‘থমকে যাওয়ার আখ্যান...’

ভাস্কর দাশগুপ্ত

২৮ এপ্রিল, ২০১৮

জঙ্গলমহল বান্দোয়ান। এক সময় লোকে বলতো আন্দামান। ষাট বা সত্তরের দশকে সরকারি আধিকারিকরা সেখানে যেতে চাইতেন না। তাদের কাছে বান্দোয়ান যাওয়া ছিল নির্বাসনের সমান। ৩৪ বছরের বাম শাসনকালে বান্দোয়ানের মানুষ দেখেছিলেন বদলে যাওয়া বান্দোয়ানকে।

পরিবর্তনের সাত বছরে উন্নয়নের জোয়ারে কতটা ভাসল সেই বান্দোয়ান?

এই ‘উন্নয়নের জোয়ার’ যেন থমকে যাওয়া! ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে ক্ষমতা দখলের পর সেখানকার মানুষ ‘উন্নয়ন’ অবশ্যই দেখেছেন। তবে সে উন্নয়ন শাসকদলের নেতাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন। শাসকদলের এক নেতার বক্তব্য, ‘এই কয়েক বছরে বান্দোয়ানে আর কিছু না বাড়ুক মদ বিক্রি বেড়েছে। তাই শাসকদল উদ্যোগ নিয়েছে বান্দোয়ান ব্লকে আরও কয়েকটি সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদের দোকান খোলার।’ সংবাদমাধ্যমের কাছে নাম বলতে নারাজ বহু সাধারণ মানুষের স্পষ্ট মন্তব্য, রাস্তাঘাট, দু’টাকা কেজি চাল পাওয়া ছাড়া আর কোনও উন্নয়ন হয়নি জঙ্গলমহল বান্দোয়ানে। মানুষের কাজ নেই, কৃষির বিকাশ নেই, পর্যটনে উৎসাহ‍‌ নেই, বান্দোয়নের পরতে পরতে তাই থমকে যাওয়ার আখ্যান।

বান্দোয়ানের ভোমরাগোড়া গ্রাম। যে গ্রামে ২০০৫ সালের বর্ষশেষের রাতে তৃণমূল আশ্রিত মাওবাদীরা নৃশংসভাবে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল সি পি আই (এম)-র তৎকালীন জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তথা প্রাক্তন সভাধিপতি রবীন্দ্রনাথ কর এবং তাঁর স্ত্রীকে। যে সমস্ত মাওবাদীদের নামে খুনের অভিযোগ রয়েছে, তাদের এই সরকার জামাই আদরে সুরক্ষা দিয়ে চাকরি দিয়েছে। ভোমরাগোড়ার মানুষ সেই নৃশংস রাতের কথা আজও ভুলতে পারেননি। গত পঞ্চায়েতে কুঁচিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত দখলে ছিল সি পি আই (এম)-র। কিন্তু কোনও কাজ করতে দেওয়া হয়নি সেখানে। উপভোক্তাদের নামের তালিকা গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে পাঠালে ব্লক থেকে তা বাতিল করে দেওয়া হতো অজানা কারণে।

ষাটোর্ধ্ব শ্রীচরণ কর্মকার, কাজ করার শক্তি নেই। পাননি বার্ধক্যভাতা, ভাঙা ঘরে প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে দিন কাটান। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় ঘর চেয়েছিলেন। আজও ঘর পাননি। অথচ স্থানীয় তৃণমূলের নেতারা ‘ঘর করে দেব’ বলে একশো-দেড়শো টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ। একটা ঘরের আশায় হতদরিদ্র মানুষটা কষ্ট করে এই টাকা দিয়েছেন। কিন্তু মেলেনি ঘর। জীবদ্দশায় আর সে ঘর পাবেন বলে আশাও করেন না।

জঙ্গলমহল বান্দোয়ানের বাসিন্দা রাজেন মুর্মু, কি পেয়েছেন পঞ্চায়েতের কাছে? জবাব, ‘২টাকা কেজি দরে চালটুকু ছাড়া আর কিছুই পাইনি। উন্নয়ন যা হয়েছে তা শাসকদলের নেতা-কর্মীদের হয়েছে।’ সাধাসিধে মানুষ চুনারাম মুর্মু ইন্দিরা আবাসের ঘর চেয়েছিলেন। দু’বার তালিকায় নাম উঠলেও কোনও এক অজানা কারণে ঘর আর তার হয়নি।

স্থানীয় মানুষজনের প্রত্যেকের কথাতেই ফুটে উঠেছে, জীবন-জীবিকার কোনও পরিবর্তনই হয়নি তাঁদের, যাকে তাঁরা উন্নয়ন বলবেন। একশো দিনের কাজ এমনিতেই নেই। যেটুকু বা হয়েছে সে কাজেরও মজুরি বাকি কারও ৬ মাস, কারও সাত মাস, কারও আবার তিন বছর!

জঙ্গলমহল বান্দোয়ানের মানুষের জীবন ও জীবিকা বলতে বাবুই ঘাস থেকে দড়ি তৈরি করা এবং জঙ্গলের কাঠ-পাতা কুড়িয়ে এনে বাজারে জ্বালানি হিসাবে বিক্রি করা। ভোরের আলো ভালো করে ‍‌ফোটার আগেই গ্রামের মহিলারা এবং পুরুষরা দল বেঁধে জঙ্গলে যান। পাহাড়ি পথ বেয়ে এগিয়ে চলা জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠ-পাতা সংগ্রহ করতেই কেটে যায় সারাবেলা। তারপর সেই শুকনো কাঠ মাথায় নিয়ে পায়ে পায়ে ঘরে ফেরা। পরের দিন স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে যতটুকু আয় হয় তা পরিশ্রমের তুলনায় অত্যন্ত কম। স্কুলে নাম আছে এমন ছেলেমেয়েরাও পেটের টানে স্কুল যাওয়া বন্ধ করে জঙ্গলে যায় কাঠ সংগ্রহ করতে। আবার কোনও কোনও মানুষের জীবিকা জঙ্গল থেকে বাবুই ঘাস সংগ্রহ করে এনে তা দিয়ে দড়ি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা। জঙ্গল থেকে বাবুই ঘাস কিনে আনতে হয় তাঁদের। বাবুই দড়ি বিক্রি করেও তেমন আর অর্থ পাওয়া যায় না। বান্দোয়ানের মানুষের আরেকটি অন্যতম জীবিকা ছিল কেন্দুপাতা সংগ্রহ করে বিক্রি করা। তাঁদের এই কাজে সাহায্য করতো স্থানীয় সমবায় সমিতিগুলো। এই আমলে সেই সমবায় সমিতিগুলি একেবারে নিষ্ক্রিয়। বাড়েনি কেন্দুপাতার দাম।

কেমন আছেন বান্দোয়ানের মানুষ?

বান্দোয়ানের থাড়কাদহ গ্রামের মানুষদের ক্ষোভ, জলের অভাবে শীতের পর আর কোনও চাষ করতে পারেন না। এলাকায় একশো দিনের কাজও হয় না। ধান চাষও যে খুব ভালো হয় তা নয়। গরমের শুরুতে তাঁরা অন্যের জমিতে সজনে গাছ লাগিয়ে সজনে ডাঁটা বাইরে পাঠান। আর কেউ কেউ জঙ্গল থেকে মহুল ফুল কুড়িয়ে এনে শুকনো করে তা বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু এ সব কাজে নেই জীবিকার নিশ্চয়তা। কিছু না পেয়ে মানুষ বাধ্য হন এসব কাজ করতে।

বান্দোয়ান এলাকায় শশা, টমাটো, লাউ প্রভৃতি চাষ হয় যথেষ্ট ভালো। এখানকার টমাটো বাক্সবন্দি হয়ে তিন জেলা, এমনকী ভিন রাজ্যেও ‍যেত। বাম আমলে এলাকার কৃষকদের জন্য বা‍ন্দোয়ানে খোলা হয়েছিল হিমঘর। এই আমলে সেই হিমঘর বন্ধ। কৃষকরা ফসলের দাম পাচ্ছেন না। অনেকেই বাজারে বিক্রি করতে না পেরে উৎপাদিত ফসল (বিশেষত টমাটো) আর বাজার থেকে পয়সা খরচ করে বাড়িতে ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন না। রাস্তাতেই গোরু-ছাগলের খাওয়ার জন্য ফেলে দিয়ে যাচ্ছেন। সেই হিমঘর খোলার জন্য প্রশাসন ন্যূনতম কোনও উদ্যোগ নেয়নি। হতাশ এলাকার কৃষকরা।

দুয়ারশি‍নিতে একটি ছোট্ট মিষ্টির দোকান চালান অতুল মাহাতো। ওখানে আরও বেশ কয়েকটি ‍‌ দোকান রয়েছে। সাপ্তাহিক হাটও‍ বসে। বহুবছর ধরে অতুল মাহাতো, কলেন্দ্রনাথ সিংয়ের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। আজও পানননি। ফাঁকা জায়গায় অন্ধকার পরিবেশে পরিবার নিয়ে থাকেন, ভয় পান। কিন্তু কোনও উপায় নেই। তবুও প্রশাসনের দাবি, একশো শতাংশ বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ।

পাহাড়, জঙ্গলে ঘেরা বান্দোয়ানের পর্যটন ‍শি‍‌ল্পে বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। দুয়ারশিনি প্রাকৃতিক নিবাস এই আমলে একেবারে উপেক্ষার তালিকায়। বাম আমলে দুয়ারশিনিতে পঞ্চায়েত সমিতির অতিথি নিবাস তৈরি করার কাজ শুরু হয়েছিল। নির্মীয়মাণ সেই অতিথি নিবাস মাওবাদীরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল। আজও ধ্বংসের চিহ্ন নিয়ে সেই অতিথিনিবাস ‘উমুল’ দাঁড়িয়ে আছে। সংস্কারের বা পুনর্নির্মাণের কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জেলা সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বান্দোয়ানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, এখানে ছৌ এবং তিরন্দাজ আকাদেমি তৈরি করা হবে। বছর পেরিয়ে গিয়েছে, সেই আকাদেমি আর তৈরি হয়নি। বান্দোয়ানের জঙ্গলের গাছ বেআইনিভাবে কাটা হচ্ছে শাসকদলের নেতার মদতে। পাহাড় কেটে পাথর পাচার করে দেওয়া হচ্ছে, সবার চোখের সামনে। প্রশাসন নির্বিকার। মানুষের অবস্থার পরিবর্তন নয়, বান্দোয়ানের সার্বিক উন্নয়ন নয়, এই কয়েকবছরে শাসকদলের নেতাদের সম্পত্তিরই শুধু উন্নয়ন হয়েছে। বাকি সবার জন্য ফাঁকা আওয়াজ!

Featured Posts

Advertisement