মংপুর গভীরে

অঙ্গীরা ভট্টাচার্য

২২ এপ্রিল, ২০১৮

পাহাড়ে বেড়াতে হলে বর্ষা আর শীত এই দুটো সময়ই আমার উপযুক্ত মনে হয়। শীতে কনকনে ঠান্ডা, কুয়াশা, মিষ্টি রোদ আর বরফের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তবে পাহাড়ের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে বর্ষায়। ঘন সবুজ বন, পাহাড় থেকে প্রবল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়া ঝরনা, দামাল নদী। বর্ষা ছাড়া পাহাড়ের এই রূপ সারা বছর দেখা যায় না। তবে মেঘ আর বৃষ্টির সঙ্গে লুকোচুরি খেলেই ঘুরে বেড়াতে হয়। তাড়াহুড়ো করলে ভিজে একসা হতে হয়।

আগেও মংপু এসেছি। ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় মংপুর পাহাড়ের উপরে তাঁবু খাটিয়ে ছিলাম আমরা কয়েকজন। তাঁবুর বাইরে শুকনো কাঠকুটো জড়ো করে আগুন জ্বালিয়েছি একটু উত্তাপের খোঁজে। সন্ধ্যা নামতেই ঠান্ডা থেকে বাঁচতে পাহাড়গুলো অন্ধকারের টুপি পড়ে তৈরি হয়ে নেয়। দূরের দার্জিলিঙের পাহাড়ে একটা দুটো করে আলো জ্বলে ওঠে। আস্তে আস্তে গোটা পাহাড়টাই ভরে উঠল আলোয়। যেন দীপাবলির উৎসব।

আমরা যেখানে আছি সেটা দার্জিলিঙ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে ৩৭০০ মিটার উঁচুতে একটা ছোট গ্রাম মংপু। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিঙের বাসে এসে রম্বী ফটকে নেমে একটা ছোট গাড়িতে মংপু এসে পৌঁছেছি। দুপাশের পাহাড়ে সিঙ্কোনার বন। বুনো সিঙ্কোনার ছাল থেকেই একদিন বিজ্ঞানী রোনাল্ড রস কুইনাইন তৈরি করে কালান্তক ম্যালেরিয়ার মোকাবিলা করেছিলেন। তারপর থেকে এখানে সিঙ্কোনা চাষ শুরু হয়। তৈরি হয় কারখানা। বসতি শুরু করেন কারখানার লোকজনেরা। একসময় এই কারখানার দায়িত্বে এলেন ড. এম এম সেন। তাঁর স্ত্রী মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা। তাঁরই ব্যবস্থাপনায় হাওয়া বদল করতে মংপুতে আসেন রবীন্দ্রনাথ। শান্ত পাহাড়ের কোলে এই আবাসে কবি বারে বারেই চলে আসতেন। এখান থেকেই তিনি অসুস্থ হয়ে কলকাতায় ফিরে যান। সেই তাঁর শেষ যাওয়া। সিঙ্কোনা আর রবীন্দ্রনাথ —এই নাম দুটিই মংপুর পরিচিতি। এখানকার লোকের ভালবাসা, গর্ব এই পরিচয়ে।

পর্যটন মানচিত্রে মংপু নতুন নয়। কিন্তু উজ্জ্বলতার দিক থেকে তা অনেকখানি নিষ্প্রভ। কারণ মংপুর পাহাড়, জঙ্গলের অবগুন্ঠন উন্মোচনের কথা কেউ কোনওদিন ভাবেনি। তাই আমাদের কাজ হলো মংপুর প্রাকৃতিক রহস্যের দুয়ার খুলে দেওয়া।

স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ে ঘুরতে বেরোলাম। ছোট্টনদী রম্বীখোলা। নেপালি ভাষায় খোলা শব্দের অর্থ ছোট নদী। নদীর চলার পথের উপর একটা বহু পুরানো ভগ্নপ্রায় কাঠের সেতু। কোনকালে ইংরেজরা তৈরি করেছিল। কাঠের সেতুর নিচে ছোট জলপ্রপাত। তার ঠিক উপরে সিমেন্ট আর পাথর দিয়ে তৈরি বেশ বড় জলাধার। এখান থেকেই পাইপে করে জল নিয়ে যাওয়া হতো কুইনাইন কারখানায় আর মংপুর মানুষের জলের চাহিদা মেটাতে। সেতুর পর থেকে পাথরের রাস্তা কার্শিয়াং চলে গেছে। দুজন মানুষের কাজ ছিল প্রতিদিন ঘোড়ায় চড়ে কার্শিয়াং থেকে খবরের কাগজ, চিঠিপত্র, পাঁউরুটিআর অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মংপুর সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এদের ‘পেপারম্যান’ বা ‘ব্রেডম্যান’ বলা হতো।

এবার জুন মাসের মাঝামাঝি আবার মংপুতে এসে হাজির হয়েছি। অর্কিড হাউসের লাগোয়া গেস্ট হাউসে উঠেছি। এবারে গন্তব্য রজ্জুভ্যালি ফরেস্ট। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে একটা পাথরের রাস্তা ধরে পাহাড়ের উপরে উঠতে শুরু করি। একসময় রাস্তা শেষ। একটা পায়ে চলা রাস্তা ধরে এগোতে থাকি। অনেকদিন এই রাস্তায় কেউ হেঁটেছে বলে মনে হলো না। একসময় এই রাস্তাও শেষ। আমার সঙ্গী দিগেল দাজু আর অনিল দাজু। এঁরা স্থানীয় মানুষ। এই পাহাড় জঙ্গলের প্রতিটি গাছ পাথর এঁদের নখদর্পণে। তবে এই সময় জোঁকের উৎপাত খুব বেশি। সাবধানে থানা সত্ত্বেও পায়ের থেকে কয়েকটা উৎপাত টেনে ছুঁড়ে ফেলতে হলো। গাছের গায়ে বুনো শুয়োরের দাঁতের দাগ, চিতা বাঘের বিষ্ঠা মনের মধ্যে একটু রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে। আমার সঙ্গী দাজুরা কিন্তু অকুতোভয়। সর্বক্ষণের সঙ্গী কুকরি হাতে তাঁরা চিতা বাঘের সঙ্গে লড়াই করতেও রাজি।

একটা শুকনো নদীখাত পেরোতে হবে। খুবই সংকীর্ণ একটা জায়গা। একটা পা কোনওমতে রেখে লাফ দিয়ে পার হতে গিয়ে পা হড়কে গেল। একটা গাছের ডাল ধরে টাল সামলে নিলাম। কিন্তু ডালের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হলো হাত। এদিকে আকাশের ঘন মেঘ বনের ভিতরটা অন্ধকার করে তুলেছে। দ্রুত ফেরার পথ ধরি। শর্টকার্ট করার জন্য অন্য পথ ধরে এগোই। খাড়াই ঢাল বেয়ে ২০০ মিটার নামার পর পুরানো রাস্তায় ফিরে ভিজতে ভিজতেই গেস্টহাউসে ফিরলাম। এতক্ষণে হাতের যন্ত্রণাটা মালুম হচ্ছে।

শীতের দুদিন, আর বর্ষায় ঘণ্টা চারেকের যাত্রার মধ্যেই প্রকৃতির সঙ্গে যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাতে সমস্ত যন্ত্রণা, ভয় গৌণ হয়ে যায়। দিনে কত রকমের পাখির ডাক আর রাতে তাঁবু থেকে কত রকম জন্তুর ডাক যে শুনেছি। তবে অনেক কিছুই অদেখা রয়ে গেল। বারে বারে আসতে হবে মংপুতে।

Featured Posts

Advertisement