‘মোচ্ছবের মৌতাত’...

ভাস্করব্রত পতি

২৮ এপ্রিল, ২০১৮

মেলার পর মেলা। উৎসবের পর উৎসব। শুধু হাসি মশকরা আর হই হুল্লোড়। চারদিকে নাকি মানুষের মনে শুধুই খুশির ছররা! দুঃখের ‍ লেশমাত্র নেই। তাই গত ৫-৭ বছরে সারা রাজ্যের মতো পূর্ব মেদিনীপুর জেলাজুড়ে গঞ্জে-গঞ্জে কেবল শামিয়ানা তুলে উৎসবের মৌতাতে পাগলপারা মানুষজন।

নিয়োগ বন্ধ। বেতন বৃদ্ধি অতলতলে তলিয়ে। কারখানার চাকা অনড়। শ্রমিক ছাঁটাই। কাজ হারিয়ে আত্মহত্যা। দেনার দায়ে আত্মঘাতী কৃষক। ধর্ষণের বাড়বাড়ন্ত। ডোমের কাজের জন্য ডক্টরেট পাওয়া মেধাবীর আবেদনপত্র! স্কুল-কলে‍‌জে ‍‌‍‌‍শিক্ষক নেই। অফিস-আদালতে কর্মী সংকট। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের নাজেহাল অবস্থা। রাতারাতি ইঁদুর মারা বিষ বিক্রেতা থেকে শৌচাগারের বেড়ি পরানো শ্রমিকের দল‍‌ কোনও এক অদৃশ্য জাদুকাঠির (পড়ুন তৃণমূল নেতা) সৌজন্যে কোটি কোটি পতি।

এই অবস্থায় গ্রামে-গ্রামে এখন মেলা-খেলার বাড়বাড়ন্ত। কোথা থেকে আসছে টাকা? কারা দিচ্ছে? কেন দিচ্ছে? সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে চলবে না। কারণ, ‘উন্নয়ন’ এখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে!

জেলাতে আগেও উৎসব হতো। কিন্তু গত কয়েকবছর যেন মেলার চরিত্রই বদলে ফেলেছে বর্তমান তৃণমূল সরকার। কোথাও কোথাও সরকারি ব্যবস্থাপনায় মেলার আয়োজন করে সরকারি অর্থের ‘মোচ্ছব’ চলছে দেদার। অথচ সেইসব উৎসবে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নেই বললেই চ‍‌লে। মাঝখানে কিছু নেতা, নেতার সহকারী, ফড়ে, দালাল ‘করে কম্মে’ খেতে পারছেন। দীঘার‍‌ বিচ ফে‍স্টিভ্যালের বিরুদ্ধে এরকমই অভিযোগ সি পি আই (এম) বিধায়ক শেখ ইব্রাহিম আ‍‌লির। রাজস্থানী মঞ্চ ভাড়া করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকায়। সেখানে সাধারণ মানুষের স্থান নেই। মেলার নাম করে দোকানদার, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তোলা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। সে টাকা কোথায় যাচ্ছে? — কেউ জানে না। ২০১৫-২০১৬’তে পাঁশকুড়ার বালিডাংরিতে শুরু হওয়া ‘পাঁশকুড়া উৎসব’-এর মুখ্য টাকা আসতো নাকি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় করে। এবছর অবশ্য তা বন্ধ।

মেলা হচ্ছে। কলকাতা থেকে নামীদামি শিল্পীরা আসছে। লক্ষ লক্ষ টাকা উড়ছে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক নেই সেই মেলায়। আসলে মানুষের অভাব, অভিযোগ, বঞ্চনা, প্রতারণা আর না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে নজর ঘোরাতেই উৎসবের নামে বেলেল্লাপনাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে গত কয়েকবছর ধরে।

ভীষণভাবে বেড়ে গিয়েছে জুয়া খেলা, মদ খাওয়া আর অশ্লীল নাচ। মেলা মানেই এখন বেকারদের এইসব আবহে আবদ্ধ করে একটা অদ্ভুত ‘মোহগ্রস্ত’ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পটাশপুরের ‘নৈপুর হাঙ্গামা’ নামে এক অত্যন্ত অশ্লীল কুরুচিকর নাচের বাড়বাড়ন্ত মেলাগুলিতে। প্রতিবাদের উপায় নেই। প্রতিরোধ তো কোন ছাড়!

খোদ নন্দীগ্রামে, যেখানকার জমি আন্দোলন নাকি কাঁপিয়ে দিয়েছে সারা বিশ্ব! সেখানেও তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে একাধিক মেলার উদ্ভব। একটা নন্দীগ্রাম পল্লি উৎসব এবং অন্যটি নন্দীগ্রাম উৎসব। মেলার যৌক্তিকতা রয়েছে আর্থ সামাজিক কারণেই। কিন্তু বর্তমানে জেলাজুড়ে মেলার নামে ‘মোচ্ছব’ শুরু হয়েছে এবং একশ্রেণির বেকার যুবকদের মগজধোলাই করা হচ্ছে ‘মদ-মাংস’ ও কিছু ‘উপরি’র টোপ দিয়ে।

তৃণমূলের এই ‘কালচার’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর ছাত্রনেতা পরিতোষ পট্টনায়ক, মহাদেব ভুঁইয়া থেকে শিক্ষক নেতা অনাদিনন্দন রথ, কার্তিক আদকরা। মঞ্চের সামনে একটা মেলা। পিছনে আরেকটা মেলা! চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে জেলাজুড়ে। ফিল্মি নায়ক-নায়িকাদের হাল ফ্যাশনের ‘প্রেজেন্টেশন’ মানুষ গিলছে বাধ্য হয়েই। কোথাও গণেশ পুজো, কোথাও আবার শীতলা পুজো। ‘এরকম ট্র্যাডিশন আগে ছিল না’ —স্পষ্ট অভিযোগ কার্তিক আদকের। মেলার নাম করে জোর করে চাঁদা আদায় চলছে। কেউ বলার নেই। কারণ ওই মেলার মুখ্য উপদেষ্টা তথা ‘হর্তাকর্তা’ হয়তো তৃণমূলের কোনও ‘বড়-মেজ বা ছোট’ মাপের নেতা! নেতার বিরুদ্ধে মুখ খোলে — সাধ্য কার? আর চাপা থেকে যায়, টেট পাশ না করেও ড্যাং ড্যাং করে চাকরির নিয়োগ পত্র (১২-১৫ লক্ষ টাকা দিয়ে) পাওয়া কোনও ধনী বাবার বখাটে ছেলেকে দেখে টেট পাশ করেও চাকরি না পাওয়া অসংখ্য মেধাবী ছাত্রের হাহাকার।

এসব সত্ত্বেও তৃণমূল সরকারের উন্নয়ন তো রাস্তায়, পাড়ার মোড়ে মোড়ে, ঝাঁ চকচকে মেলার স্টেজজুড়ে?

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement