আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়
এবং জিন্নাহ বিতর্ক

সেখ সাইদুল হক

১৩ মে, ২০১৮

১৯৩৮ সালে জিন্নাহকে আজীবন সদস্য সম্মান জানানো হয়। তারপর দেশ স্বাধীন হয়েছে। নেহরু, শাস্ত্রী, ইন্দিরাসহ অন্যান্যদের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি বাজপেয়ীর সরকারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু কখনও জিন্নাহ-র ছবি সরানোর দাবি উঠেনি। এখন মোদী সরকারের জমানায় পরিকল্পিতভাবেই এই দাবি তোলানো হচ্ছে।

========================================

উত্তর প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ এবং ‘বি জে পি’-র ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের কয়েকশত সমর্থক গত ২রা মে বুধবার আলিগড় মুসলিম বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে জোর করে প্রবেশ করে ছাত্র সংসদের ঘরে টাঙানো মহম্মদ আলি জিন্নাহ-র ছবি নামাতে যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ছাত্ররা বাধা দিলে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ এসে লাঠিচার্জ করে। কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু যোগীজীর পুলিশ মামলা না দিয়েই তাদের ছেড়ে দেয়। ওইদিন বিকালেই ‘আমু’র সহস্রাধিক ছাত্রছাত্রী মিছিল করে দোষীদের শাস্তির দাবিতে জেলাশাসকের অফিসের দিকে রওনা হলে পুলিশ বাধা দেয়। লাঠিচার্জ করে। ২৮জন ছাত্র আহত হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার পাঁচ হাজার পড়ুয়া বিচারবিভাগীয় তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে ধরনায় বসে। যোগ দেয় প্রাক্তনীরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংস্থা আমুটা (AMUTA) ও শিক্ষাকর্মীদের সংগঠনও ছাত্রছাত্রীদের দাবিকে সমর্থন করে। আমুর পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও জামিয়ামিলিয়ার পড়ুয়ারা। গত শুক্রবার থেকে গোটা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে আন্দোলনকারীদের দমানো যায়নি। তাঁরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে। ছয়দিন ক্লাস বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষক সংগঠন আমুটা রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হয়েছে উপযুক্ত তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে। এই ঘটনা নিয়ে গোটা দেশ উত্তাল হয়েছে। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, সি পি আই (এম)-সহ বামপন্থী দলগুলি ও জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস সঙ্ঘ পরিবারের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। অপরদিকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ও উপমুখ্যমন্ত্রী কেশরীপ্রসাদ মৌর্য বলেছেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানের স্রষ্টা ও দেশ ভাগের নায়ক জিন্নাহ-র ছবি রাখা জাতীয় লজ্জা। ওই ছবি সরিয়ে নেওয়া উচিত। তারা জিন্নাহকে ভারতের শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন।

নেপথ্যে আনসারিকে আটকানো :

আলিগড় মুসিলম বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি ১৯৩৮ সাল থেকে ৮০ বছর ধরে আছে। এনিয়ে অতীতে সমস্যা হয়নি। তাহলে কেন ওই দিনটিকেই বাছা হলো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত করেছে যে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি তথা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব শিক্ষক ও উপাচার্য হামিদ আনসারিকে ২রা মে সাম্মানিকভাবে ছাত্র সংসদের আজীবন সদস্যপদ দেওয়া হবে। আমরা সবাই হামিদ আনসারি সম্পর্কে বি জে পি বা সঙ্ঘ পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি জানি। হামিদ আনসারি কেবল একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদই নন একজন বড়মাপের কূটনীতিবিদও। তিনি রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসাবে শেষ ভাষণে বি জে পি-র শাসনকালে সারা দেশে সংখ্যালঘু নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আর এতেই বি জে পি-র গোঁসা। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করলেন। আনসারির উত্তরাধিকারী বর্তমান উপরাষ্ট্রপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু আনসারির বিরুদ্ধে দেশকে অপমান করার প্রকাশ্যে অভিযোগ তুললেন এবং আরবীয়ত্বের উৎস খুঁজে তাঁর ভারতীয়ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। এহেন ব্যক্তিকে কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাম্মানিক আজীবন সদস্যপদ দেওয়া হবে? তাই আটকাতে হবে। অতএব পরিকল্পনা করেই সোমবার আলিগড়ের লোকসভার সদস্য বি জে পি দলের সতীশ গৌতম আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. তারিক মনসুরকে চিঠি দিয়ে অভিযোগ জানালো কেন ভারতের শত্রু জিন্নাহ-র ছবি ছাত্র সংসদের অফিসে থাকবে এবং ওই ছবি নামিয়ে দেবার জন্য কার্যত হুমকি দিল। অর্থাৎ পরিকল্পনা করেই সঙ্ঘ পরিবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করল। ২রা মে অনুষ্ঠান শুরুর আধঘণ্টা আগেই যখন প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি এসে গিয়েছিলেন তখন হঠাৎ দলবল নিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকে পড়েন আলিগড়ের বি জে পি সাংসদ সতীশ গৌতম। সঙ্গে হিন্দু যুববাহিনী এবং এ বি ভি পি-র লোকজন। কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলেও জানা গেছে। তারা প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি যেখানে রয়েছেন সেখান হতে মেরেকেটে ৫০ মিটার দূরে জিন্নাহ-র কুশপুতুল পোড়ায় এবং স্লোগান দেয় ‘এ এম ইউ গদ্দার হ্যায়’। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা প্রতিবাদ করলে তাদের উপরও হামলা চালানো হয়। পুলিশ ৬ জন হামলাকারীকে তখনকার মতো ধরে নিয়ে গিলেও কোনও এফ আই আর না করে ছেড়ে দেয়। ঘটনার জেরে হামিদ আনসারির অনুষ্ঠান বাতিল করে দিতে হয়। আসলে সঙ্ঘ বাহিনীর মদতপুষ্ট লোকেরা এটা করতে এসেছিল। পাশাপাশি হিন্দু যুববাহিনী অস্তিত্বকে প্রমাণ করা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তাঁর দীর্ঘদিনের মজুত লোকসভার আসন গোরক্ষপুরে বি জে পি প্রার্থী পরাজিত হয়েছে। তাঁর তৈরি ওই যুববাহিনীর কাজকর্ম নিয়ে বি জে পি অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠেছে। উপমুখ্যমন্ত্রী মৌর্যের ফুলপুরের আসনেও বি জে পি হেরেছে। তাই সঙ্ঘ পরিবারের মদত পেতে এটা করা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।

আমু এবং জিন্নাহ ছবি বিতর্ক :

লর্ড মেয়োর আমলে ১৮৭১ সালে হান্টার সাহেব “Our Indian Musalmans” শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যেখানে মুসলিম জনগণের পশ্চাৎপদতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ প্রশাসক এলমিন স্টোন নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেবার কথা বলেন। সেই পথ ধরেই অবিভক্ত বাংলায় সৈয়দ নবাব আলি চৌধুরির প্রচেষ্টায় Muslim Education Society গড়ে উঠে। স্যার সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে আলিগড় আন্দোলন গড়ে উঠে। ১৮৭৫ সালে মুসলিমদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে সৈয়দ আহমেদ আলিগড়ে ‘মহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ’ গড়ে তোলেন। যদিও ১৮৬৭ সাল হতেই তিনি উদ্যোগ নেন। এটি ১৯২০ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এটিকে ওই বিশ্ববিদ্যালয় করার পিছনে যারা ভূমিকা গ্রহণ করে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মহম্মদ আলি জিন্নাহ। তিনি অর্থ সাহায্যও করেন। মুসলিম লিগের প্রথম সারির নেতা হিসাবে তিনি তখনও পর্যন্ত মুসলিম লিগ দ্বিজাতি তত্ত্ব দাবি তোলেনি। প্রসঙ্গত, ১৯৪০ সালে মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে জিন্নাহ দ্বিজাতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এর আগে ১৯৩০ সালে ইকবাল মুসলিম লিগের এলাহাবাদ সম্মেলনে একটি পৃথক মুসলিম ভারতের দাবি জানিয়েছিলেন। যা হোক ১৯২০ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত হলো। জিন্নাহ-কে অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ডোনার হিসাবে মান্যতা দেওয়া হলো। সেই সময় আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে মুসলিম শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একটি মঞ্চ গড়ে উঠে। তারা মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনে সদার্থকভাবে সাড়া দেয় এবং নিজেদেরকে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত করে। যে আজীবন সদস্য সম্মানের বিষয়ে এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তা ১৯২০ সালে প্রথম দেওয়া হয় মহাত্মা গান্ধীকে। পরবর্তীতে আম্বেদকর, চন্দ্রশেখর আজাদ, জওহরলাল নেহরু, সি ভি রমন, পরবর্তীতে জয়প্রকাশ নারায়ণকেও দেওয়া হয়।

১৯৩৮ সালে জিন্নাহকে আজীবন সদস্য সম্মান জানানো হয়। তারপর দেশ স্বাধীন হয়েছে। নেহরু, শাস্ত্রী, ইন্দিরাসহ অন্যান্যদের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি বাজপেয়ীর সরকারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু কখনও জিন্নাহ-র ছবি সরানোর দাবি উঠেনি। এখন মোদী সরকারের জমানায় পরিকল্পিতভাবেই এই দাবি তোলানো হচ্ছে। মহারাষ্ট্র বিধানসভার বি জে পি সদস্য মঙ্গল প্রভাত লোধী দাবি তুলেছেন বোম্বাইয়ে জিন্নাহ হাউস ভেঙে ফেলা হোক। এ বিষয়ে আরও আলোকপাত করার আগে দেখে নেব আদবানি এবং বি জে পি সরকারের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিং জিন্নাহ সম্পর্কে কি বলেছেন।

আদবানি ও যশবন্ত সিংয়ের মূল্যায়ন :

এল কে আদবানি বি জে পি-র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ১৯২৭ সালে তাঁর জন্ম করাচিতে। ২০০৫ সালে তিনি করাচি যান এবং জিন্নাহ মুসোলিয়ামের রেকর্ড বুকে মন্তব্য লেখেন যে জিন্নাহ হলেন এমন একটি ব্যক্তিত্ব যা ইতিহাস তৈরি করেছে। ১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট পাকিস্তানের কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বেলিতে জিন্নাহ বক্তৃতাকে ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি রেকর্ড বুকে লেখেন যে জিন্নাহ ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব। তিনি সব ধর্মের প্রতি সমানাচরণের পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি ছিলেন মহান ব্যক্তিত্ব। সঙ্ঘ পরিবার তাঁর এই বক্তব্যকে অনুমোদন না করে প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করে। কিন্তু আদবানি তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন। উলটে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী বিরোধিতা করে, কিন্তু আদবানি তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন। উলটে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী সরোজিনী নাইডুকে উদ্ধৃতি করে বলেন জিন্নাহ ছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত।

অপর বি জে পি নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশবন্ত সিং ২০০৯ সালে জিন্নাহ সম্পর্কে তাঁর পুস্তকগ্রন্থে জিন্নাহ-র ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁকে একজন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ বলে ব্যাখ্যা করেন। এতে রুষ্ট হয়ে সঙ্ঘের নির্দেশে বি জে পি তাকে দল থেকে বহিষ্কৃত করে। পরে আদবানির প্রচেষ্টায় তিনি সদস্যপদ ফিরে পান। কিন্তু বক্তব্য তুলে নেননি। সম্প্রতি ঘটনাতে আলিগড়ের বি জে পি সাংসদ সতীশ গৌতম যখন তাঁকে ভারত শত্রু বলে ছবি নামাতে যান তখন আর একজন বি জে ‍‌পি নেতা এবং বর্তমান যোগী সরকারের মন্ত্রী স্বামী প্রসাদ মৌর্য স্বাধীনতা সংগ্রামে জিন্নাহর অবদানকে স্মরণ করার কথা বলেন। দেশ বিভাজন ও পাকিস্তান তৈরিতে জিন্নাহ ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু ১৯৪০ সালের পূর্ববর্তী পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকাকে অস্বীকার করে তাকে জাতীয় শত্রু বানানো ঠিক নয়। সেই অর্থে বলতে গেলে গান্ধীকে কি পাকিস্তানের মুসলিম লিগ পাকিস্তানের জাতীয় শত্রু বলবে? তা বলেনি। পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সন্ত্রাস বা অন্য বিষয়ে আমাদের তিক্ততা বেড়েছে। কাশ্মীরকে ঘিরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতবিরোধী জিগিরও তোলা হয়েছে। অথচ পাকিস্তান সরকার তক্ষশীলার বৌদ্ধ চর্চা কেন্দ্রকে সযত্নে রক্ষা করছে। ভারতীয় সংসদের পক্ষ হতে পাকিস্তানে শুভেচ্ছা সফরে গিয়ে আমি সেটা দেখে এসেছি। বি জে পি দলের চিন্তাবিদ এবং উত্তরাখণ্ড হতে রাজ্যসভার সদস্য তরুণ বিজয়ও ওই দলে ছিল। তিনি পাকিস্তান সরকারের এই প্রচেষ্টার প্রশংসা করে নোটবুকে মন্তব্য করেন। সুতরাং কারও মূল্যায়নে তাঁর ইতিবাচক নেতিবাচক সবদিক বিবেচনায় রাখতে হবে।

মোদী জমানায় :

আসলে মোদী জমানায় ইতিহাসের চরিত্রের মূল্যায়নে সঙ্ঘ পরিবার একপেশে সাম্প্রদায়িক মূল্যায়ন করে চলেছে। টিপু সুলতান এবং ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে সেই মূল্যায়নের কথা আমরা জানি। ঔরঙ্গজেবের নামের রাস্তার নাম পালটানো হচ্ছে। বাবরি মসজিদকে রামমন্দির বানানোর উদ্যোগ আগেই শুরু হয়েছে। এখন তাজমহলকে শিবমন্দির করার উদ্যোগ নিয়ে তেজোমহল নামও দেওয়া হচ্ছে। কুতুব মিনারকে সমুদ্র গুপ্তের স্তম্ভ বলা হচ্ছে। মোগলসরাই স্টেশনকে দীন দয়াল উপাধ্যায় স্টেশন বানান হয়েছে। এখন যে সাভারকারকে নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে তিনি ব্রিটিশদের কাছে মুচলেকা দিয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদকে জাতীয় নায়ক করার জন্য মোদী সরকার ও সঙ্ঘ পরিবার উঠে পড়ে লেগেছে। অথচ আমরা জানি ভারত ছাড় আন্দোলনে তাঁর কি ভূমিকা ছিল। যে জিন্নাহকে নি‍‌য়ে বিতর্ক তাঁর সাথে তিনি ১৯৪২ সালে গোপন বৈঠক করে যুক্তফ্রন্ট গড়ার চেষ্টা করেন। জিন্নাহ-র মুসলিম লিগ দলের সঙ্গে সাভারকার শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা বাংলা ও সিন্ধে জোট সরকার গড়েছিল। যখন মুসলিম লিগ পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে তখন হিন্দু মহাসভা তাদের জোটসঙ্গী ছিল। এখনও সংসদে জিন্নাহ-র সাথে শ্যামাপ্রসাদের ছবি শোভা পাচ্ছে।

আসলে জিন্নাহ একটি বাহানা। কর্পোরেটপ্রেমী মোদী সরকার এখন সাম্প্রদায়িকতার পথে দেশে বিভেদ বিভাজনের রাজনীতি করছে এবং মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করে উগ্রজাত্যভিমান গড়ে তুলতে চাইছে ও তাঁর কর্পোরেট সেবাকে আড়াল করতে চাইছে। আমাদের রাজ্যেও বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক অবস্থান সঙ্ঘ পরিবারের ঘৃণ্য রাজনীতির বাতাবরণ তৈরি করে দিচ্ছে। রাজ্যেও বিভাজন বাড়ছে। তাই সাম্প্রদায়িক কর্পোরেটর রাজনীতির এবং প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে পথে নামতে হবে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement