NO স্যারেন্ডার

অর্ক রাজপণ্ডিত

২৯ এপ্রিল, ২০১৮

‘অফেন ইউ নিড টু টেক সাম রিস্ক, বাট ইট মাস্ট বি এ রিয়েলিস্টিক রিস্ক, ইউ কান্ট টেক এ ক্রেজি রিস্ক’। মাঝে মাঝে তোমায় ঝুঁকি নিতে হবে কিন্তু সেই ঝুঁকি যেন বাস্তবতার হয়, তুমি পাগলামির ঝুঁকি নিতে পারো না।

৩৫ বার নিজের বানানো একের পর এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড ভাঙার পর বলেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আজকের ইউক্রেনের পোল ভল্টার সের্গেই বুবকা।

সের্গেই বুবকা মানেই নিজের রেকর্ড নিজে ভাঙা। এক শিখর থেকে আরেক শিখরে। পরের বার আরো জোরে উল্লম্ফন। আরো একটা রেকর্ড। স্পোর্টস গুডস-র দুনিয়া কাঁপানো নির্মাতা ‘নাইকি’ বুবকার জন্য রেখেছিল লোভনীয় অফার। যত বার নিজের রেকর্ড ভাঙবেন বুবকা পাবেন এক লক্ষ মার্কিন ডলার! বলা বাহুল্য নিজের পরবর্তী রেকর্ড তৈরিতে বেশি সময় নেননি বুবকা।

...........................

অবিকল সের্গেই বুবকার মতই তৃণমূলের ট্র্যাক রেকর্ড। ২০১১ সালের পর এই বাংলায় যতগুলি ভোট হয়েছে প্রতি ভোটেই হিংসা, রক্ত, সন্ত্রাসে আগের ভোটের রেকর্ড ভেঙেছে তৃণমূল।

২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন। তৃণমূলের শাসন জমানার বয়স তখন মাত্র দুবছর। ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে খুন হয়েছিলেন ২৭জন। মাত্র দু বছর আগে বিপুল জনাদেশ নিয়ে ক্ষমতায় আসা মমতা ব্যানার্জি ভয় পেয়ে গেলেন তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব জমানার প্রথম ভোটেই। নির্বাচন করবেন না। বল গড়ালো সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। হারল রাজ্য সরকার। তখন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার পদে মীরা পান্ডে। ব্যতিক্রমী সাহস নিয়ে নাস্তানাবুদ করেছিলেন সরকারকে আদালতের লড়াইতে।

সেই ভোটেই বাংলা প্রথম চিনেছিল মাথায় অক্সিজেন কম যাওয়া বীরভূমের তৃণমূল গুন্ডাবাহিনীর বেতাজ বাদশা ‘কেষ্ট’কে। ‘আমি বলছি বিরোধীরা ভোটে দাঁড়ালে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিন, পুলিশ এলে পুলিশকে বোম মারুন’।

মামলার পর মামলা। শুনানির পর শুনানি। গায়ে আঁচড়টুকু পড়েনি অণুব্রত মণ্ডলের। অবিকল বুবকার মত ‘কেষ্ট’র নিত্য নতুন রেকর্ড। ২০১৬-র বিধানসভায় ‘গুড় বাতাসা’। চলতি পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাস্তায় দাঁড়ানো ‘উন্নয়ন’ আর ব্লক অফিস গুলিতে ‘মাছি’ গলতে না দেওয়া।

খুন, লুটতরাজের রেকর্ড নির্মাণ শুরু। ২০১৩-র পঞ্চায়েত ভোট থেকেই। পঞ্চায়েত নির্বাচন শুরুর আগেই ২০১৩ সালের ৩রা জুন থেকে ২৮শে জুন পর্যন্ত সময় কালে খুন হয়েছিলেন দশ জন সি পি আই (এম) কর্মী। বর্ধমানে প্রবীণ পার্টিনেত্রী মহারানি কোঙারকে ছিঁচকে চুরির মামলা দিয়েছিল তৃণমূলের পুলিশ। তৃতীয় দফার ভোটে আমডাঙায় ভোটকেন্দ্রের বাইরে বোমায় খুন হয়েছিলেন মাদারবক্স মল্লিক। দ্বিতীয় দফায় তিন জন, চতুর্থ দফায় ৫জন, পঞ্চম দফায় ৯জন খুন হয়েছিলেন ভোটের দিনে।

২০১৩-র পঞ্চায়েত নির্বাচন মিটতেই তড়িঘড়ি চলে এল বর্ধমান, গুসকরা, চাকদহের মত ১২টি পৌরসভার ভোট।

আবার নতুন রেকর্ড তৃণমূলের খুনে লুম্পেন বাহিনীর।

সকাল আটটা বাজার আগেই দখল বর্ধমান পৌরসভার ৩৫টি ওয়ার্ড। চাকদহ পৌরসভার ২৩টি ওয়ার্ড। রক্তাক্ত পানিহাটি। বীরভূম থেকে আসা অণুব্রত বাহিনী কোমরে পিস্তল গুঁজে সকাল সাতটা থেকেই দাঁড়িয়ে বর্ধমানে বুথে বুথে।

চাকদহ ও বর্ধমান পৌরসভার নির্বাচন থেকে সরে এসেছিল বামফ্রন্ট নির্বাচন শুরুর কয়েক ঘন্টা পরেই।

.......................................

২০১৪-র লোকসভা নির্বাচন। প্রথম দফা ও দ্বিতীয় দফার ভোট উত্তরবঙ্গে। শান্তিতে মিটলেও দক্ষিণবঙ্গে নির্বাচন আসতেই আবার খুন জখমের রেকর্ড খুনে বাহিনীর।

তৃতীয় দফার ভোটের আগেই পশ্চিম মেদিনীপুরে পর পর সি পি আই (এম) কর্মী খুন। গণতন্ত্র রক্ষায় শহীদ হয়েছেন ঘাটালে প্রহ্লাদ রায়, চন্দ্রকোনায় মহিসেন খান, কেশপুরে উত্তম দলুই।

ভোট দিতে যাওয়ার অপরাধে হাড়োয়ার তৃণমূল বিধায়ক উষারানি মণ্ডলের নির্দেশে হাড়োয়ায় নিরীহ গ্রামবাসীর উপর নির্বিচারে গুলি চালায় লুম্পেন বাহিনী। সারা বাংলা দেখেছিল টিভির পর্দায় গুলিবিদ্ধ মানুষগুলি জখম হয়ে কাতরাচ্ছেন হাসপাতালে। বেলঘরিয়ায় মাথা ফাটে যুব নেতা সায়নদীপ মিত্রর। নদীয়ায় ঘাতক বাহিনীর হাত থেকে ছেলেকে বাঁচাতে খুন হয়েছিলেন বেলা দে।

২০১৫-র কলকাতা কর্পোরেশন। আবার রেকর্ড। গিরিশ পার্কে সটান তৃণমূলের খুনে বাহিনীর গুলিতে রাজেন্দ্রনারায়ণ স্ট্রিটে লুটিয়ে পড়েছেন পুলিশ। কলকাতা শহর ও শহরতলির নির্বাচনের দিন অবাধ বোমাবাজি। গুলি। এই ভোটে তৃণমূলের মুকুটে নতুন পালক।

তৃণমূলের মন্ত্রীসান্ত্রীদের কথা মত বাধ্য হয়ে চলেও বেপরোয়া হুমকি আর দাবড়ানির চোটে ভোটের ফল প্রকাশের আগেই ইস্তফা দিয়েছিলেন তৎকালীন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার সুশান্তরঞ্জন উপাধ্যায়!

কীভাবে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে হাতে হকি স্টিক, লাঠি, কোমরে পিস্তল গোঁজা লুম্পেন বাহিনী ভোটারদের তাড়া করে, কীভাবে পুলিশ ও তৃণমূল একযোগে সাংবাদিক পেটানোয় নয়া রেকর্ড গড়া সেই ভোট ছিল ২০১৫ সালেরই ৩রা অক্টোবর।

বিধাননগর কর্পোরেশনের নির্বাচন। পুরো বিধাননগরে গিজগিজ করেছে তৃণমূলের বাইক বাহিনী। ৪১নং ওয়ার্ডে প্রবীণ নাগরিক প্রীতি কুমার সেনকে রাস্তায় ফেলে বুকে লাথি মারছে বীরপুঙ্গবের দল, পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে পুলিশ!

...............

একের পর এক নিজের রেকর্ড ভাঙা সের্গেই বুবকার কথায় ছিল সতর্ক বার্তা। ‘ইউ কান্ট টেক এ ক্রেজি রিস্ক’। পাগলামির ঝুঁকি নিও না।

তৃণমূলের শাসন জমানায় চলতি পঞ্চায়েত নির্বাচনে সেই ‘পাগলামির ঝুঁকি’ই নিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। নতুন রেকর্ড করতে। এবারের পর্বে যুক্ত হয়েছে নতুন আগ্রাসী ভঙ্গিমা। শুধু বোমা গুলি আর ব্লক অফিস ঘেরাও করে রেখে মনোনয়ন তুলতে বাধা দেওয়া যথেষ্ট নয়, এবারে অন ক্যামেরা সম্ভ্রমে হাত দাও মহিলার। খুলে ফেল শাড়ি। চালাও গোপনাঙ্গ লক্ষ্য করে লাথি।

নতুন রেকর্ড। নির্বাচন কমিশন আদালতের রায়ে মনোনয়ন একদিন বাড়ানোর জন্য রাতে নির্দেশিকা জারি করে সকালে সেই নির্দেশিকা বাতিল করার নির্দেশিকায় লিখতে হয় তৃণমূলের দাপুটে আইনজীবী সাংসদের নাম।

ইতিহাস জানে। ‘পাগলামির’ ঝুঁকি নিলে পাগলদের কী অবস্থা হয়। ফুয়েরার হিটলার থেকে দুচে মুসোলিনি সব ফ্যাসিস্ত শাসকই লুঠতরাজের শাসন জমানা অক্ষুন্ন রাখতে ‘পাগলামির ঝুঁকি’ নিলেও শেষ পর্যন্ত মিলানের রাস্তার ল্যামপোস্টে দুদিন ধরে লটকে ছিল মুসোলিনির লাশ। বাঙ্কারে নিজের মাথায় গুলি মারতে হয়েছিল হিটলারকে।

‘পাগলামির ঝুঁকি’র রেকর্ডকে বার বার পর্যুদস্ত করছে অপরাহত অজেয় লালঝান্ডা। তৃণমূল জমানায় এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন অতীতের সমস্ত হিংসার রেকর্ডকে ম্লান করলেও পতনের ইতিহাস রচিত হচ্ছে নিঃশব্দে।

যাঁদের কান আছে তারা শুনতে পান স্বৈরাচারের দুঃসহ শাসন জমানার বিরুদ্ধে লড়াই করা সেই সব মানুষদের কথা। সুভাষ ঘোষ, রাখি রায়, ভুবন সামন্তদের কথা। যাঁরা আউড়ে যান প্রতি পল অনুপলে ‘নো স্যারেন্ডার, নো স্যারেন্ডার’।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement