শিয়রে পূর্ণিমার চাঁদ

অরুণকুমার চক্রবর্তী

২২ এপ্রিল, ২০১৮

কুফরি, ফাগু, থিয়োগ আর নারকান্ডাকে পেছনে ফেলে পাকদণ্ডী পথ বেয়ে সিমলা থেকে এগিয়ে চ‍‌লেছি সারাহানের দিকে। ফুরফুরে হিমেল হাওয়াকে সঙ্গী করে রওনা দিয়েছিলাম সকাল সকাল। ঘণ্টা ছয়েকের পথ। গাড়ি চলেছে ২২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। শতদ্রু নদীর দর্শন পেলাম কিঙ্গল পৌঁছানোর পর। সবুজ উপত্যকার অনেক নিচ দিয়ে বয়ে চলে যাচ্ছে নীল জলধারা। সিমলা থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে একটু থামতে হলো। ৯২৪ মিটার উচ্চতায় রামপুর শহরে। পদম প্রাসাদ দেখার জন্য। একসময় রাজপুত রাজ্য বুশাহারের রাজধানী ছিল রামপুর। পাথর ও কাঠের সংমিশ্রনে তৈরি এই প্রাসাদটির নির্মাণশৈলী দেখবার মতো। কিন্তু দেখতে হলো বাইরের বাগান থেকে। ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। সারাহানে পৌঁছে লাঞ্চ করার তাড়ায় এখানে বেশি সময় কাটানো গেল না। শহর ছাড়িয়ে যত উপরে উঠছি ততই পাহাড়ের গায়ে বরফের গলা স্রোতের নিশানা চোখে পড়ল। বরফের চিহ্নমাত্র নেই। দূরে দেখা যাচ্ছে তুষারশৃঙ্গ। পাহাড়ের গা দিয়ে পথ উঠেছে উপরের দিকে। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে উচ্ছল শতদ্রু নদী। মে-র প্রথম সপ্তাহে আবহাওয়া যথেষ্ট ভাল থাকার কথা। কিন্তু সেই ভুল ধারণা একটা দমকা হাওয়ার মতো উড়ে গিয়েছে মে মাসে কিন্নরে পৌঁছে। হিমালয় ভ্রমণে এখন আর সেরা সময় বলে কিছু নেই। সেখানে মে মাসেও পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামতে থাকে বিশাল বিশাল বোল্ডার। যার জেরে জিওরি থেকে সারাহান যাওয়ার ডানদিকের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। ঘুরপথে যেতে হয় গন্তব্যে। সিমলা থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে সারাহান। উচ্চতা ২১৬৫ মিটার। যতই এগচ্ছি টের পাচ্ছিলাম ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজটা ক্রমশ বাড়ছে। পথ ফুরালো হোটেলে এসে। সারাহান পৌঁছাতে সময় লাগল প্রায় ৭ ঘণ্টা।

সন্ধেবেলা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চললাম ভীমাকালী মন্দিরের দিকে। হিন্দু-বৌদ্ধ স্থাপত্যশৈলীর অনুপম সংমিশ্রণে তৈরি এই মন্দির সারাহানের একমাত্র দ্রষ্টব্য। আর সেই আকর্ষণেই ছুটে আসা।

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। ছাদে উঠে দেখি আকাশে উজ্জ্বল আভা। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীখণ্ড পর্বতমালা। এখান থেকে শ্রীখণ্ড মহাদেব পর্বতশৃঙ্গের অবিস্মরণীয় রূপ দেখে পাগল হয়ে গেলাম। নিচে গিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম মীরা, মানা ও রঞ্জুদাকে। সবাই মিলে এমন একটা দৃশ্য উপভোগ করার মজাই আলাদা। প্রাতঃভ্রমণ করার ফাঁকেই দেখে নিলাম বুশাহার রাজাদের রাজবাড়ি।

তীর্থভূমি সারাহানকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম সাংলার উদ্দেশ্যে। দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার। গাড়ি চলেছে রুক্ষ পাহাড়ের ধার ঘেঁষে। এপথে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। ওয়াংটু ব্রিজ, তারান্ডা মাতার মন্দির টপকে পেরিয়ে এলাম তারান্ডা ঢাক। পাহাড়ের গা থেকে বারান্দার মতো অনেকটা অংশ ঝুলে রয়েছে খাদের দিকে। তার ফাঁক দিয়ে বানানো হয়েছে দুর্গম রাস্তা। এই আশ্চর্য পথটার পরিচিতি তারান্ডা ঢাক নামে। পাহাড় ঘেরা উপত্যকা, তুষারাবৃত হিমালয় আর স্বচ্ছ নদীর বয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে সাংলা পৌঁছালাম দুপুর ২টো নাগাদ। বিকালের দিকে গ্রাম দেখতে বেরোলাম। এখানে আবার কামরু ফোর্ট বলে একটা দ্রষ্টব্যও রয়েছে। ২ কিলোমিটার পথ ট্রেক করে যেতে হয় সেখানে। চড়াই ভেঙে পৌঁছে গেলে কিন্তু এ তল্লাটের সেরা প্রাকৃতিক দৃশ্য যে কোনও পর্যটকের সারা জীবনের সঞ্চয়। মিনার আকৃতির এই দুর্গে রয়েছে সংগ্রহশালা ও কামাখ্যা দেবীর মন্দির। কামরু গ্রামটি এই দুর্গকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত। প্রাচীন স্থাপত্য রীতিতে সমৃদ্ধ এই গ্রাম এলাকার অন্যান্য জনপদ থেকে স্বতন্ত্র অনেকটা এই দুর্গটির জন্যই।

কিন্নর ভ্রমণের তৃতীয় দিন। রোদ বেশ ঝলমল করছে। রয়েছে হালকা ঠান্ডা। দূরে পাহাড়ের গা ছুঁয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে ধূসর মেঘেরা। হোটেলে স্নান, ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা দিলাম ছিটকূলের পথে। রাস্তা এবার বেশ চড়াই। পাহাড়ের বুক চিরে সোজা উপরে উঠে যাওয়া পাশে বাসপা নদীকে সঙ্গী করে। সাংলা থেকে ছিটকূল যাওয়ার ২৬ কিলোমিটার রাস্তাটা যেমন রোমাঞ্চকর, চারপাশের দৃশ্য তেমনই উপভোগ্য। বাকরহিত হয়ে গেলাম ছিটকূলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে। ছিটকূল ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রাম। এখান থেকে তিব্বত সীমান্ত মাত্র ৩০ কিলোমিটার। ৩৪৫০ মিটার উঁচু এই গ্রামে শ-খানেক পরিবারের বাস। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল ইন্দো-টিবেটিয়ান-বর্ডার পুলিশ ক্যাম্প পর্যন্ত। পর্যটকদের এই পর্যন্তই যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু সময়াভাবে সে ইচ্ছা এবারে অপূর্ণ রইল। সাংলা ফিরে সেদিনই বেরিয়ে পড়লাম কল্পার দিকে। কল্পার দূরত্ব সাংলা থেকে ৪৫ কিলোমিটার।

কিন্নরে এসে অবধি তেমন কিছুই কেনা হয়নি। এবার রেকংপিও এসে কেনা হলো কিছু পশমের পোশাক। একদা কল্পা ছিল জেলার সদর শহর। বর্তমানে সেই শিরোপা উঠেছে রেকংপিওর মাথায়। রেকংপিও থেকে কল্পা যাওয়ার রাস্তাটি চিলগোজা ও পাইনের সমাহারে অতুলনীয়। ২৯০০ মিটার উচ্চতায় কিন্নর কৈলাসের শহর কল্পায় পৌঁছাতেই দেখি সাদা মেঘের দল ঘিরে ফেলেছে তুষার শৃঙ্গগুলোকে। দু’একটা কদাচিৎ উঁকি মারছে মেঘের আড়াল থেকে। পরদিন বুদ্ধ পূর্ণিমায় কিন্নর কৈলাসের অপার্থিব সৌন্দর্য দেখার জন্য দিনটি কল্পার জন্যই বরাদ্দ রেখেছি। রাত বাড়তেই মালুম পড়ছিল ঠান্ডাটা জব্বর পড়েছে। হোটেলের বারান্দায় গিয়ে ঠান্ডার আমেজটাকে উপভোগ করছিলাম। তখনই দেখলাম পূর্ণ প্রকাশিত চাঁদ। যেন পার্বতী শৃঙ্গের কপালে একটা গোল সোনালি নয়ন। হাড়ের মধ্যে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে একেবারে। তবু বারান্দা থেকে ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছেনা।

পরদিন প্রত্যুষেও আকাশ মেঘলা। পূব আকাশে আলো ফুটলেও বানেশ্বরের ৭৯ফুট শিবলিঙ্গের ওপর রঙের খেলা তখনও অদৃশ্য। আমাদের হোটেল অশোকার ঢিলছোঁড়া দূরত্বে চিনি গ্রাম দেখা যাচ্ছে। পায়ে পায়ে সেই গ্রামে পৌঁছে দেখলাম বৌদ্ধ মনাষ্ট্রি। পাশেই নারায়ণ নাগিনী মন্দিরটিও চমৎকার। গুম্ফার পেছনদিকে চণ্ডিকামাতার মন্দিরটিও দ্রষ্টব্য। প্রাচীন রোঘি গ্রামটি হেরিটেজ গ্রাম হিসাবে স্বীকৃত। চারদিকে লাল আর সোনালি আপেলের বাগান। মে মাসে আপেলের দেখা নেই যদিও। গাছের ডালভর্তি শুধু ফুল। লাল-সাদা রঙের ছোট ছোট ফুলগুলি ভারি সু্ন্দর দেখতে। ধীরে ধীরে বিকাল হল। সূর্যের তেজটাও কিছুটা কমেছে। দুর্যোগের কোনও আভাস নেই। দূরের শিবলিঙ্গ যেন আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। ক্রমে পশ্চিম পাহাড়ের পিছনে সূর্য নামতেই কিন্নর কৈলাসে রং বদলের পালা চলতে থাকল। সত্যিই যেন আগুন জ্বলে উঠল শিবলিঙ্গে। এখানেই শেষ নয়। এরপর সন্ধে নামতেই চাঁদের আলো ক্রমশ তীক্ষ্ণ হতে লাগল। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে চমকে উঠলাম। শিয়রে পূর্ণিমার চাঁদ। বারান্দায় পাতা চেয়ার, ঘরের মেঝে, বিছানা-চাদর সবকিছু জ্যোৎস্নায় ভাসছে। পাশের ঘরে মানা ও রঞ্জুদা আগেই জেগে বসে রয়েছে। বুদ্ধপূর্ণিমার তীব্র চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে কিন্নর কৈলাসের প্রতিটি চূড়া। সব মিলিয়ে যেন এক পিকচার পোস্টকার্ড।

Featured Posts

Advertisement