মুখ্যমন্ত্রীর ‘নজরদারির’ নির্দেশ শুনে
মাঝরাতে অন্তঃস্বত্ত্বাকে মারছে তৃণমূলীরা

প্রলয় হাজরা

৬ নভেম্বর, ২০১১

খানাকুল ২নম্বর ব্লকের ঠাকুরাণীচক গ্রাম পঞ্চায়েতের কাঁছরা, শঙ্করপুর পাশেই কিশোরপুর গ্রামপঞ্চায়েতের ঘাষুয়া ইত্যাদি গ্রামগুলিতে মহিলাদের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারী দলের পোষ্য দুষ্কৃতী বাহিনী। মুখ্যমন্ত্রী যখন মহিলাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে নজরদারির কথা বলছেন, সেই সময়ে তাঁরই দলের কর্মীরা হুগলীর খানাকুলের গ্রামে গ্রামে আক্রমনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিচ্ছে মহিলাদেরই। গত মঙ্গলবার রাতেই ঠাকুরাণীচক গ্রাম পঞ্চায়েতের শঙ্করপুরগ্রাম সাক্ষী হয়ে রইল তৃণমূল দুষ্কৃতীদের নির্মম অত্যাচারের।

রোজের মতো মঙ্গলবার ঠিক রাত ৯টার সময় জনা কুড়ি মুখে কালো কাপড় বাঁধা তৃণমূল দুষ্কৃতী বাহিনীর দল মোটর সাইকেল নিয়ে হামলা, লুঠপাট চালানোর জন্য চলে আসে ঠাকুরাণীচকের শঙ্করপুর গ্রামে। এদিন তাদের লক্ষ্য ছিল প্রাক্তন গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য ও পার্টি সদস্যা শঙ্করী নায়েকের বাড়ি। বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই বাড়ির পুরুষরা তৃণমূলী অত্যাচারে ঘরছাড়া। অন্যান্য দিনের মতোই এদিন শঙ্করী নায়েক তাঁর অন্তঃস্বত্ত্বা কন্যা ও বোনের মেয়েকে নিয়ে বাড়িতেই ছিলেন। দুষ্কৃতীরা প্রথমে বাড়িতে এসেই বাইরে থেকে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয় এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে করতে দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢোকে। বাইরে পাহারায় থাকে বেশ কয়েকজন। যাতে কোনোভাবে গ্রামবাসীরা এই বাড়ির দিকে আসতে না পারে। প্রথমেই শেখ হায়দার, উজ্জ্বল বাগ, মণি মল্লিকের নেতৃত্বে থাকা তৃণমূল বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে শঙ্করী নায়েকের অন্তঃস্বত্ত্বা কন্যার উপর। বেশ কিছুক্ষণ ধরে মারধর করে তাঁকে। এরপর তারা অন্ধকার করা বাড়িতে টর্চ নিয়ে চলে যায় বাড়ির দোতলায় শঙ্করপুর গ্রামের মহিলা নেত্রী শঙ্করী নায়েকের ঘরে। নিরাপত্তার জন্য চিল চিৎকার করলেও গ্রামের কোনো মানুষই এগিয়ে আসতে সাহস পাননি বাড়ির বাইরে থাকা সশস্ত্র তৃণমূলী প্রহরা থাকায়। তখন বাড়ির ভিতর দুষ্কৃতী বাহিনী চড়াও হয়েছে শঙ্করী নায়েকের বোনঝির উপর। বাড়ির নিচের তলায় যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন তাঁর অন্তঃস্বত্ত্বা কন্যা। প্রায় একঘন্টা ধরে তৃণমূলের জল্লাদ বাহিনী পুরুষশুণ্য বাড়িতে থাকা মহিলাদের মারধর করে। শ্লীলতাহানির চেষ্টাও করে তারা। কোনোক্রমে তাঁরা সম্মান বাঁচান। দুষ্কৃতীদের বেধড়ক মারে রক্তাক্ত হন শঙ্করী নায়েক ও তাঁ বোনঝি। কিন্তু গ্রামের মানুষরা ঘটনাস্থলে যেতে না পারলেও তাঁরা খবর দেন পার্টির খানাকুল জোনাল দপ্তরে এবং স্থানীয় খানাকুল থানায়। বেশ কিছুটা পরে পুলিস আসলেও কোন নিরাপত্তার আধার পাননি শঙ্করী নায়েক। পুলিসের সামনে দিয়েই তৃণমূলের দুষ্কৃতী দল ‘আজ চলে যাচ্ছি, পরে আবার বুঝে নিতে আসবো’ হুমকি দিয়ে চলে যায়।

এই ঘটনায় গ্রামের মহিলারা এখন প্রবল আতঙ্কিত। ঘটনার কথা জানতে চাইলে মুখ লুকানো বা নাম না বলতে চাওয়াতেই স্পষ্ট তাঁদের অসহায়তা। খানাকুলের তৃণমূল নেতা শৈলেন সিংহ জানিয়েছেন এরসঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক নেই। তবে তিনি যতই সাংবাদিকদের কাছে বলুন ‘ঘটনার সঙ্গে তৃণমূলের কোনো যোগ সূত্র নেই, যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা তৃণমূলের সদস্য নয়, কিন্তু এলাকার মানুষ জানেন কারা এই শেখ হায়দার, উজ্জ্বল বাগ, মণি মল্লিক। পার্টির খানাকুল জোনাল দপ্তরের এরাই হামলা করেছিল। সঙ্গে নিয়মিত ‘রসদের’ জোগান বজায় রাখতে নিজেদের গ্রামেরই প্রতিবেশীদের ঘর লুঠ করে। সাধারণ মানুষ রোজকার এই অত্যাচার প্রশাসনের কাছে জানাতে পারে না। যেমন পারেননি শঙ্করী নায়েক। কারণ ঘটনার ‘তদন্ত করতে’ গ্রামে আসা পুলিসকে অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিস তাঁদের বলেন থানায় এসে অভিযোগ জানাতে হবে। আর থানায় যাওয়ার নিষেদ্ধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে এই হানাদাররা। শুধু তাই নয়, থানায় যাওয়ার রাস্তায় পাহারাও বসিয়েছে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা।

শুধু শঙ্করী নায়েক একলা নন, কিছুদিন আগে একই বীভৎস ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছেন পাশের কাঁছরা গ্রামের প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য আফরোজা বেগম, রিঙ্কু দলুই। কিশোরপুর ২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের ঘাষুয়া গ্রামের খানাকুল ১নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন কর্মাধ্যক্ষা গীতা জানারা। এছাড়াও অসংখ্য মহিলা আছেন যাঁরা তৃণমূলী অত্যাচার, হুমকির অভিযোগ প্রাণ ভয়ে জানাতেই পারেননি প্রশাসনের কাছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement