শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিন
কন্যার নোবেল জয়

মৃণালকান্তি দাস

২৩ অক্টোবর, ২০১১

শান্তি প্রতিষ্ঠায় অহিংস আন্দোলনের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন মহিলা নেত্রী। তাঁরা হলেন লাইবেরিয়ার রাষ্ট্রপতি এলেন জনসন সারলিফ (৭২), ওই দেশেরই শান্তিবাদী কর্মী লেইমাহ রোবার্তা বোয়ি (৩৯) এবং ইয়েমেনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী তাওয়াকুল কারমান (৩২)। নোবেল কমিটি এই তিনজনকে মনোনীত করার কারণ হিসেবে জানায়, ‘এই তিন মহিলা নেত্রী অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অহিংস আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।’ পুরস্কারের অর্থমূল্যবাবদ এই তিনজন ১৫লক্ষ মার্কিন ডলার পাবেন।

আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহযুদ্ধ বন্ধে জনসন সারলিফ ও লেইমাহ বোয়ি একসঙ্গে কাজ করেছেন। সারলিফ আফ্রিকার প্রথম নির্বাচিত মহিলা রাষ্ট্রপতি। লাইবেরিয়ায় ১৪বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে ২০০৫সালে আফ্রিকার প্রথম নির্বাচিত মহিলা রাষ্ট্রপতি এলেন জনসন সারলিফ তাঁর সমর্থকদের কাছে ‘লৌহমানবী’ নামেই পরিচিত।

৭২বছরের প্রবীন সারলিফ লাইবেরিয়ার ২৪তম রাষ্ট্রপতি। এর আগে ১৯৭৯সাল থেকে ৮০সালে সামরিক অভ্যূত্থানের আগে পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম টোলবার্টের অধীনে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। এরপর দেশ ছেড়ে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন অর্থনীতি বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী এই মহিলা নেত্রী। ১৯৯৭সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হলেও ২০০৫-এর নির্বাচনে জয়ী হন।

সারলিফের জন্ম ১৯৩৮সালের ২৯ অক্টোবর মনরোভিয়ায়। ছাত্র জীবনে মাত্র ১৭বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন সারলিফ, স্বামী জেমস সারলিফ। আর এর পরই লাইবেরিয়া ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে চলে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ঘর-সংসার শুরু করলেও পড়াশোনাটা ছাড়েননি অর্থনীতির এই ছাত্রী। নিজ আগ্রহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসন থেকে হিসাব বিজ্ঞান বিষয় এবং এরপর ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো, বাউল্ডার থেকে নেন অর্থনীতির উপর ডিগ্রি। ১৯৬৯ থেকে ৭১ পর্যন্ত তিনি অর্থনীতি ও পাবলিক পলিসি বিষয়ে পড়াশোনা শেষে লোক প্রশাসন বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন।

আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও নিজের দেশে যথাযথ কদর পাননি সারলিফ। বিভিন্ন সময় তাঁকে অবজ্ঞা সইতে হয়েছে। তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে। সারলিফের নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠেনি বটে, কিন্তু তাঁর আস্থাভাজন অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। এমন প্রেক্ষাপটে ১১ই অক্টোবর নির্বাচন হয়ে গেল লাইবেরিয়ায়। চূড়ান্ত ফল পেতে আরও কয়েক দিন লাগার কথা। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, সারলিফ এবারের নির্বাচনে হেরেও যেতে পারেন। বিশেষত যদি দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোটগ্রহণ করতে হয় তাহলে সারলিফের পরাজয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাবে। জনগণের একাংশের আশঙ্কা, সারলিফ পুনর্নির্বাচিত হলে দেশে হিংসা ছড়িয়ে পড়বে।

৭২বছর বয়সী এ মহিলা নেত্রী দেশের বাইরে দারুণ প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব। বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার পর তিনিই আফ্রিকা মহাদেশের পরিচিত মানুষ। পশ্চিমী শক্তির পছন্দের তালিকায়ও তাঁর নাম প্রথম সারিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডমসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন সারলিফ।

রাষ্ট্রপতি সারলিফ বলেছেন, সমস্যায় জর্জরিত লাইবেরিয়ার রোগ সারাতে আরও সময় চাই। নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁর মনরোভিয়ার কার্যালয়ে নিউজ উইককে সারলিফ বলেন, ধ্বংস হয়ে যাওয়া অর্থনীতি, অকার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশৃঙ্খল নীতিমালা, আইনের শাসনের অভাব আর অদক্ষ প্রশাসনের মতো বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত অবস্থায় দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। জাতীয় বাজেটের চেয়ে বৈদেশিক ঋণ সাত গুণ। অবকাঠামো বলতে কিছু ছিল না। শিক্ষিত এলিট শ্রেণী উন্নত জীবনের আশায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিচ্ছিলেন। সারলিফের হাত ধরেই লাইবেরিয়ার অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় চার গুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। দাতাদের সহায়তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, হাসপাতাল, জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থায়ও কিছুটা পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জনগণের সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে এর খুব কম প্রভাবই পড়েছে। প্রতি ১০জনের মধ্যে একজনের আয় দিনে এক ডলারের নিচে। সাধারণ মানুষ অত সংখ্যাতত্ত্বের কথা বোঝেন না। তাঁরা চান দ্রুত ফল। সারলিফের প্রতি জনগণের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি ও পুনর্গঠনের ধীরগতি। অপরাধ—বিশেষত ধর্ষণ বেড়ে যাওয়াও তাঁদের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। গৃহযুদ্ধের সময় যে মাত্রায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, দৃশ্যত তা অপরিবর্তিত রয়েছে। শিশুদের ওপর ধর্ষণ ও যৌননির্যাতনের হার বাড়ছে।

সারলিফ ধর্ষণের সমস্যা মোকাবিলায় বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। কঠোর আইন প্রণয়ন করেন, গঠন করেন বিশেষ পুলিস ইউনিট ও আলাদা আদালত। কিন্তু এসব ব্যবস্থা ধর্ষণ দমনে তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। সারলিফ ক্ষমতা গ্রহণের পর ধর্ষণের অভিযোগে মাত্র পাঁচজনের সাজা হয়েছে বিশেষ আদালতে। পূর্বসূরি চার্লস টেলরের সঙ্গে সারলিফের মিত্রতার বিষয়টিকেও নেতিবাচকভাবে দেখছেন তাঁর সমালোচকেরা। ১৯৮৯সালে স্যামুয়েল ডো-র স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ শুরু করেন টেলর। স্যামুয়েল ডো ১৯৮০সালে অসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসেছিলেন। প্রথম দিকে সারলিফ চার্লস টেলরকে সমর্থন করেন। পরে তা প্রত্যাহার করে নেন। তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। এর মধ্যে ক্ষমতায় আসেন টেলর। তাঁর শাসনে দুই লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। ২০০৩সালে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপে ক্ষমতা ছেড়ে দেন টেলর।

সারলিফ ক্ষমতায় আসার পরে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করে অতীতের অন্যায়ের প্রতিকারের চেষ্টা করেন। কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৫০জনের একটি তালিকা করে ৩০বছরের জন্য তাঁদের সরকারি কোনো পদ বা নির্বাচন থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সারলিফ সরকারের এই উদ্যোগে প্রশ্ন ওঠে। এখন দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার অঙ্গীকার না রাখায়ও বিরোধীরা সমালোচনা করার নতুন সুযোগ পেয়েছে।

নোবেল বিজয়ী অপর লাইবেরীয় লেইমা বোয়ি একজন শান্তি কর্মী। তিনি গৃহযুদ্ধের কড়া সমালোচক। লাইবেরিয়ায় গৃহযুদ্ধকালে এবং পরবর্তী সময়ে মহিলাদের বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য কাজ করেছেন বোয়ি। শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহিলাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকারের জন্যও তিনি সংগ্রাম করেছেন। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মহিলাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর জন্য রীতিমতো এক অসাধ্য সাধন করেছেন বোয়ি। পশ্চিম আফ্রিকার মহিলাদের মধ্যে এখন তিনি সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে বিবেচিত।

মাত্র ৩২বছর বয়সে শান্তিতে নোবেল জয় করলেন ইয়েমেনের মহিলা নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী তাওয়াকুল কারমান। ইয়েমেনের প্রধান বিরোধী দল আল-ই সলাহের নেত্রী কারমান ২০০৫সালে গঠন করেন মানবাধিকার সংগঠন ‘উইমেন জার্নালিস্ট উইদ আউট চেইনস’। গত পাঁচ বছর ধরে এই নেত্রী মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে আসছেন।

ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতি আলি-আবদুল্লাহ সালেহর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া রাজবন্দিদের মুক্তির জন্য ২০০৭থেকে ২০০৯সাল পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করে গেছেন কারমান। আমেরিকার পছন্দের তালিকায় উঠে আসা এই তাওয়াকুল কারমান সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। এবছরও তাঁকে পুলিস গ্রেপ্তার করে। সমর্থকদের আন্দোলনের মুখে ২৪ ফেব্রুয়ারি প্যারোলে মুক্তি পান তিনি। শুধু সরকারবিরোধী আন্দোলন নয়, ইয়েমেনের মহিলাদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার জন্যও প্রচার চালিয়ে আসছেন তাওয়াকুল কারমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের সরকারের দ্রুত পরিবর্তন চায়। তাওয়াকুল কারমান এখন সেই পরিবর্তনের লড়াইয়ের নেত্রী।

তাওয়াকুল কারমানকে পশ্চিমী শক্তি ইয়েমেনের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের পথপ্রদর্শক বলে। মহিলা ক্ষমতায়ন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কারমানই প্রথম ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতি আলি আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে মানুষ জড়ো করেন। হত্যা ও কারাদণ্ডের হুমকি দিয়েও তাকে আন্দোলন থেকে টলানো যায়নি। এমনকি সরকারি উচ্চপদ দেওয়ার লোভ দেখানো হলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই তিন নারীর পুরস্কারপ্রাপ্তি আরও অনেক দেশের মহিলার কাছে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেবে। পাশাপাশি মহিলাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্রের পথে যাত্রায় মহিলারা এগিয়ে আসবেন। অসলোয় এ তিনজনের নাম ঘোষণা করে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান থরবোয়ের্ন জ্যাগল্যান্ড বলেন, সমাজের সর্বস্তরে উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও অবদান রাখছেন। কিন্তু মহিলাদের একই সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া পর্যন্ত বিশ্বে স্থায়ী শান্তি ও গণতন্ত্র আসতে পারে না। অনেক দেশে এখনো মহিলাদের ওপর যে নিপীড়ন চলছে এই পুরস্কার তার অবসান ঘটাবে। একই সঙ্গে গণতন্ত্র ও শান্তির জন্য মহিলাদের অবদান অনুধাবন করা সম্ভব হবে বলে নোবেল কমিটি আশা করে।

পুরস্কার পাওয়ার পর কারমান তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি অত্যন্ত খুশি। যেসব তরুণ ইয়েমেনের বিপ্লবের জন্য কাজ করছেন, তাদের প্রতিই আমি এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি।’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement