মেরে তৃণমূল বানানো যাবে না

সুদীপ্ত বসু

২৯ এপ্রিল, ২০১৮

পানমণি মাঝির মুখোমুখি হয়েছি এই বৈশাখেই।

দাবদাহ? মুহূর্তে উধাও যাবতীয় অস্বস্তি, আর্দ্রতাও। পানমণি মাঝির প্রতিটি উচ্চারণ, চোখের ভাষা, চিবুক বেয়ে নেমে আসা লোনা জলে অবিশ্বাস্য দৃঢ়তার স্বস্তি।

কোলে চার বছরের শিশু কন্যা, প্রিয়াঙ্কা কিসকু। মায়ের কোল-ই ছোট্ট প্রিয়াঙ্কার ভুবন। হয়তো বড় হলে জানতে পারবে, চার বছর বয়সেও তাঁকে ঘরছাড়া হতে হয়েছে ‘উন্নয়নের ঠেলায়’।

গত ১২ই এপ্রিল থেকে ঘরছাড়া চার বছরের প্রিয়াঙ্কা কিসকু। স্কুলে যাওয়া হয়নি এখনও। তবুও একরত্তি শিশুটিকেও ঘরছাড়া করতে হাত কাঁপেনি তৃণমূলের।

পানমণি মাঝির স্বামীর পদবি কিসকু। নিজের মাঝি পদবি রয়ে গেছে, মেয়ের নাম তাই প্রিয়াঙ্কা কিসকু। বলছিলেন সেই গল্পও। পানমণি মাঝির শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের কোনা মুছলেন। বললেন, ‘আমার আর কষ্ট কী, এই গরমে মেয়েটাকে নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে বাইরে বাইরে’।

কাঁকসার ত্রিলোকচন্দ্রপুরের বাসিন্দা তিনি। ত্রিলোকচন্দ্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ১০নম্বর আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন। জীবনে প্রথমবার লালঝান্ডার প্রার্থী। নিদারুণ দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই রোজকার দিনলিপি।

১২ই এপ্রিল থেকে শুরু হয় উন্নয়নের তাণ্ডব। ভাঙাচোরা ছোট্ট একচালার ঘরেও চড়াও হয় তৃণমূলীরা। সি পি আই (এম)-র হয়ে ভোটে দাঁড়ানো যাবে না-হুমকি শুনতে হয়েছে। চার বছরের শিশু কন্যাকেও গুম করে দেওয়ার ভাষা শুনেছেন পানমণি মাঝি। রাত দুপুরে বাড়িতে চড়াও হয়ে রোজকার অত্যাচার আর সহ্য করতে পারেননি।

কোলে ঘুমিয়ে রয়েছে প্রিয়াঙ্কা। অজানা আশ্রয়ে বসে পানমণি মাঝি বলে চলেছেন, ‘ সেদিন ওরা এসে ৭০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল। বললো টাকা নে, ভোটে দাঁড়াতে হবে না। আরো টাকা দেবো, বড়লোক হয়ে যাবি, কিন্তু সি পি এম করা যাবে না’।

প্রত্যুত্তরে পানমণি মাঝি যেন তখন আমাদের সব চেতনার এক অনির্বাণ শিখা। ‘ আমি বললাম তোদের টাকা লাগবে না। আমি গরিব আছি, গরিবই থাকতে চাই। গরিবের পার্টি ছাড়বো না। সি পি এমের হয়ে দাঁড়িয়েছি, সরবো না’। সেই রাতেই চার বছরের প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে ঘরছাড়া হতে হয় কাঁকসার এই আদিবাসী জননীকে।

এখনও ঘরে ফিরতে পারেননি। তবুও প্রত্যয়, ‘গ্রামের লোকজন জানে একরত্তি শিশুকে নিয়ে ঘরছাড়া হতে হয়েছে। স্বামী দিনমজুরি করে, ঘরে পড়ে রয়েছে যাতে দখল না হয়ে যায়। ভোট হলে গরিব মানুষ আমাদেরই ভোট দেবে আমি জানি’।

মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা পেরিয়েছে।

ঘর ছেড়েছেন, ছোট্ট শিশুটির দুধের যোগাড় হয়তো রোজ করতে পারেননি, তবুও ভোটে আছেন।

মলিন শাড়ি, যন্ত্রণা, খিদের তাড়নাতেও চোখের ভাষায় স্পষ্ট উত্তর- ‘না’। প্রত্যাহার নয়।

আলপথ থেকে মোরামের রাস্তা, রাজ্যজুড়ে লড়তে থাকা প্রতিটি চেতনার সোচ্চার প্রতিনিধি হয়ে উঠুক পানমণি।

এই পঞ্চায়েত নির্বাচন সব দিক থেকেই এরাজ্যের বুকে নজিরবিহীন। বেনজির সন্ত্রাস দেখেছি, রক্ত ঝরা মনোনয়ন পর্ব, তীব্র আক্রমণ, নবান্নে দাঁড়িয়ে সেই আক্রমণের অনায়াস বৈধতা দিতেও দেখেছি আমরা।

তবুও ধন্যবাদ রাজ্যের নবম পঞ্চায়েত নির্বাচনকে।

আমাদের চেতনায় পানমণি মাঝিকে ‘উপহার’ দেওয়ার জন্য।



কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার

সবেমাত্র হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন। তাঁর গোটা পরিবার-ই দিন কয়েক হাসপাতালে ছিল। ৭৪ বছরের শ্বশুরের একটি হাত ভেঙেছে। অসুস্থ শাশুড়ির বা পা ভেঙেছে লাঠির বাড়িতে। দুই ভাসুরও ও জা আক্রান্ত হয়েছেন। আর স্বামী? সুভাষ ঘোষ এখনও হাসপাতালে। হাত-পা ভেঙেছে,কপালে টাঙির কোপ।

সাবিত্রী ঘোষের সামনে দাঁড়াতেও যেন দ্বিধা কাজ করছে।

স্রেফ লালঝান্ডার প্রার্থী হয়েছেন সুভাষ ঘোষ, তাই গোটা পরিবারকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। তবুও হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতেই সুভাষ ঘোষের দৃঢ়তা যেন রূপকথাকেও হার মানাবে। সেদিন রাতে টাঙির কোপ পড়েছে কপালে, রক্ত বেরচ্ছে গলগল করে। দুহাত দূরে তৃণমূলী হামলায় বাবা-মা-স্ত্রী পড়ে রয়েছেন। তবুও সশস্ত্র বাহিনীর বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়েও বলেছেন, ‘মরে গেলেও মনোনয়ন তুলবো না’। আর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বলেছেন, সি পি আই (এম) করি। মেরে আমাদের তৃণমূল বানানো যাবে না’।

সুভাষ ঘোষ।নির্মাণ শ্রমিক। মাসে রোজ দিন কাজও জোটে না। সবঙের নওগাঁ-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের হরিপুরা গ্রামের সি পি আই(এম) প্রার্থী। স্রেফ মনোনয়ন প্রত্যাহার করানোর জন্য বর্বরতার যে পথে নেমেছে তৃণমূল তা রাজ্যের গণতান্ত্রিক কাঠামোর পক্ষে এক ভয়াবহ বিপদ হতে চলেছে। গত বুধবার মধ্য রাতে তাঁর ঘরে ঢুকে পাশবিক হামলা চালায় তৃণমূলী বাহিনী। কেউ রেহাই পায়নি, অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা’ থেকে ভাই, কেউ নয়। গোটা পরিবার রক্তাক্ত। ভাইয়ের স্ত্রীকে চুলের মুঠি ধরে রাস্তায় নিয়ে এসেও চলে অত্যাচার।বৃদ্ধ বাবা’ ছেলেকে বাঁচাতে গেলে মেরে তাঁর হাত ভেঙে দেওয়া হয়। সুভাষ ঘোষের মা’কে লাঠি দিয়ে নির্মম ভাবে মারা হয়,মারতে মারতে একটা পা ভেঙে দেওয়া হয় ষাটোর্ধ্ব অসুস্থ প্রৌঢ়ার। একবারের জন্যও হাত কাঁপেনি তৃণমূলী বাহিনীর। জঙ্গলরাজও যেন লজ্জায় মুখ ঢাকবে।

শিউরে উঠেছে গোটা রাজ্য। নির্বিকার শুধু নবান্নের ১৪তলার মালকিন কেননা ‘কিস্যু হয়নি’!

সুভাষ ঘোষের স্ত্রী সাবিত্রী ঘোষও রেহাই পাননি, মারের চোটে সংজ্ঞা হারিয়েছিলেন।

হাসপাতাল থেকে তখন সদ্য ঘরে ফিরেছেন সাবিত্রী। তাঁর মুখোমুখি দাঁড়ালে মুখ্যমন্ত্রী আপশোস করতেন। এত মেরেও লাভ হলো না, পন্ডশ্রম!

‘প্রথমে মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরে আমরাও ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু বুধবার রাতে যা হয়েছে তাতে ভয় কেটে গেছে। আমি নিজেই স্বামীকে বলেছি কোনমতে মনোনয়ন তুলবে না। শেষ দেখে ছাড়বো, ভোটে দাঁড়াবো’ বলছিলেন সুভাষ ঘোষের স্ত্রী সাবিত্রী ঘোষ।

গর্ব হবেনা ‘আমাদের’ জন্য?

শুধুই রক্ত নয়, ইস্পাত দৃঢ় জেদও দেখাচ্ছে ২০১৮’র পঞ্চায়েত ভোট।

এসব নিছকই কী ব্যক্তি রোমাঞ্চ? আলবত নয়। সমষ্টির লড়াই। লড়তে লড়তে বাধার মুখে পড়ে, রক্তাক্ত হওয়া,মাটিতে লুটিয়ে পড়া ফের সেখান থেকে মাথা তুলে লড়াই জারি রাখা।



তবুও কারা লাল নিশানে উসকে তাকে চ্যালেঞ্জ ছোঁড়ে

শুধু এই দুটি ঘটনা নয়, কয়েকশো বামফ্রন্ট প্রার্থী আপাতত ঘরছাড়া। ঘর লুট হয়েছে প্রায় পাঁচশোজনের বেশি সি পি আই(এম) প্রার্থী, প্রস্তাবক, সংগঠকদের। গ্রামে গ্রামে বর্গী হানা। বড় অংশের আসনে প্রার্থী দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। ‘যুদ্ধ’ করে মনোনয়ন জমা দিতে হয়েছে। আরও কঠিন যুদ্ধ করেই মনোনয়ন টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন জমা দিয়ে অজ্ঞাতবাসে যেতে হয়েছে পরিবার নিয়ে যাতে জোর করে প্রত্যাহার না করানো যায়।মনোনয়ন প্রত্যাহারের নামে যা চলেছে তা তালিবানি শাসনকেও লজ্জা দিতে পারে।তৃণমূলী অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেছেন রানিগঞ্জের বল্লভপুর পঞ্চায়েতের মহিলা সি পি আই(এম) প্রার্থী। বারাবনীর এক প্রবীণ সি পি আই(এম) কর্মী মনোনয়ন জমা দিতে ঢুকেছিলেন এস ডি ও অফিসে, সেই অপরাধে বেধড়ক মারধোর করে হাতে ‘আমি তৃণমূল করি’ লিখে দেওয়া হয়েছে। তিনি তবুও সি পি আই(এম)-ই করছেন। প্রার্থী হয়েছেন এই অপরাধে একতলা পাকা বাড়ি ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, থানায় সবে পুলিশ বলছে ‘ মেয়ে বড় হচ্ছে, কিছু হয়ে গেলে কী হবে, প্রত্যাহার করে নিন মনোনয়ন’, তাতেও রাজী করাতে না পেরে গাঁজা-হেরোইন পাচারের কেস! খানাকুল-গোঘাট থেকে পাণ্ডবেশ্বর-অন্ডাল-সবং-সিউড়ি-বোলপুর-ডোমকল-জলঙ্গী বর্বরতা শব্দটিকেও ফিকে করে দেওয়া হয়েছে। শাসক দলের শীর্ষ মহল থেকে একটি বার প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, দুষ্কৃতীবাহিনীর পিঠ চাপড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা- ১০০ শতাংশ আসনে আমরা জিতবো!

বিশ্বাস করুন মুখ্যমন্ত্রী, খাতায় কলমে নির্বাচন কমিশনের পাতায় ১০০ শতাংশ আসন জিতলেও আপনি পানমণি মাঝিদের জিততে পারবে না।

ওটা তোলাবাজি-চিট ফান্ড-রেগা-পঞ্চায়েতের টাকা চুরি, ভাগ বাটোয়ারার দায়বদ্ধতা নয়।

ওটা বারে বারে পুড়িয়ে দিয়েও খতম করতে না পারা ‘লাল পতাকা’র দায়বদ্ধতা।



তবুও জারি আছে লড়াই

সি পি আই(এম) কার্যালয়ে ঢুকে শাড়ি খুলে, ব্লাউজ ছিঁড়ে দিয়ে মারা হচ্ছে মায়ের বয়সী মহিলাদের। ক্যামেরায় লাইভ চলছে। চিত্র সাংবাদিকরাও লজ্জায় ক্যামেরা বন্ধ করেছে, কিন্তু মমতা ব্যানার্জির উন্নয়ন বাহিনীর তাতেও লজ্জা হয়নি। সেই আরামবাগেই তার আগে বিধানসভার প্রাক্তন মুখ্য সচেতকের স্ত্রী, পুত্রবধূকেও প্রকাশ্যে রাস্তায় শাড়ি খুলে পেটানো হয়েছে। ১৪তলায় বসে তিনিও হয়তো টিভিতে দেখেছেন সেই দৃশ্য! মুখ্যমন্ত্রী তবুও মুখ খুলতে পারেননি!

কেননা এই বেপরোয়া নৈরাজ্যের নির্লজ্জ মদতদাতা তিনি-ই।

আর এই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সর্বস্ব বাজি রেখেই হৃদয়ে ‘সাগর দোলার ছন্দ’ তোলা জান কবুল লড়াইয়ে সেই আমরাই।

হ্যাঁ ‘আমরা’ আর ওরা’র ফারাক আছে। ফারাক থাকবে। আমরা গর্বিত আমাদেরই জন্য। ইতিহাস লালিত দীর্ঘ ঐতিহ্যের জন্য।

ভোটের দিন ঘোষণা থেকে আজ পর্যন্ত- নৃশংসতার কোনও দৃশ্যই অধরা নয়।

তবুও সব আসনে ‘বিনা ভোটে’ জিততে পারেনি উন্নয়ন।

তবুও অস্ত্রের মুখে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি সিংহভাগ প্রার্থী।

তবুও যেখানে প্রার্থী রয়েছে লালঝান্ডার সেখানেই কালঘাম ছুটছে শাসক তৃণমূল-বি জে পির।

তবুও টাকা, চাকরির টোপ দিয়ে,বন্দুকের মুখেও ভোটের ময়দান থেকে সাফ করা যাচ্ছে না ‘আমাদের’।

একটি পঞ্চায়েতেও প্রার্থী থাকলে সি পি আই (এম) লড়বে।

একটি জায়গাতেও নিশ্চিন্তে নিরুপদ্রবে ওদের সবুজ আবিরের জয়োল্লাস করতে দেব না আমরা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement