে দেওয়া হয়নি।

এবার সঞ্জি রাম আরও এক পুলিশ তিলক রামকে দলে টানে। ১২ই জানুয়ারি দুপুরে মেয়েটির বাবা মহম্মদ ইউনুস পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ তল্লাশি চালাতে বের হয়। সেই দলে দীপক খাজুরিয়া এবং তিলক রাম দুইজনেই ছিল। এদের বাঁচানোর জন্যেই বি জে পি-র দুই মন্ত্রী এবং দলের নেতা সি বি আই তদন্তের দাবি করতে থাকে। অন্যদিকে হিন্দু একতা মঞ্চ তৈরি হয়, যাদের সঙ্গে এই লোকগুলিও ছিল।

সঞ্জি রাম নিজের বোনের কাছে যায় এবং বলে তার ছেলে কোনও মেয়েকে অপহরণ করেছে। তাকে বাঁচানোর জন্য পুলিশকে ঘুষ দিতে হবে। বোনের থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়ে আসে এবং তিলক রামকে দেয়। পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা হয় এবং সাব ইন্সপেক্টর আনন্দ দত্তকেও এই অপরাধের অংশ বানানো হয়। আনন্দ দত্ত একজন অভিযুক্ত।

১৩ই জানুয়ারি লোহরি উৎসবের দিনে সঞ্জি রাম, তার ছেলে এবং ভাইপো মন্দিরে যায় এবং পুজো করে। সঞ্জি রাম চলে যাওয়ার পর তার ছেলে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। তারপর তার ছোট ভাই ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর মেয়েটিকে তিনটি ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। পুলিশ বাকি ট্যাবলেট বাজেয়াপ্ত করেছে।

লোহরির সন্ধ্যায় সঞ্জি রাম সবাইকে বলে মেয়েটিকে হত্যার সময় এসে গেছে। সেই রাতে সেই মেয়েকে একটি সেতুর তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। তখনই সেখানে দীপক খাজুরিয়া পৌঁছায় এবং বলে খুন করার আগে ফের একবার সে মেয়েটিকে ধর্ষণ করতে চায়। তারপর সে ধর্ষণ করে। তারপর বাম থাইয়ের মধ্যে গলা পিষে মারতে চায় তাকে। পারে না। সঞ্জি রামের ভাইপো আসে এবং ওড়না দিয়ে মেয়েটির শ্বাসরোধ করে। তার পা দুটো পিছন থেকে মুড়ে ভেঙে দেয়। এরপর তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে দুবার পাথর দিয়ে মাথায় মারে।

লাশ ফের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৫ই জানুয়ারি সকালে জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়। নজির মাসুদি লিখেছেন, আদালতে আইনজীবীরা এত হাঙ্গামা করেন যে পুলিশের ছয় ঘণ্টা সময় লেগে যায় চার্জশিট দায়ের করতে। তার রক্তে ভেজা জামা গায়েব করে দেওয়া হয়। যে ডাক্তার ময়নাতদন্ত করেছিলেন তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়। এস এস পি রমেশ জাল্লা বলেছেন, তিনি প্রতি সপ্তাহে হাইকোর্টে স্ট্যাটাস রিপোর্ট দিচ্ছিলেন।

এবার এখান থেকে স্থানীয় সমাজ নিজেদের মৃত্যুর প্রমাণ দিতে শুরু করে। বাবা ইউসুফ নিজের জমিতে মেয়েকে কবর দিতে চান, কিন্তু স্থানীয় লোক সেটা করতে দেবেন না। মেয়েটিকে আল্লা শেষকৃত্যের জন্য দুই গজ জমি দিল না আর মন্দিরের ভগবানও তার লাজ রক্ষা করল না। আমরা ধর্মের নামে শয়তান হয়ে যাচ্ছি। তার বাবা ৮মাইল দূরের গ্রামে যান মেয়েটির লাশ নিয়ে, সেখানেই কবর দেন তাকে। সেখানেই আমাদের আর আপনার অন্তরাত্মাও কবর দেওয়া রয়েছে।

কৌশলে তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বি জে পি-র দুই মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। সি বি আই তদন্তের দাবির নাটক করা হলো। এই খেলায় বি জে পি-র উপাধ্যক্ষ অবিনাশ খান্নাও খেলেছেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংও খেলেছেন। কিন্তু সমাজ কেন চুপ, সেটা পরের অংশ পড়লে বুঝবেন। এই নীরবতার কারণ প্রধানমন্ত্রী নয়, নিজেকে করুন। যদিও প্রধানমন্ত্রীকেও এই প্রশ্ন করা যায় আপনি কেন বলেন না। দেশে তখনও ধর্ষণ হতো, কিন্তু আপনি নির্ভয়ার বিষয়ে বলেছিলেন কি বলেননি। তাহলে আপনি মেয়েটির বিষয়ে কেন বলতে পারছেন না? বললেই বা প্রধানমন্ত্রী কি বলবেন? উনি তো হয় উপবাস করেন না হলে বাজে বকেন।

এরা আপনাকে তিরঙ্গার চাদরে মুড়ে হিন্দুত্বের মনোবৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। এই জন্য নয় যে আপনারা সাত্ত্বিক আর আধ্যাত্মিক হয়ে যাবেন। করা হচ্ছে এই জন্যে যাতে কাউকে হত্যার সময়ে আপনি হিন্দুত্বের নাম নিয়ে চুপ করা শিখে নেন। আপনাদের নীরবতায় প্রমাণ হয়ে গেছে তারা সফল হয়ে গেছে। এই হিন্দুত্বে না আপনাদের রোজগার মিলেছে, না মিলবে। না হাসপাতাল মিলেছে, না মিলবে। না সৎ পুলিশ মিলেছে, না মিলবে। আর না নির্ভীক এবং ভালো ন্যায় ব্যবস্থা মিলেছে, না মিলবে। শুধু এক উন্মাদি ভিড় মিলেছে, যারা প্রতি সপ্তাহে দেশের কোনও কোনায় হাতে তলোয়ার নিয়ে দৌঁড়াতে দেখা যায়।

এই বিচারধারা আপনার প্রতি দিক থেকে ঠিক মনে হয়েছে। এর জন্য সেনার ব্যবহার করা হয়েছে। এদের জন্য অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের টিভিতে বসিয়ে পাকিস্তানকে সামনে আনা হয়েছে, যাতে আপনি পাকিস্তান পাকিস্তান করতে করতে নিজের প্রতিবেশী মুসলিমদের ঘৃণা করতে শুরু করেন। আপনি যদি ওই পথে ফিরে দেখেন, দেখবেন সেখানে আপনার সংবেদনার হত্যার নিশান রয়েছে। গোরক্ষার নামে উন্মাদি ভিড় হত্যা করেছে, আপনি চুপ রয়েছেন। বলা হয়ে থাকে এসবই আপনার বিশ্বাসের বিষয়। গোহত্যা চলবে না। মানব হত্যা চলবে? মন্দিরও তো আপনার বিশ্বাসের প্রশ্ন, তাহলে তার মধ্যে ধর্ষণ চলবে? মন টলেনি কারণ ততদিনে আপনি হত্যাকারী হয়ে গেছেন।

এখন আপনি এই ভিড় ছাড়া থাকতে পারবেন না। তাই আপনি এই ভিড়কে ছাড়া ক্ষমতার কল্পনা করতে ভয় পান। কাশ্মীরী পণ্ডিতদের নাম ব্যবহার করে আপনার মনে মুসলিমদের প্রতি বিষ ভরা হয়েছে। রমেশ কুমার জাল্লার মতো সাহসী এবং বলিষ্ঠ অফিসের নেতৃত্বে এই হত্যা এবং ধর্ষণের মামলার চার্জশিট তৈরি হয়েছে। আপনার রমেশকুমার জাল্লার সম্পর্কেও ঘৃণা তৈরি হয়েছে। মেয়েটির পরিবার আইনজীবী পায়নি তো দীপিকা লড়তে এসেছেন মামলা, যিনি নিজেই এক কাশ্মীরী পণ্ডিত। যে সমাজ অন্যায়ের সঙ্গে জুঝেছে, তারা জানেন ঘৃণার নামে এই হত্যার এই অন্তহীন ধারাবাহিকতার বেদনাকে। তাদের নামে রাজনীতি করা লোকগুলো চার বছরে একবারও কাশ্মীরী পণ্ডিতদের নাম নেয়নি। বললও যখন তখন একজন কাশ্মীরী পণ্ডিতের নিষ্ঠার ওপর প্রশ্ন তোলার জন্য। অদ্ভুত রাজনীতি!

গুগল করে দেখুন রাইসিনা হিলস, সে আপনার গাড়িকে সেখানে পৌঁছে দেবে যেখানে আপনি ২০১২সালে গিয়েছিলেন। তার আগে আপনি নিজেকে এই ঘৃণার রাজনীতিতে খোঁজ করুন। নিজের মৃতদেহ নজরে আসবে। নজরে আসবে কিছু লোক, যারা বলতে থাকবে এখনও তুমি মরোনি কারণ প্রশ্ন তোলে যে বাংলা, যে কেরালা তার বিরুদ্ধে বলোনি। আধমরা হয়ে পড়ে থাকা তুমি চুপই থাকো কেননা তোমার নীরবতা এক ব্যক্তির রাজত্ব চালানোর শখ পূরণ করার জন্য জরুরি। তার রাজত্বই তোমার রাজত্ব।

===========================

নিবন্ধটি NDTV.COM-এ ১৩ই এপ্রিল প্রকাশিত হয়। মানবতার প্রয়োজনে ও আইনী বাধ্যবাধকতায় এখানে ধর্ষণ-খুনের শিকার শিশুকন্যাটির নাম উহ্য রাখা হলো।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement