সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলাচ্ছেন শিরিন

গণশক্তির প্রতিবেদন

৩০ অক্টোবর, ২০১১

শিরিন জুয়ালকে প্রথম দেখে অনেকেই থমকে যান। শিরিনও সেটা জানেন। নিজেই জানালেন, কতো লোক তাকে দেখে ভীত হয় এবং কথা বলতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। কারণ তার ভয়াবহ মুখ এবং বিকৃত চেহারা।

পারিবারিক হিংসার শিকার শিরিন। নাকের একটা বড় অংশ অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়‌ায় দুটি ছিদ্র না থাকলে নাকের অস্তিত্বটাই বোঝা যেত না। শিরিনের স্বামী ১৯৯৮সালে তাঁর ওপর অ্যাসিড ছুঁড়েছিল। অপরাধ ছিল একটাই — শিরিন বিবাহবিচ্ছেদ দাবি করেছিল। এরপর একটা যন্ত্রণাময় যুগ। বোরখার আড়ালে পুড়ে যাওয়া মুখ, ধীরে ধীরে নিজেকেও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার প্রয়াস শিরিনের জীবনকে বেদনাময় করে তুলেছিল। স্বস্তি ছিল একটাই, চোখ দুটি অক্ষত থাকায় বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর সুন্দরতাকে সে তখনও উপভোগ করতে সক্ষম। আজ তাই এক ধাক্কায় বোরখাটাকে সরিয়ে যন্ত্রণার অতীতকে ফেলে, ক্ষতচিহ্নের দাগগুলিকে সঙ্গে নিয়েই শিরিন রাস্তায়, জনতার মাঝে-তাদের সাথে।

আজ প্রায় দশ বারো বছর পর সে তাঁর উপহার সমাজের সাথে ভাগ করে নিচ্ছে, সমাজকে বিভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার কায়দা যা সে রপ্ত করতে পেরেছিল চোখ দুটি অক্ষত থাকায়। আর তাই পদে পদে শিরিন আজ সমাজকে চ্যালেঞ্জ করছেন আমাদের তথাকথিত সৌন্দর্যের ধারণাকে বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে। সমাজকল্যাণ দপ্তর, পিওন হাসপাতাল এবং কস্তুরবা হাসপাতালের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শিরিন তৈরি করেছেন পলাশ ফাউন্ডেশন, যার মূল লক্ষ্য পঙ্গু মানুষদের সাহায্য করা এবং তাঁদের সমাজে স্থান করে দেওয়া। সমাজের এইসব মানুষদের জন্য সামাজিক পুনর্বাসনের একদম আলাদা ধারণা দেওয়ার জন্য শিরিন ম্যাড-ও-ওট নামক একটি বিউটি পার্লারের ব্র্যান্ডদূত হিসাবে নিয়োজিত হয়েছে।

এই সংস্থার মূল উদ্দেশ্য সমাজের তথাকথিত ধারণায় যাঁরা ‘কুৎসিত’, সেইসব মানুষদের জন্য আলাদা একটা সমাজ তৈরি করা, যেখানে তাদের অধিকারগুলি সুরক্ষিত থাকে।

শিরিনের সংস্থার মূল লক্ষ্য কেবল আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষদের জন্য আলাদা সমাজ গঠন নয়। যে কোন ব্যক্তি, যাঁরা বিভিন্ন দুর্ঘটনায় শারীরিক ভাবে বিকলাঙ্গ বা বিকৃত হয়েছেন তাঁদের সবাইকে একছাতার তলায় নিয়ে এসে সমাজের অঙ্গ করে নিয়ে বাঁচতে শেখানো বা বাঁচার কায়দা শেখানো।

এক্ষেত্রে মূল বাধা আমাদের তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থা। যেখানে সুন্দর দেখতে মানুষরা নায়ক আর জগৎখ্যত অভিনেতারা কেবল মুখে অজস্র বসন্তের দাগ থাকায় খল নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতে বাধ্য। পুরাণ থে‍‌কে শুরু করে আধুনিক বলিউড জগৎ সর্বত্রই সুন্দরের পূজা চলে। সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটাই হলো ফর্সা, লম্বা আর সুগঠিত চেহারা। তাই টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের অধিকাংশ জুড়ে থাকে সৌন্দর্য প্রোডাক্টেই।

শিরিনের কথায়, সমাজের বহু মানুষ হিংসার শিকার এইধরনের মানুষদের সাহায্য করতে রাজি থাকলেও তাঁদের সাথে জনসমক্ষে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন। এটা মানসিক ঘাটতি। কিন্তু এইসব মানুষদের সাথে কথোপকথনটা খুবই জরুরী, যা তাদের হীনভাব কাটাতে সাহায্য করবে।

জনগণের এই মানসিকতা কাটানোর উদ্দেশ্যে শিরিন মুম্বাইয়ের বিভিন্ন কলেজে সচেতনতা শো অনুষ্ঠিত করেন। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও দেখানোর মাধ্যমে যে মূল প্রশ্নটা তিনি তুলে ধরতে চান, তা হলো—বেঁটে বামন, শ্বেতী বা দুর্ঘটনার কবলে পঙ্গু ‍ হয়ে যাওয়া লোকজন কী সাধারণ মানুষের একজন নয়? তাহলে কেন তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সমাজের অন্যান্য লোকেরা হীনমন্যতায় ভোগেন? মানসিক বা শারীরিক দিক থেকে অস্বাভাবিক মানুষকে সমাজ নিজের অংশ করে নিতে আজও অক্ষম। তাই তাঁরা সমাজের বাইরে উপেক্ষিত থাকে। শিরিনের বক্তব্যে এটাও উঠে আসে যে, কীভাবে একজনের কোনো শারীরিক অস্বাভাবিকতা তাঁর নামকরণে প্রভাব ফেলে। ‘কালি, মোতি, চশ্‌মিশ, টিঙ্গু’—ইত্যাদি নামকরণে সত্যিই যে ব্যক্তিগুলির শরীরের কোনো কোনো অঙ্গের অস্বাভাবিক প্রকাশ পাচ্ছে তা উদাহরণ হিসাবে শিরিন উত্থাপিত করেন।

অগ্নিকাণ্ডের শিকার লোকগুলির আত্মবিশ্বাস এবং আত্মসম্মান বাড়ানোর লক্ষ্যে শিরিনের সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন ছবি বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি, রোজ নিয়ম করে তাঁদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয় সেইসব স্থানে যেখানে তাঁদের যাওয়া অন্তত সমাজের চলে আসা নিয়মে প্রতিকূল।

কিছুদিন আগে পলাশ ফাউন্ডেশন এবং ম্যাড ও হোয়াট এর যৌথ উদ্যোগে ‘‘টুইট আপ নাইট’’ বলে একটি অনুষ্ঠান হয় যার উদ্দেশ্য বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার বা প্রতিবন্ধী বা অস্বাভাবিক মানুষদের সাথে সমাজের স্বাভাবিক মানুষের দূরত্ব মেটানো। যাতে আক্রান্ত বা দুর্ঘটনার শিকার হওয়া এই লোকগুলির পাশে সব দূরত্ব কাটিয়ে এসে দাঁড়ায় সমাজের সব অংশের মানুষ। পলাশের বাৎসরিক অনু্ষ্ঠানে সিয়ন হাসপাতালের অগ্নিদগ্ধ রোগী এবং তাদের চিকিৎসার কর্মীদের একত্রে একটি রিসর্টে রেখে খোলামেলা বাক্য বিনিময়ের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে রোগীদের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে তোলা যায়। শিরিনের বক্তব্য অনুযায়ী — ‘‘কখনো কখনো চিকিৎসারত কর্মীরা রোগীদের ক্ষতে হাত দিতে ভয় পান, কারণ সংস্পর্শে রোগীরা ব্যথা পেতে পারে। তাই অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে রোগীদের আক্রান্ত ক্ষতগুলি নিরাময়ের সম্পূর্ণ চেষ্টা আমরা করে থাকি। যাতে পুড়ে যাওয়া অঙ্গের কোনো মারাত্মক ক্ষতি না হয়।’’

সর্বোপরি পলাশ ফাউন্ডেশন শুধু ক্ষত নিরাময় নয়, আক্রান্তদের জীবন আরো সুন্দর করার লক্ষ্যে সর্বতোভাবে সাহায্য করে থাকে। এই কাজে শিরিনের ভূমিকা সত্যিই অনস্বীকার্য। ২০০৮সালে সোয়ানসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানব অধিকার এবং উন্নয়নে মাস্টার্স ডিগ্রি করে সমাজের অস্বাভাবিক বা দুর্ঘটনার শিকার হওয়া মানুষগুলির পাশে দাঁড়াতে শিরিন যে সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন তা আজ অনেকখানি সফল বলা চলে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement