জারোয়াদের তির

সুপ্রিয় ব্যানার্জি

১৩ মে, ২০১৮

সবুজ দ্বীপ আর নীল সমুদ্রের হাতছানিতেই আন্দামানে যাওয়া। সেলুলার জেল এবং জাড়োয়া দেখার খিদে থাকে। তবে সেখানে গেলে চোখের সুখ এবং মনের চাহিদা মিটেয়ে দেয় নীল জলে ঘেরা ঘন অরণ্যের ডাঙাগুলি। স্বচ্ছ নীল জলে আতস কাচের নৌকায় বসে জীবন্ত কোরালের দোল খাওয়া। হাজার বাহারের রঙিন মাছের ছুটে বেড়ানো দেখতে পাওয়ার অনাবিল আনন্দ আছে আন্দামানের বেশ কিছু দ্বীপে।

পোর্টব্লেয়ারের পাম গ্রোভ ইকো রিসর্ট হোটেলে নোঙর করে আন্দামানের কয়েকটি দ্বীপ ঘোরার কথা। এই হোটেলের রান্নাঘরটি দারুণ। ইডলি, ধোসা থেকে শুরু করে বাঙালি রান্না। সব গরম। উত্তর ও দক্ষিণ আন্দামানের কয়েকটি দ্বীপে আমাদের যাবার কথা। তার সঙ্গে রয়েছে পোর্টব্লেয়ার শহরটা দেখা এবং সেলুলার জেলে একবেলা কাটানো। বিমানবন্দরের নাম থেকে শুরু করে সেলুলার জেল গেরুয়াকরণের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। পোর্টব্লেয়ার থেকে উত্তর আন্দামানের দিঘলিপুর। বারো ঘণ্টার পথ। জিরকাটাঙ থেকে মিডিল স্টেট ৪৭ কিলোমিটার রাস্তা। উতরাই চড়াইয়ের পথ। দুধারে ঘন জঙ্গল। অচেনা সব গগনচুম্বী গাছ। এই জঙ্গলেই আদিবাসী জাড়োয়াদের গড়। আমাদের গাড়ির চালকও একজন আদিবাসী। ওর পদবি এক্কা। সে জানালো আমি গাড়ি আস্তে করে দেবো যখন তখনই ভাববেন ওদের দেখা মিলবে। কিন্তু খবরদার ছবি তুলবেন না। কিছু খাবার দেবেন না। যাওয়ার পথে আমরা তিনজনের একটি কিশোরী দলকে দেখেছিলাম। সবাইয়ের গায়ের রঙ আবলুস কাঠের মতো। বেগুনি রঙের কাপড় দিয়ে শরীরের আগাপাছতলা জড়ানো। এক্কা বেশিক্ষণ দাঁড়ায়নি। গাড়ি চালিয়ে দিল। বলল ফেরার পথে ওদের দেখাবো। ভেসেলে গাড়ি তুলে সমুদ্র খাড়ি পেরিয়ে আমরা বারাটাঙ দ্বীপে পৌঁছালাম। এখানেই লাইম স্টোন কেভ বা চুনা পাথরের গুহা দেখতে যাবার জন্য স্পিড বোটে আধ ঘণ্টার জলপথ। নীল সমুদ্রের পাড় ঘেঁসে মানগ্রোভের সবুজ আচ্ছাদন। সে এক দারুণ দৃশ্য। অনেকটা আমাদের সুন্দরবনের মতো। তবে এখানে দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশি আর সুন্দরবনে খাঁড়ি। চুনা পাথরের গুহার অন্ধকারে আমাদের গাইড দেখালেন বিভিন্ন আকৃতির মূর্তি। সে বলল এই গুহা আরও সুন্দর ছিল সুনামিতে নষ্ট হয়ে গেছে। বারাটাঙ থেকে এক্কাকে সঙ্গী করে আমরা চললাম রঙ্গতে। সেখানে রাত কাটিয়ে সকালে দিঘলিপুর। গান্ধীনগর জেটি থেকে স্পিডবোটে রওনা স্মিথ আর রোজ দ্বীপে। স্পিড বোট থেকে স্মিথ আর রোজ-কে জলের মাঝে দুটো সবুজ বিন্দু মনে হয়। দেখা যায় মোটা কাছি দিয়ে এই দুটি বিন্দুকে বেঁধে রাখা হয়েছে। স্মিথের কাছাকাছি যেতেই বোঝা যাবে ওই কাছি আসলে সাদা বালির বিচ। এই চিক্কন বিচ স্মিথ আর রোজকে জুড়ে দিয়েছে। বিচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মরা কোরাল। দুদিকে ঢেউ তোলা সমুদ্র তার মাঝে এই দুই দ্বীপকে মনে হবে প্রকৃতিও এমনভাবেও নিজেকে সুন্দরী হিসাবে হাজির করতে পারে। দুই সুন্দরী হাত ধরাধরি করে অন্যদের হাতছানি দিচ্ছে। সেখানে ঘণ্টা তিনেক থাকা যথেষ্ট।

দিঘলিপুরে আলাপ হলো শিয়ালদহ বৈঠকখানা বাজারের এক পরিবারের সঙ্গে। তারাই সেখানে হোটেল করেছে। শুধু খাওয়া। দাদা, বৌদি বললেন কলকাতা থেকে চলে এসেছি। হোটেলের নাম ‘পরিবার’। বড় পার্শে মাছের সরষে ঝাল। আর বাঙালি রান্না। সত্যি বলতে কী তখন থেকেই আবার কলকাতার কথা মনে পড়তে শুরু করল। আন্দামানে যেখানে গেছি সেখানেই দেখা মিলেছে বাঙালি। জানতাম সেই বিধান রায় আন্দামনে কাদের পাঠানোর জন্য সওয়াল করেছিলেন। সেখানে গিয়ে বুঝলাম আন্দামান নিকোবর ভারতের মধ্য আর একটা ভারত। দুই বাঙলার মানুষ যেমন আছেন, তেমনভাবে ভারতের সব প্রদেশের মানুষ রয়েছেন। তবে বাঙালি বেশি। চাষবাস তেমন নেই। যেটুকু ঘুরেছি খুব অল্প ধানের জমি রয়েছে। সবজির বাগান আছে।তবে সুপারি আর নারকেলই এখানকার মূল ব্যবসা। সবজি বাজারে ঢুকে ছিলাম, ফুলকপি, বাঁধাকপি ১৭০ টাকা কিলো। মুলো এবং অন্যান্য সবজি ১০০ টাকা। আলু ৫০ টাকা। মুরগি ২৫০ টাকা। মটন ১২০০টাকা। পান, জর্দা, সিগারেট নিষিদ্ধ। তবে পাওয়া যায়। একটা জর্দা পান কোথাও ৫০ টাকা কোথাও ৭০ টাকা। আন্দামানের ডাবের কদর করতেই হবে। নিটোল সবুজ পাঁচ নম্বর ফুটবলের সাইজের ডাব। দাম ৩০ টাকা। তিনটে কিনে তার জল ছজনে পান করতে দম লাগবে। আন্দামানে টুনা মাছ আর কাঁকড়া কিন্তু খেতে হবে।

যাই হোক দিঘলিপুর থেকে ফেরার পথে আমাদের চালক এক্কার পরিকল্পনায় ওই জঙ্গলের মধ্যে একদল জাড়োয়ার মুখোমুখি পড়েছিলাম। এবার এক্কা বলল খাবার দাবার থাকলে দিয়ে দিন। ওরা দেখলাম পরিষ্কার ‘পান’ চাইছে। আমার কাছে দুটো পান ছিল, আর আমাদের কাছে একব্যাগ বিভিন্ন ধরনের শুকনো খাবার ছিল। সবটাই ওদের দিয়েদিলাম। তির ধনুক, বল্লম হাতে ওরা প্রায় নাচতে শুরু করল। তবে ওদের চেখের ভাষা ছিল বন্য। সাহস করে একজনের কাছ থেকে ইসারায় তির চাইলাম। ও-মা দিয়ে দিল। তিনটে তির হাতে পেয়ে জাড়োয়া দেখা সার্থক হলো।

পোর্টব্লেয়ারে ফিরলাম, এখানে রয়েছে শান্ত ওন্ডুর বিচ। দেখে শান্ত মনে হলেও মধ্যমগ্রামের একটি ছেলে এখানে চাকরি সূত্রে রয়েছে। সে বলল এখানে কুমিরের উপদ্রব মারাত্মক। নভেম্বর মাসে কুমিরে টেনে নিয়ে গেছে এখানকার এক শ্রমিককে। এখন আর কাউকে জলে নামতে দেওয়া হয় না। ডিসেম্বর মাসে ৭টা বড় কুমির ধরেছে বনদপ্তর। সেখান থেকে ফেরার পথে ছোট্ট একটি বন্দরে দেখলাম টন টন সামুদ্রিক মাছ। আন্দামানের মৎস্যজীবীদের বড় রোজগারের জায়গা এই ওন্ডুর বন্দর। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে বড় ভিসেলে রওনা ভাইপার দ্বীপ। ইংরেজরা এই দ্বীপেই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাজা দেবার জন্য জেল আর ফাঁসির মঞ্চ বানিয়েছিল। তার ধ্বংসাবশেষ এখনও ভারত সরকার রক্ষা করে রেখেছে। সেখান থেকে নর্থ দ্বীপ। এখানে আতশ কাচের নৌকায় চেপে সমুদ্রের নিচে জীবন্ত কোরালের দোল খাওয়া দেখা। অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে বেঁধে সমুদ্র সম্পদ দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। পোর্টব্লেয়ার থেকে আন্দামানের দক্ষিণে ছোট জাহাজে যেতে হয় হ্যাভলক এবং নাইল দ্বীপে। উথাল পাথাল সমুদ্রের ওপর দিয়ে ঘণ্টাদেড়েকে জলপথ। হ্যাভলকে পা দিয়ে যে হোটেলে ঢুকলাম তার মালিক প্রশান্ত গুছাইত। বাড়ি হুগলী জেলার বাহিরখণ্ড। এখন পরিবার নিয়ে পাকাপাকিভাবে ওখানেই থাকেন। হুগলী জেলার আন্তরিক আপ্যায়ন নিয়ে রাধানগর বিচে গিয়েছিলেম। যতদূর চোখ যায় ততদূর সাদা বালির ওপর আছড়ে পড়ছে জলরাশির সফেদ ফেনা। বিদেশিরা দেখলাম এখানেই বেশি ভিড় করেছে। জানলাম রাধানগর বিচে সারা বছরই মানুষের ভিড় থাকে। হ্যাভলকে রাত কাটিয়ে সেখান থেকে মিনিট চল্লিশের জলপথে নাইল দ্বীপ। জনপদ বিরাট, এমনটা নয়। সবটাই পর্যটক নির্ভর। নাইলে সিলিকন বিচ নামে পরিচিত লক্ষ্মণপুর (২)বিচে গিয়ে মনে হলো শূন্য বলে কিছু নেই। নীলাকাশ আরও ঘন নীল জল একটা গোলক তৈরি করেছে। টেবিলের ওপর রাখা স্বচ্ছ কাচের পেপার ওয়েটকে খুব বড় ভাবলে যেমন হয় সিলিকন বিচটা ঠিক তাই। মৃত, জীবিত কোরালের বিভিন্ন আকৃতির খোলসকে একবার ঠেলে বালিতে তুলে দিচ্ছে নীলজল আবার আলতো করে স্নেহভরে তাদের জলে টেনে নিচ্ছে। মৃত কোরাল দিয়েই বিভিন্ন আকৃতি তৈরি হয়েছে। কোনটা দেখলে মনে হবে নীল জলে ভাল্লুক খেলছে। কোনটাকে দেখলে মনে হবে হাতি বিশ্রাম নিচ্ছে। দিগন্ত রেখাজুড়ে সবুজ ঘন, গা ছমছম করা জঙ্গল ঘিরে রেখেছে এই বালুকাবেলাকে। কেরলের কোবালমকে নিশ্চয়ই পিছনে ফেলে দেবে সিলিকন বিচ। এখানেই রয়েছে আন্দামানের পরিচয় বহনকারী সেই বিরাট আর্চ। যা রাজমিস্ত্রিরা তৈরি করেনি। তার একটা দিক সমুদ্রের জলে আর একটা দিক মাটিতে। ওখানকার মানুষ এই বিরাট আর্চ-কে হাওড়া ব্রিজ বলে। নাইলে রয়েছে আরও মনোরম তিনটি বিচ লক্ষ্মণপুর, ভরতপুর, সীতা বিচ। ডিসেম্বর মাসে আন্দামানের সমুদ্র বিচে সূর্য মাথায় ভেঙে পড়া রোদ। রাতে খুব হালকা ঠান্ডা। এসবের মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের ভাসমান জমিগুলোতে গেলে মনে হবে প্রকৃতির সম্ভার নিয়ে আরও অনেক কিছু যা দেখা হলো না। তবে সেখানে গিয়ে গোটা বাঙলার বিভিন্ন জেলার মানুষের জীবন দেখাও একটা বড় পাওয়া।

Featured Posts

Advertisement