৯৯৭ একরজুড়ে ঝোপ,
ক্ষোভ আর শুধু আক্ষেপ

অনন্ত সাঁতরা

১২ মে, ২০১৮

আরও একটি পঞ্চায়েত নির্বাচন এসে গিয়েছে। সিঙ্গুরের কথা এখন শুধুই বামপন্থীদের মুখে! আর শাসকদল? সিঙ্গুরের কথা মুখেও আনে না তারা।

দশ বছরের মধ্যে পরিস্থিতির কী বিচিত্র পরিবর্তন!

২০০৮-এ পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল। রাজ্যে তখন বেশ উত্তেজনা। সিঙ্গুরকে সেই নির্বাচনে অন্যতম প্রধান অ্যাজেন্ডা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। প্রচার ছিল, বামফ্রন্ট সরকার জমি কেড়ে নিচ্ছে। বামফ্রন্ট আর কৃষকের কথা ভাবে না। বামফ্রন্ট কৃষিকে গুরুত্বই দিচ্ছে না। রাজ্যের খাদ্য সুরক্ষা চুলোয় পাঠিয়ে বামফ্রন্ট জমি দিয়ে দিচ্ছে শিল্পপতিদের।

প্রমাণ? সিঙ্গুর।

সেই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস অনেক পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতিতে জিতেছিল। জেলা পরিষদও জিতেছিল কয়েকটি।

তারপর ২০১৩’র পঞ্চায়েত নির্বাচন। সেবারও সিঙ্গুর একটি বড় বিষয় ছিল। মমতা ব্যানার্জি তখনও আশা জাগিয়ে রেখে ঘোষণা করছিলেন, সিঙ্গুরে আবার চাষ হবে। কৃষক জমি ফেরত পাবেন। তাই সেবারও তৃণমূল কংগ্রেসের মুখে ছিল ‘সিঙ্গুর’।

এবার?

মমতা ব্যানার্জি বলছেন না। হরিপালের বিধায়ক বেচারাম মান্না বলছেন না। সিঙ্গুরের বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যও বলছেন না। তৃণমূল কংগ্রেসের কেউ এবারের নির্বাচনে সিঙ্গুরের কথা বলছেনই না। অথচ সিঙ্গুরের তথাকথিত ‘অনিচ্ছুকদের সমস্যা’-র কোনও সমাধানই হয়নি। বরং সমস্যা আরও প্রসারিত হয়েছে। শিল্পের ধ্বংসাবশেষ সিঙ্গুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সংকটের জন্ম দিয়েছে। যার জবাব তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে নেই।

সাহানাপাড়ার যুবক জানালেন, ‘আমাদের পরিবারের এক বিঘা জমি পড়েছিল প্রকল্পে। সেই জমি স্বেচ্ছায় দিয়ে সিকিউরিটি গার্ডের কাজও করছিলাম। আশা করেছিলাম, কারখানা চালু হলে কাজ স্থায়ী হবে। বেকার জীবনের একটা হিল্লে হবে। না, ভালো কিছু সহ্য হলো না। তারপরেও আশায় ছিলাম। হয়তো কিছু একটা কারখানা হবে। কিন্তু ডিনামাইট দিয়ে যখন ভাঙা শুরু হলো তখন আর ওইদিকের ধারে-কাছে যাইনি। এখন একটি ব্যাগ তৈরির দোকান করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছি।’

গোপালনগর, সিংহেরভেড়ি, বেড়াবেড়ি, বাজেমেলিয়া ও খাসেরভেড়ি— এই পাঁচটি মৌজার ৯৯৭.১১ একর অধিগৃহীত জমি শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়েছে। জমিজুড়ে ছোট-বড় পাথর, ইট, ঢালাইয়ের চাঙড় লোহা ও ছাউনির টুকরো জমিকে কঙ্কালসার করে তুলেছে। বন-জঙ্গলে ভরে গিয়েছে। প্রকল্প এলাকার জমি এবড়ো-খেবড়ো। কোথাও কোথাও মাটির ঢিবি। খাসেরভেড়ি ও জয়মোল্লার কৃষকরা জানালেন, ‘জমির যা চেহারা হয়েছে তাতে চাষবাস আর হবে না। কিছু জমির সীমানায় আল দেওয়া হয়েছিল। সেগুলিও বর্ষার জলে ভেঙে গিয়েছে।’ কিন্তু জমি তো চাষযোগ্য করে দেওয়ার কথা ছিল রাজ্য সরকারের! সুপ্রিম কোর্টেরও নির্দেশ তাই ছিল।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি জমিতে সরষের বীজ ছড়িয়ে প্রতীকী চাষের সূচনা করেছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাজ্য সরকার প্রকল্প এলাকায় চাষের জন্য ৫৬টি মিনি ডিপ টিউবওয়েল বসিয়েছিল। ২০১৭ সালের বোরো মরশুমে সরকারি উদ্যোগে খরচ করে কিছুটা বোরো চাষ করেছিল। তাতে উৎপাদন হয়েছিল অতি সামান্য। এবারে আর বোরো চাষ হয়নি। মিনি ডিপ টিউবওয়েলগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। গোটা মাঠ ধূ ধূ করছে। একটিও চালু নেই

শিল্প নেই। কাজ নেই। চাষ নেই। কৃষকের জমিও নেই। কারণ, সিঙ্গুরের কৃষকদের এখনও জমি চিহ্নিত করে দিতে পারেনি সরকার।

২০১৬ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর সিঙ্গুর উৎসব করে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, জমি চাষযোগ্য করে তুলতে প্রতিটি জমির মালিক পরিবারকে ১০হাজার টাকা দেওয়া হবে এবং যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দেওয়া হবে আরও ২০হাজার টাকা করে। কিন্তু কোনও কৃষক পরিবারই তা পায়নি। বলা হয়েছিল, কৃষিঋণ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও। সে সব কিছু মেলেনি, কৃষকরাই জানালেন। শুধুমাত্র অনিচ্ছুক কৃষকদের মাসে দুহাজার টাকা ও ১৬ কেজি চাল দেওয়া চলছে। গত ৪ঠা জানুয়ারি হুগলি জেলা কৃষক সমিতি ও জেলা খেতমজুর ইউনিয়ন যৌথভাবে ডেপুটেশন ও অবস্থান-বিক্ষোভ কর্মসূচি করে। অবিলম্বে জমি চাষযোগ্য করে কৃষকদের হাতে দেওয়াসহ ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক সকল কৃষককে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার দাবি জানিয়ে ডেপুটেশন দেওয়া হয় বি ডি ও-র কাছে। কিন্তু সেই দাবি আজও কার্যকর হয়নি। ফলে অনিচ্ছুক কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

সিঙ্গুরে না হলো শিল্প, না হলো কৃষি। সিঙ্গুরের জমি ‌আন্দোলনের তথাকথিত দুই নেতা বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ও বেচারাম মান্না এখন দুই মেরুতে। পঞ্চায়েত ভোটে মনোনয়ন জমা দিতে দুই পক্ষ যুযুধান। সিঙ্গুরে তাঁদের একে অপরের বিরুদ্ধে গোঁজ প্রার্থী দাঁড়িয়েছে। দুএকটি পঞ্চায়েত ছাড়া সর্বত্রই একই চিত্র। শুধু কী তাই ! এই সময়ে পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতিতে যে বিপুল লুট হয়েছে তা তাদেরই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী জনগণের কাছে তুলে ধরছে।

কীভাবে লুট হয়েছে ? ঢালাই রাস্তা তিন ইঞ্চি হওয়ার কথা, হয়েছে মাত্র দুইঞ্চি বা তারও কিছুটা কম। জবকার্ডে কাজ না করেও টাকা উঠেছে, তার কমিশন গিয়েছে সুপারভাইজার ও সদস্যদের পকেটে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার গৃহনির্মাণ প্রকল্পের কাটমানি। প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, তার থেকে কমিশন। সব মিলিয়েই উন্নয়নের কাজে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ টাকার বড় অংশ পঞ্চায়েত কর্মকর্তারা কীভাবে, কতটা আত্মসাৎ করেছেন তা তৃণমূলেরই বিক্ষুদ্ধ গোষ্ঠীর লোকজনরা ভোটারদের কাছে তুলে ধরে পরিবর্তন চাইছেন।

এদিকে লুটের পঞ্চায়েত রুখতে, মানুষের পঞ্চায়েত গড়তে সাধারণ মানুষ জোট বেঁধেছেন। তৃণমূলের পঞ্চায়েতে সীমাহীন দুর্নীতি ও কাটমানির কথা মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। পাশাপাশি বিরোধী গ্রাম পঞ্চায়েত ও সদস্যদের প্রতি বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষ সরব। সিঙ্গুরে মোট ১৬টি গ্রাম পঞ্চায়েত। সিঙ্গুর পঞ্চায়েত সমিতির আসন সংখ্যা ৪৭। বামফ্রন্ট সবকটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। তৃণমূলের পাশাপাশি তাদের বিক্ষুব্ধরাও প্রার্থী দিয়েছে। তাপসী মালিকের বাবা তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী মনোরঞ্জন মালিক সারদায় টাকা রেখে ঠকেছেন। টাকা ফেরত পাননি। এবার তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, তাপসীর মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তারা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী। তিনি প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু করা হয়নি। তাই তিনি ‘গোঁজ’।

সিঙ্গুরে গাড়ির কারখানা হয়নি। কী আশ্চর্য! তাপসী মালিকের বাবার প্রতীক সেই গাড়িই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement