বিরোধীমুক্ত ভারতের
অভিযানে সংকটে পঞ্চায়েতও

শুদ্ধসত্ত্ব গুপ্ত

২০ মে, ২০১৮

বন নীতির খসড়া প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রক। দলিলটিতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যৌথ বন পরিচালন কমিটির। কারা থাকবে কমিটিতে? কেন্দ্র এবং রাজ্যের সরকারই ঠিক করে দেবে কমিটির সদস্য কারা হবে। স্থানীয় স্তরে এমন কমিটিতে প্রতিনিধি হবেন বনকর্মীরা। পরিকল্পনাতে তাঁরাই বাদ যাঁরা থাকেন বনাঞ্চলে। অথচ, বনাঞ্চল অধিকার আইনে আদিবাসীসহ স্থানীয়দের মতামতের কথা নির্দিষ্ট রয়েছে। বনজ সম্পদের ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে গ্রামসভা।

স্পষ্টত, বি জে পি সরকারের বননীতি হুবহু চূড়ান্ত হলে পঞ্চায়েত বা গ্রামসভার অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। আরও বিপজ্জনক এই কারণে, বনাঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয়দের সরিয়ে বেসরকারি সংস্থা এবং বিভিন্ন কর্পোরেটকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বনের স্বাভাবিক উদ্ভিদ কেটে কর্পোরেট সংস্থাকে লিজ দিয়ে বাণিজ্যিক ফসলের চাষের ব্যবস্থা করতে চাইছে বি জে পি সরকার। কাঠ বাদে ছোটখাট বনজ সম্পদ ব্যবহারে স্থানীয় মানুষের যে সুযোগ থাকে, সে সব বাদ।

স্থানীয় স্তরে গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করার পক্ষে নয় বি জে পি। গুজরাটে এমন বহু নমুনা রয়েছে। গুজরাটে আদিবাসীদের অংশ রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ভাগ। দেশে একটি আইন রয়েছে, চালু নাম ‘পেসা’। আদিবাসী প্রধান এলাকা নির্দিষ্ট করে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামসভাকে স্থানীয় সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয় এই আইনে। গ্রামসভা ডেকে জমি, জঙ্গল এবং জল ব্যবহারে স্থানীয়দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ অন্যত্রও রয়েছে। প্রশ্ন হলো, রাজ্যের সরকারের সদিচ্ছা থাকবে কিনা।

গুজরাট দেশের অন্যতম রাজ্য যেখানে নামমাত্র দামে বিশাল প্রান্তর বিভিন্ন কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে কর্পোরেট মহলে বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। বিশেষজ্ঞ থেকে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের তীব্র ক্ষোভ, গুজরাটে স্থানীয় সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হয়নি। বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে, জীবন-জীবিকার সুযোগ খারিজ করে জমি দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামসভায় আলাপ-আলোচনার তোয়াক্কা করা হয়নি।

তৃণমূল করে না। গণতন্ত্র সজীব থাকুক, চায় না বি জে পি-ও। সজীবতা মানে তো কেবল সংসদে মধ্যরাতের অনুষ্ঠান নয়, যেমন হয়েছিল পণ্য ও পরিষেবা করের বেলা। তৃণমূল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মানুষ অংশ নিচ্ছেন কিনা, বিষয় সম্পর্কে জেনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কিনা সে সবও প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের মাপকাঠি। কারণ, আমজনতার প্রতিদিনের জীবিকার যোগাযোগ রয়ে গিয়েছে এই প্রক্রিয়াটির সঙ্গে।

বি জে পি, ঠিক তৃণমূলের মতো বিতর্ক চায় না। প্রশ্ন চায় না। ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় নিতে চায় না। অমিত শাহ-নরেন্দ্র মোদীকে নিয়মিত বিরোধীশূন্য গণতন্ত্রের পক্ষে সওয়াল করতে হয়। কর্ণাটকে দখলদারির পর্ব চলছে। এর আগে মণিপুর, গোয়ার মতো একাধিক রাজ্যে হয়েছে।

মণিপুরে সরকার গড়তে ৩০আসন দরকার ছিল। কংগ্রেস পেয়েছিল ২৮আসন। তারাই বৃহত্তম দল। গরিষ্ঠতার চেয়ে ২টি আসনে পিছিয়ে। ভোটের পর অন্য দল টেনে নিয়ে সরকার করল বি জে পি। তাদের আসন ২১। গোয়ায় ২১আসন দরকার ছিল। কংগ্রেসের ১৭আসন। বি জে পি-র ১৩। ভোটের পর সরকার বি জে পি-র। একই যুক্তিতে ভোটের পরের সংখ্যা বিচারে কর্ণাটকে সরকার গড়ার কথা কংগ্রেস-জনতা দল (এস) জোটের। শপথ নিলেন বি জে পি-র বি এস ইয়েদুরাপ্পা! বিহারে ভোটে হেরে ভরাডুবির পরও বিপক্ষ জোট ভেঙে নীতীশ কুমারকে নিয়ে সরকার।

মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের মতো বিভিন্ন রাজ্যে বি জে পি যেখানে রাজ্যের সরকারে সেখানেও ঠুঁটো করে রাখা হয়েছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে। ঠিক তৃণমূলের মতো এখানেও কর্তৃত্ব আমলাদের। সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানার মতো রাজ্য। হরিয়ানায় পঞ্চায়েতের হাতে থাকা জমিতে জিমন্যাসিয়াম তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় বি জে পি সরকার। এবার ঠিক হয়েছে এই জায়গাগুলিকে ছেড়ে দেওয়া হবে আর এস এস-কে, তাদের শাখা চালানোর জন্য। এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলে বিরোধী মতের তোয়াক্কা করা চলে না। করা হচ্ছেও না।

এক দল, এক শাসন, এক মত, এক নেতা। এই কাঠামোটিতে বিশ্বের অন্যত্রও জমি দেওয়া হচ্ছে। যে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন বিশ্বজুড়ে চাপানো হয়েছে, এই ভরা মন্দায় সে নিজেই যুক্তি হারিয়েছে। সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রশ্ন, বিতর্ক এবং বিরোধিতা হাপিস করাই মডেল। তবে সংকট তো বাড়ছে। রাস্তায় জমাট বাঁধছে বিক্ষোভ। বিশ্বে, ভারতেও।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement