‘আমি-তুমি গৌরী’ স্লোগান
তুলে জনজোয়ার বেঙ্গালুরুতে

সংবাদসংস্থা

বেঙ্গালুরু, ১২ই সেপ্টেম্বর— একজন গৌরীকে খুনের প্রতিবাদে পথে নামলেন হাজার হাজার ‘গৌরী’। ‘আমি গৌরী, তুমি গৌরী’ (আই অ্যাম গৌরী, ইউ আর গৌরী) স্লোগানে-স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠলো বেঙ্গালুরুর রাস্তা। লেখক, শিল্পী, সমাজকর্মী, যুক্তিবাদী, সাংবাদিক, ছাত্রছাত্রী, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেই পায়ে পা মিলিয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ। নৃশংস গৌরী লঙ্কেশ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শান দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ মঙ্গলবার বেঙ্গালুরুর রাস্তায় হেঁটেছেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আর এস এস) এবং বি জে পি-র বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়েছে বেঙ্গালুরুর পথে। ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন বিশিষ্টরা, সরব হয়েছেন আমজনতাও।

বেঙ্গালুরুর সঙ্গোল্লি রায়ানা রেল স্টেশনে মঙ্গলবার সকাল থেকে ভিড় জমতে শুরু করে। দশ থেকে ১০০ এবং বেলা ১১টার মধ্যে এক ঝটকায় সংখ্যাটা পৌঁছে যায় ১০হাজারে। স্টেশন থেকেই শুরু হয় মিছিল। চলতে চলতেই আরও হাজার হাজার মানুষ পা মেলান। লোকসংগীত শিল্পী, দলিত সংগঠন, মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী, কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এদিন গৌরী খুনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন। কমপক্ষে ১৪০টি সংগঠন একযোগে গৌরী খুনের প্রতিবাদে এবং সুবিচারের দাবিতে একযোগে এদিন প্রতিবাদে অংশ নিয়েছে। লোকসংগীত শিল্পীর কণ্ঠে গণসংগীত বিচারের বাণীর দাবি তুলেছে। বেজেছে ড্রাম, উড়েছে পতাকা, প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিতে দিতে হাজার হাজার গৌরী সোচ্চার হয়েছেন, ‘গৌরী লঙ্কেশ অমর রহে’। নিজের বাড়ির সামনে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ। প্রতিবাদে দেশের অন্য গৌরীরা মাথা তুলে গর্জে উঠেছেন। প্রগতিশীল ফোরাম ‘গৌরী লঙ্কেশ হত্যা বিরোধী ভেদিকে’ এদিনের প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করে। গৌরী লঙ্কেশ হত্যায় সুবিচারের দাবিতে এবং জাতীয়স্তরে ‘প্রতিরোধ সম্মেলন’ গড়ে তুলতে গত শুক্রবার সমাজকর্মী, লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীদের নিয়ে এই ফোরাম তৈরি হয়েছে। ফোরামের আহ্বায়ক কে লীলার কথায়, কমপক্ষে ৫০হাজার মানুষ এদিন মিছিলে অংশ নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিবাদ মিছিলে ছিলেন সি পি আই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, সমাজকর্মী তিস্তা শীতলবাদ, মেধা পাটেকর, পি সাইনাথ, আশিস খেতান, রাকেশ শর্মা, স্বামী অগ্নিবেশ। ‘ভারতের আদর্শ এবং গণতন্ত্রের একজন সর্বক্ষণের যোদ্ধা হিসাবে আমি আজ এখানে এসেছি। দলের প্রতিনিধি হয়ে নয়। ভারতের যে আদর্শ তা অস্পষ্ট কিছু নয়। সুস্পষ্ট এবং প্রাণবন্ত। এই আদর্শ টিকে থাকবে তখনই যখন আলোচনা এবং তর্কের পর্যাপ্ত পরিসর থাকবে। যখন বিতর্ক হলেই কারোর উপর বুলেট এবং হত্যা নেমে আসবে না, বলেছেন ইয়েচুরি। এভাবেই জাতপাত এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই সম্ভব। আদর্শের লড়াই ভারতের ভাবনা। যদি তা বুলেট ছুঁড়ে হত্যা করা হয়, তাহলে আমার ভারত কখনওই তা মেনে নেবে না।’ একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গৌরীর সঙ্গে যা ঘটেছে তা মেনে নেওয়া যায় না। এটি কোনও পৃথক ঘটনাও নয়। যারা দেশের ক্ষমতায় রেয়েছে তারা যে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাইছে, তা বুঝতে পেরেই আমরা পথে নেমেছি প্রত্যেকে।’ বলেছেন, ‘আমাদের অনেককিছু করার আছে। সংখ্যালঘুদের সম অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে উন্নত ভারত।’

‘আমি বিশ্বাস করি, সংখ্যাগুরুবাদী ফ্যাসিবাদেরই শিকার গৌরী’, বলেছেন তিস্তা শীতলবাদ। ‘ক্ষোভ, দুঃখ, সংহতি সবকিছুর মিলিত টানেই আমি আজ এই মিছিলে। এই সংখ্যাগুরুবাদী ফ্যাসিবাদের রাজনীতির বিরুদ্ধে একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। এই ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন প্রক্রিয়া এবং নানা রং’, ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন তিস্তা। লেখক চন্দ্রশেখর পাতিলের কথায় উঠে এসেছে একরাশ হতাশা, ‘কয়েকবছর আগে আমি ছিলাম দাভোলকার, তারপর পানসারে। আর দুবছর আগে যখন আমার বন্ধু, আমার সহকর্মী কমরেড এম এম কালবুর্গিকে খুন করা হলো, তখন আমি কালবুর্গি হয়ে গিয়েছিলাম। আর এখন আমি গৌরী।’ মেধা পাটেকর বলেছেন, ‘আজ যারা ক্ষমতায় তারা শুধু সংবিধানকেই তছনছ করতে চায় না, সমতার আকাঙ্ক্ষাকেও চুরমার করে দিতে চায়, তাই এত বহু কণ্ঠ আজ একসঙ্গে একমঞ্চে।’ ক্ষুব্ধ কন্নড় লেখক দেবানুর মহাদেবার কথায়, ‘কী ঘটছে এখন? আমরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছি।’

কালো কাপড়ে গোটা শরীর মুড়ে মাথায় কার্ডবোর্ডের কলম নিয়ে এদিন মিছিলে হেঁটেছেন এক যুবক, প্রভাকর। বুঝিয়ে দিয়েছেন, কলমের উপর কী বর্বরোচিত আক্রমণ নেমে এসেছে। আরেক যুবক সাদা কাপড়ে হেঁটে গিয়েছেন গোটা রাস্তা। মুখে আঁকা ছিল ‘শেম’। দেশ আজ লজ্জায় মুখ ঢেকেছে, বুঝিয়েছেন রঘু। ‘ভাবলেও লজ্জা লাগে, এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে ভিন্নমত পোষণ করলেই খুন হতে হচ্ছে। লজ্জায় প্রত্যেকের নিজের মাথা কাটা উচিত’, ঘৃণা-ক্ষোভ একসঙ্গে উগড়ে দিয়েছেন ওই যুবক।

সন্ধে ঘনালেও মঙ্গলবার প্রতিবাদ থামেনি, থামেনি হাজার হাজার গৌরীর পদধ্বনি। সেন্ট্রাল কলেজের মাঠে যখন মিছিল থেমেছে, গৌরীর মা ইন্দিরা লঙ্কেশ ধরা গলায় বলে উঠেছেন, ‘আমার গৌরী তোমাদের সবার গৌরী। তোমরা সবাই-ই গৌরী।’