প্রসূতি মায়ের যত্নের প্রয়োজন,
ধারণাই নেই পরিবারের

শ্রাবণী মিত্র মজুমদার

২০ মে, ২০১৮

‘‘ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই-জানি আমি ভাবী বনস্পতি’’-এই ভাবী বনস্পতিকে সুস্থ সবল দেখতে চাইলে সে যে আঁধারে তিল তিল করে বেড়ে উঠছে, অর্থাৎ তার মাকে সুস্থ থাকতে হবে এবং সুস্থ রাখতে হবে। কারণ একজন সুস্থ মা-ই একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে সক্ষম। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ্‌ সমীক্ষা (২০১৫-২০১৬)-য় দেখা যাচ্ছে, প্রতি সাতজনে একজনের বেশি মহিলা সন্তান জন্মের পূর্ববর্তী পর্যায়ে যে যত্ন পাওয়া উচিত তা পাচ্ছে না, কারণ তার পরিবার বা তার স্বামী, প্রসূতি মায়ের যত্ন যে কতটা প্রয়োজন সেই সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণাই নেই, তারা এটা প্রয়োজনের তালিকায় রাখতে নারাজ।

এই সমীক্ষা করা হয় চেন্নাইয়ের উপর। তাই এন এফ এইচ এস-৪ এ যে বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে তা হলো—সন্তান জন্মের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পর্যায়ে মহিলাদের স্বাস্থ্যের অধিকার সম্পর্কে পরিবারের পুরুষদের সজাগ করা, কারণ আমরা সবাই জানি একজন সুস্থ মা-ই পারেন একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে।

সন্তান জন্মের পূর্ববর্তী (এ এন সি) যত্ন সম্পর্কে অনেকেরই কোনও ধারণা নেই। এ এন সি -কে একটা টিম বা দল ধরা যেতে পারে, যেখানে একজন ডাক্তার, নার্স এবং আরও অনেক দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন, যারা প্রসূতি মায়ের সন্তান জন্মের আগে কোনও শারীরিক জটিলতা আছে কিনা তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেন। যেমন সুগার, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তাল্পতা, থাইরয়েড, এইচ আই ভি ইত্যাদি। এই সময় মহিলাদের ফলিক অ্যাসিড ও আয়রন ট্যাবলেট দেওয়া হয়। প্রসূতি মায়েদের কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত, কীভাবে যত্ন নেওয়া উচিত এবং কোনও রোগ থাকলে কী ধরনের মেডিসিন নেওয়া উচিত সেই ব্যাপারে এই টিম পরামর্শ দেয়। প্রতিটি প্রসূতি মহিলার প্রথম থেকেই অন্তত চারবার এই পরামর্শ নেওয়া উচিত, জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।

এন এফ এইচ এস-৪ -এর সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে গ্রামীণ অঞ্চলে মাত্র ১৬.৭% প্রসূতি মহিলা সন্তান জন্মের পূর্ববর্তী যত্ন পান, তাঁরা একটি টিটেনাস, আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ইত্যাদি পান। তবে শহরকেন্দ্রিক অঞ্চলে এই সংখ্যাটা অনেক বেশি (৩১.১%)। গ্রামীণ অঞ্চলে এবং শহরকেন্দ্রিক অঞ্চলে এমন বহু পরিবার আছে যেখানে পুরুষের কথাই শেষ কথা, এই প্রভাব পড়ে মহিলাদের উপর, প্রসূতি মহিলারা তাদের নিজেদের শরীরের ভালো-মন্দের বিচার করতে পারলেও, তারা নিজেদের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। গ্রামে এই সংখ্যাটা খুব বেশি। ২৬% পুরুষ মনেই করেন না যে এই সময় মহিলাদের এই যত্ন অবশ্যই পাওয়া উচিত। চারজনে একজন পুরুষ মনে করেন এ এন সি-র পরামর্শ এই সময়ে না হলেও চলে, পাঁচজনের একজন মনে করেন তাদের পরিবারের কাছে এটা খুব দরকারি নয়। দশজনে একজন পুরুষ মনে করেন এটা খুব খরচ-সাপেক্ষ। শহরকেন্দ্রিক অঞ্চলে প্রায় একই ছবি ধরা পড়েছে, তবে সংখ্যাটা কিছুটা হলেও কম।

এই সমীক্ষায় আরও বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তা হলো, শহরকেন্দ্রিক অঞ্চলে সরকারি পরিষেবার পাশাপাশি বেসরকারি পরিষেবা তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চলে ছবিটা ঠিক উলটো। গ্রামে ৫৪% মহিলাই সরকারি পরিষেবার উপর নির্ভরশীল। তাছাড়া শহরে কর্মচারী বা চাকরিরতা মহিলাদের সংখ্যা অনেক বেশি, তাই তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে গ্রামের অধিকাংশ মহিলার নিজস্ব রোজগার নেই বললেই চলে। তাই তাদের নিজেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও স্বাধীনতা নেই। শিক্ষার উৎকর্ষতার পাশাপাশি উপার্জন এবং দৈনন্দিন জীবনে নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যের ক্রয় সিদ্ধান্তে মহিলাদের অংশগ্রহণ শহরে এবং শহরকেন্দ্রিক অঞ্চলে অনেক বেশি, গ্রামে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে ঠিক উলটো ছবি। সেখানে শিক্ষার আলো এতটাই কম পৌঁছেছে যে অধিকাংশ মহিলারাই উপার্জনের কথা ভাবতেই পারে না, ফলে তার প্রভাব পড়ে তাঁদের স্বাস্থ্যের উপরে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে। গ্রামের অধিকাংশ মহিলাই রোজগারহীন বলে তাঁরা এতটাই অসহায় যে ইচ্ছা থাকলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবেও কিছুই করে উঠতে পারেন না এবং নিজেদের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সমীক্ষায় দেখা গেছে ১২% মহিলা বলছেন তারা নিজেদের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না ২২.৬% মহিলার তাদের স্বামীর উপর নির্ভরশীল এবং ৬২.৫% মহিলা জানাচ্ছেন যে তাঁরা যে কোনও ব্যাপারে সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেন, এই সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে পাঁচজনের মধ্যে মাত্র একজন কর্মরতা মহিলাই নিজেদের রোজগার কীভাবে খরচ করা হবে তার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। নিজেদের ইচ্ছেয় কোনও দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও একই ছবি।

এই সমীক্ষায় আরও একটি অন্য তথ্য উঠে এসেছে তা হলো গ্রামীণ অঞ্চলে প্রসূতি মহিলারা তাঁদের প্রসূতিকালীন অবস্থায় যখন কোনও হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চেকআপ-এর জন্য যান তখন তাঁদের স্বামীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থাকেন। তবে শহরে এই সংখ্যাটা অনেক কম। শহরের ৭৬.৯% মহিলারাই তাদের চেক-আপ-এর সময়, ডেলিভারির সময় তাদের স্বামীরা অথবা বাড়ির পুরুষরা উপস্থিত থাকেন। বেশিরভাগ মহিলাদের পরিবারের লোকেরা প্রসূতি মহিলাদের বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, যত্নে থাকা, সঠিক খাবার খাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে চান না। তাদের কাছে এইসময় শরীর খারাপ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা সম্পর্কে কারও কোনও স্পষ্ট ধারণা না থাকায় সেই প্রভাব পড়ে—প্রসূতি মহিলাদের উপর, যার ফলশ্রুতি শিশু মৃত্যু অসুস্থ শিশুর জন্ম। গ্রামে ‍‌শিশু মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি, মহিলারা এই সময় যত্ন পান না বলে সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে রক্তাল্পতা, আয়রনের ঘাটতি দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত হয় নবজাতক। ভারতের অধিকাংশ মহিলাই সন্তান জন্মপূর্ববর্তী এবং পরবর্তী যত্ন পায় না বলে নবজাতকের দল মাতৃসুধা থেকে বঞ্চিত থাকছে এবং আগামী দিনের সুস্থ নাগরিক হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। তাই মৃন্ময়ী মায়ের আরাধনা করতে গিয়ে আমরা যেন চিন্ময়ী মাকে অবহেলা না করি—‘নবজাতকের কাছে এটাই হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার’।

Featured Posts

Advertisement