ভোটের লাইনে সৌদি মেয়েরা

শান্তনু ব্যানার্জি

১৬ অক্টোবর, ২০১১

Image

+

সৌদি আরবে এবার ভোট দিতে পারবেন মহিলারা। সম্প্রতি দেশের রাজা এই কথা ঘোষণা করেছেন। শুধু ভোট দেওয়াই নয়, এবার থেকে নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন সৌদি আরবের মহিলারা।

একে একটি বড় অদলবদল হিসেবেই দেখছে তামাম বিশ্ব। বিশেষত সৌদি আরবের মতো একটি দেশের ক্ষেত্রে, যে দেশে কট্টর রক্ষণশীল রাজতন্ত্রের হাতেই সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র। আবার অনেকের কাছে গোটাটাই একটি আসন্ন ঝড়ের পূর্বরাগ। সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই যে আন্দোলনের ঝড় সামাজিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নটিকে বলিষ্ঠতা প্রদান করেছে।

সংস্কারের দাবি

একদিকে রাজার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন সৌদি মহিলারা। আবার অন্যদিকে উঠেছে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিও। কারণ বহু প্রতীক্ষার অবসান করে দেশের মহিলারা ভোটাধিকার পেয়েছেন তা ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন অথবা সংশয় যাই বলুন উঠেছে সেই দেশের মান্ধাতার আমলের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঘিরেই। যেখানে মহিলাদের ভোট দিতে হলে, অন্তত পরিবারের একজন পুরুষ সদস্যের অনুমোদিত প্রমাণ দিতে হবে। তাই দাবি উঠেছে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের।

সৌদি আরবের রাজার ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৫সালে দেশের নির্বাচনে মহিলারা ভোট দিতে পারবেন। দেশের সাধারণ অথবা স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকর হবে। কিন্তু দেশে মহিলাদের দাবি ও অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত সংস্থাগুলি সমস্ত ঘটনাকে খুব একটা আমল দিচ্ছে না। কারণ ২০১৫সাল আসতে এখনো ঢের দেরি। পাশাপাশি মহিলাদের ভোটদানের ক্ষেত্রে একটি বিষয় ছাপ ফেলতে পারে বলেই তাদের ধারণা। আর সেই বিষয়টি হলো ভোট দানের ক্ষেত্রে পরিবারের কোন একজন পুরুষ সদস্যের অনুমোদন। যা কিনা প্রভাবিত করতে পারে মহিলাদের গণতান্ত্রিক এই অধিকারকে।

রাজার ঘোষণার পর জেড্ডা শহরে মহিলাদের একটি আলোচনাসভা হয়। এর আয়োজকদের অন্যতম ছিলেন রিয়াধের নাগরিক নাইলা আত্তার। তিনি জানান, সেমিনারে মহিলারা কেমনভাবে ভোট দেবেন তা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষত বিশেষত স্থানীয় পৌর নির্বাচনগুলিতে। বিতর্ক চলে মহিলাদের অধিকারের বিষয় নিয়েও। বিশেষত ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্যের অনুমোদন নিয়ে। অনেক মহিলা প্রতিনিধি নিজেদের গাড়ি চালানোর অধিকারের দাবির বিষয়েও সোচ্চার হন। কারণ সৌদি আরবের আইনে আজও মহিলাদের গাড়ি চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ।

অন্যদিকে এই সেমিনারের পর জেড্ডার প্রশাসনিক ভবনে মহিলাদের তরফে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। কিন্তু এর উত্তরে সরকারের পক্ষ থেকে কোন উচ্চবাচ্য করা হয়নি।

সদিচ্ছার অভাব

মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ওঠা প্রবল আলোড়নে নড়েচড়ে বসেছে সৌদি আরবের রাজতন্ত্র। তাই কঠোরভাবে আড়ষ্ট শৃঙ্খলিত শাসন প্রণালীতে কিছুটা ঢিল দিতে মরিয়া সমাজের ওপরতলা। মহিলাদের ভোট দান করার ঘোষণাকে বহু দশক পর সৌদি আরবে একটি বড় বদল হিসেবে দেখছে আমেরিকা ও পশ্চিমী দুনিয়া। যখন কিনা এই সমস্ত দেশে মহিলাদের ক্ষমতায়নের বিষয় নিয়ে আলোচনা ও একপ্রকারে বাতুলতার শামিল। তাই সৌদি আরবের রাজা আবদুল্লা বিন আবদুল্লাজিজ আল—সৌদি’র ঘোষণাকে একটি বড় প্রাপ্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে। ছয় বছর আগে রাজা আব্দুল্লা ক্ষমতায় এসেছিলেন। শুরুতে যার ভাবমূর্তি ছিলো উদার এবং দেশের সামন্ততান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সংস্কারে ইচ্ছুক একজন হিসেবে। কিন্তু পরে প্রমাণ হয় সমস্তটাই রটনা। আসলে এই রাজাও চান তার পূর্বসূরিদের দেখানো পথেই দেশকে চালাতে।

বাস্তবেও রাজার এই ঘোষণার প্রভাব হবে নগণ্য। দেশের শাসন ব্যবস্থাতেও তা খুব একটা ছাপ ফেলতে পারবে না। কারণ‍‌ সৌদি আরবের আইনে স্থানীয় পৌর সংস্কার মাত্র অর্ধেক আসনেই নির্বাচন হয়। বাকিটা থাকে রাজার ‘কোটা’ হিসাবে। এছাড়া এই পৌর সংস্থাগুলির হাতে কোন বিশেষ অধিকারও নেই।

এদিকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দেশে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে কেবল পুরুষরাই ভোট দিতে পারবেন। মহিলারা ভোট দিতে পারবেন এর পরের বারের পৌর নির্বাচনে। যা হবে ২০১৫ সালে।

গণতান্ত্রিক অধিকার

সম্প্রতি রিয়াধে একটি অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের রাজাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছিলেন সাংবা‍‌দিকরা। কিন্তু রাজা তার কোন উত্তর দেননি। বিশেষ মহিলাদের দেশে ভোটাধিকার ঘোষণাকে মাথায় রেখেই করা হয়েছিলো এই প্রশ্নগুলি। এখানে রাজাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো দে‍‌শের মহিলারা কবে গাড়ি চালানোর অধিকার পাবেন? নিজেদের ইচ্ছামতো যেতে পারবেন কর্মক্ষেত্র অথবা বিদেশে। পরিবারের কোন পুরুষ অভিভাবক ছাড়াই। কিন্তু রাজা আব্দুল্লা এর জবাবে ছিলেন নিরুত্তরই।

অবশ্য রাজার এই ঘোষণাকে ঘিরে আশাবাদী দেশের গণতান্ত্রিক দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলনকারী একটি শিবির। তাদের মতে বর্তমানে রাজা মহিলাদের নির্বাচনে ভোটদান করার অধিকার দিয়েছেন। ক্রমশ একে একে পূরণ করবেন অন্য দাবিও। যা তারা বহু সময় ধরে করে চলেছেন। ‘এটা একটা বিশাল খবর’, জানালেন সৌদি লেখিকা ও মহিলাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনের কর্মী ওয়াজেহা-আল-হুওয়েইদের। তিনি আরো বলেন, ‘অবশেষে মহিলাদের কথাও শোনা হবে। এখন সময় হয়েছে অন্য প্রতিবন্ধকতাগুলিকেও তুলে দেওয়ার। যেমন মহিলাদের গাড়ি চালাতে দেওয়া অথবা সমাজজীবনে কোন পুরুষ অভিভাবক ছাড়াই স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার।’

প্রসঙ্গত, নিজের পাঁচ মিনিটের দেওয়া ভাষণে রাজা আব্দুল্লা বলেছেন মহিলারা ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে প্রদত্ত বিধিনিষেধ নিয়ে কোন টু’শব্দটি করেননি। তাঁর মতে মহিলারা দেশে পরামর্শদাতা ‘শুরা কাউন্সিল’-এর নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। যে পরিষদ সৌদি আরবে আইন প্রণয়ন নিয়ে সুপা‍‌রিশ করে। এই পরিষদের কোন বিধিবদ্ধ অধিকার পর্যন্ত নেই। নিজের ভাষণে রাজা আব্দুল্লা বলেছেন, ‘আমরা সমাজে মহিলাদের প্রান্তিক অংশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চাই না। আর তা শরিয়ৎ আইন মেনেই। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, প্রবীণ উলেখা (ধর্মগুরু)’দের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর। এই নিয়ে অন্যদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। যাতে ‘শুরা কাউন্সিলে’ মহিলারা অংশ নিতে এবং নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। এবং তা ২০১৫ সালে অনু‍‌ষ্ঠিত পরবর্তী ‍নির্বাচন থেকে।’

জমকালো প্রচার

সৌদি রাজার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা। এক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের বক্তব্য কিছুটা অভিনব।’ মহিলারা নতুন কায়দায় ভোট দিতে পারবেন। যা তাদের জীবন এবং সমাজকে প্রভাবিত করবে’, ওয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত একটি প্রেস বিবৃতিতে এই কথা জানানো হয়েছে। এরপর ওয়াশিংটন থেকে আরো একটি ঘোষণা করা হয়। ‘এর ফলে সৌদি আরবে মহিলাদের অধিকার বাড়বে। আমরা রাজা আব্দুল্লাকে সমর্থন করি’, বলা হয় এই বিবৃতিতে।

সৌদি আরবের রাজতন্ত্র নিয়ে দুটি বই লিখেছেন লেখক রবার্ট লেসে। তিনি এই বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হবার পর থেকে সৌদি আরবে প্রথম ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ আরব দেশগুলিতে গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সৌদি আরবেও কিছু আন্দোলন হয়েছে। অবশ্য এই আন্দোলনে বিশাল সংখ্যায় মানুষ যোগদান করেনি। শুধু দেশের সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায়ের বিক্ষোভকারীরা ছাড়া।

দেশের পূর্বের প্রদেশগুলিতেই হয়েছিলো এই আন্দোলন। যদিও সৌদি রাজতন্ত্র কড়া হাতে মোকাবিলা করে সেই বি‍ক্ষোভের। দেশে নিষিদ্ধ করা হয় জমায়েত। একই সঙ্গে সাধারণ নজর ঘোরাতে গত মার্চে সামাজিক খাতে অতিরিক্ত ১০ কোটি ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার কথাও ঘোষণা করেন রাজা আব্দুল্লা। তাই লেসের মতে গোটাটাই হলো, ‘প্রথমে হুঁশিয়ারি’ তারপর আর্থিক অনুদান এবং শেষে লোক দেখানো সামাজিক সংস্কার।’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement