শিখণ্ডী সংস্থার মাথায় বসে
তৃণমূলের নেতা, আত্মীয়রা

প্রাক্তন-বর্তমান পরিবহণ মন্ত্রীকে সি বি আই-র তলব

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১২ই সেপ্টেম্বর- নয়া পালক কলকাতা শহরের মুকুটে। নীল সাদা রঙেও তা ঢাকা গেল না। ই ডি-র পরে আয়কর দপ্তরেরও পর্যবেক্ষণ, গোটা দেশে ভুয়ো ও শিখণ্ডী সংস্থার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে কলকাতা শহর। ২০১০ সালের পরবর্তীতেই কলকাতা শহর ও লাগোয়া এলাকা জুড়ে রমরমিয়ে চলছে এই ধরনের ভুয়ো ও শিখণ্ডী সংস্থাগুলি।

গত ১লা এপ্রিল দেশ জুড়ে প্রায় ৩০০টির মত ভুয়ো ও শিখণ্ডী সংস্থায় ঝটিকা তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ই ডি। আয়কর দপ্তরও তাতে শামিল হয়েছিল। দেশের ১৬টি রাজ্যের একাধিক শহরে চলে এই তল্লাশি অভিযান। এরাজ্যে কলকাতা ও শহরতলি এলাকায় এরকম প্রায় ৯০টির মত শিখণ্ডী সংস্থায় তল্লাশি চালিয়েছিল ই ডি। উদ্ধার হয় নথিপত্র। আর তা ঘাঁটতে গিয়েই তদন্তকারী আধিকারিকরা এই ভুয়ো ও শিখণ্ডী সংস্থার অবৈধভাবে টাকা পাচার চক্রে শাসক তৃণমূলের বেশ কয়েকজন বড় নেতার নাম পায়। এরপরে আরও এগোয় তদন্ত।

আয়কর দপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, কলকাতা শহর ও সংলগ্ন এলাকাতেই প্রায় ১৫০টির মত ভুয়ো ও শিখণ্ডী সংস্থার হদিশ মিলেছে। দেখা গেছে প্রায় ১৭শতাংশের মত সংস্থাতেই সরাসরি জড়িয়ে রয়েছেন শাসক তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতা বা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। বিস্মিত আয়কর দপ্তরের আধিকারিকরা ইতিমধ্যে এই নথিপত্র ই ডি-র দপ্তরে জমা দিয়েছেন। রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (এফ আই ইউ)-র কাছেও।

এদিকে এর মধ্যেই আবার নারদকাণ্ডে সি বি আই-র সমন পৌঁছাল বর্তমান ও প্রাক্তন দুই পরিবহণ মন্ত্রীর কাছেই। সারদা কাণ্ডে প্রায় ২১মাস জেল খেটে বর্তমানে জামিনে থাকা প্রাক্তন পরিবহণ মন্ত্রী মদন মিত্র ও বর্তমান পরিবহণ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারিকে শুক্রবারের মধ্যে নিজাম প্যালেসে সি বি আই-র দপ্তরে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তাৎপর্যপূর্ণ হলো ইতিমধ্যে নারদ ঘুষ কাণ্ডে মেয়র শোভন চ্যাটার্জির স্ত্রী রত্না চ্যাটার্জিকে ই ডি তলব করেছে। তাঁর নাম এফ আই আর তালিকায় ছিল না। তাহলেও কেন নারদ ঘুষ কাণ্ডে তাঁকে জেরা? এখানেও উঠে আসছে সেই শিখণ্ডি সংস্থার প্রসঙ্গ। ইতিমধ্যে ফরেন্সিক অডিটে নির্দিষ্টভাবে বেশ কিছু তথ্য উঠে আসে। হদিশ মেলে মেয়র শোভন চ্যাটার্জির বিপুল পরিমাণ পারিবারিক সম্পত্তির। ফরেন্সিক অডিট থেকে মেলা তথ্যের সন্ধানেই উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। শোভন চ্যাটার্জি ও তাঁর স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি, অর্থ এমনকি বেশ কিছু বড় মাপের আর্থিক লেনদেনের খোঁজ পাওয়া যায় যা মেয়রের দেখানো আয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিহীন। অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ অর্থের সিংহভাগই আবার রয়েছে স্ত্রীর নামেও।

এই তদন্তেই মেলে মেয়র পত্নীর দুটি সংস্থার কারবার, অ্যাকাউন্টের খোঁজ। এর মধ্যে একটি হরিয়ানার সংস্থা, অন্যটি কলকাতার। দুটি সংস্থারই বোর্ড অফ ডিরেক্টরস’এ রয়েছেন মেয়র পত্নী, একটিতে তাঁর পুত্রও রয়েছেন। আয়কর দপ্তরের একটি সূত্রে জানা গেছে এই দুটি সংস্থাটির মাধ্যমেও টাকা অন্যত্র সরানো হতো।

আয়কর দপ্তরের একটি সূত্রে জানা গেছে, কলকাতা শহরের আপাতত যে ১৫০টির মত সংস্থা রয়েছে তার প্রায় ২৫টির বেশি সংস্থার বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের তালিকায় রয়েছেন তৃণমূলের একাধিক নেতা ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠতম সদস্যরা। তালিকায় আছেন বিধায়ক, মন্ত্রী এমনকি সাংসদও। গত প্রায় ছয়- সাত বছর ধরে এই সংস্থাগুলির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা অন্যত্র এমনকি বিদেশেও বেমালুম পাচার হয়েছে।

২০০৪ সালে এফ আই ইউ তৈরি হয়েছিল মূলত মানি লন্ডারিং, দেশের পাশাপাশি বিদেশে টাকা পাচারের প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি রাখা এবং এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে তদন্তে সাহায্য করার জন্য। বর্তমানে এটি ইকনমিক ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের ( ই ই সি) অন্তর্গত। এফ আই ইউ-র তদন্ত রিপোর্ট বলছে, এরাজ্যে সারদা-রোজভ্যালির মত আর্থিক কেলেঙ্কারির সময় একাধিক ভুয়ো সংস্থার হদিশ মিলেছিল। যার অধিকাংশের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সি বি আই তদন্তের জেরে। কিন্তু এই সময়কালেই দেখা গেছে, সেই সব ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাওয়া সংস্থাই কোথাও নাম ভাঙিয়ে কোথাও বা পুরানো নামেই ফের মাঠে নেমে পড়েছে। মূলত সেই সব কোম্পানির অ্যাকাউন্টকে ব্যবহার করেই চলছে বিপুল টাকার লেনদেন। কেমন সেই লেনদেনের প্রক্রিয়া? ধরা যাক, সকাল ১০টায় একটি কোম্পানিতে ৫০ লক্ষ টাকা ঢুকেছে। মুহূর্তেই সেই কোম্পানি থেকে ৫০ লক্ষ টাকা তুলে নিয়ে জমা দিয়ে দেওয়া হলো অন্য একটি সংস্থার অ্যাকাউন্টে। এরকম ভাবে দেখা গেছে মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যে অন্তত কুড়িটি কোম্পানিতে সেই টাকা ঘুরেছে। তারপর হয় তা অন্যত্র বিদেশে লগ্নি হয়ে গেছে নতুবা ‘সাদা টাকা’ হয়ে তা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছেছে। এরকমই প্রায় ১৫০টি ভুয়ো ও শিখণ্ডী সংস্থা এখন ই ডি, আয়কর দপ্তর ও সেবি’র নজরে রয়েছে। রয়েছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশও।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক আধিকারিকের কথায়, ২০১৩ সালে সারদা ও রোজভ্যালি কাণ্ড সামনে আসে। ২০১৪ সালে নারদ স্টিং অপারেশন হয়। তারপরে ২০১৭ সালেও কলকাতা শহরে প্রায় ১৫০টি ভুয়ো ও শিখণ্ডী সংস্থায় টাকা পাচার চক্রে সামনে চলে আসছে ওই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলটির নাম। দুর্নীতির শিকড় পশ্চিমবঙ্গে রীতিমত গভীরেই পৌঁছেছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement