কৃষক আন্দোলনে রাজস্থান উত্তাল
আলোচনায় বাধ্য হলো সরকার

বিশেষ সংবাদদাতা

জয়পুর, ১২ই সেপ্টেম্বর- রাজস্থানে উত্তাল কৃষক আন্দোলনের চাপের মুখে মঙ্গলবার কৃষক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসলো রাজ্য সরকার। জুলাই-আগস্ট থেকে বিশেষ করে সিকরে আন্দোলন চলছে। কৃষি ঋণ মকুব, স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মেনে উৎপাদন খরচের দেড়গুণ সহায়ক মূল্য, রেগার মজুরি ও কাজের দিন বৃদ্ধির মতো দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়েছে। সিকর ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলির সড়ক পুরোই অবরুদ্ধ। জাতীয় সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। সিকর তো বটেই, একাধিক জেলায় বন্‌ধের চেহারা।

এই অবস্থায় মঙ্গলবার সারা ভারত কৃষক সভার নেতাদের বৈঠকে ডাকে বসুন্ধরারাজে সরকার। জয়পুরে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে চার মন্ত্রী মন্ত্রীগোষ্ঠীর সঙ্গে। কৃষি, অর্থ, সেচ, বিদ্যুৎ দপ্তরের মন্ত্রীদের সঙ্গে কৃষক নেতা অমরা রাম, প্রেমা রাম ও অন্যরা আলোচনায় বসেন। আলোচনা অসমাপ্ত রয়েছে। বুধবার ফের একপ্রস্থ আলোচনা হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ‘চাক্কা জ্যাম’ চলবেই বলে অমরা রাম এদিন রাতে জানিয়েছেন।

সিকরের আন্দোলন সম্পূর্ণ নতুন চেহারা নিয়েছে। চিরাচরিত কৃষক আন্দোলনের পরিধি ছাড়িয়ে তা এখন জনসংখ্যার বিপুল অংশের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৬ই জুন। সারা ভারত কৃষক সভা ওইদিন সিকরের কৃষি উপজ মান্ডিতে সভা ডেকেছিল। সেদিনই স্থির হয় কৃষকদের দাবিতে একমাস বাদে ১৭ই জুলাই জেলায় ‘কিষান কারফিউ’ হবে। ১৭ই জুলাই সকাল আটটা থেকে দুপুর পর্যন্ত এই ‘কারফিউ’ চলে। ৪০টি জায়গায় কৃষকরা জড়ো হয়ে ‘কিষান চৌকি’ করেন। কৃষক সভার নেতা অমরা রাম সেদিনই ঘোষণা করেন সরকারকে দশদিন সময় দেওয়া হচ্ছে। রাজস্থান সরকার সময় পেলেও কৃষকদের ডাকেনি। কৃষকরা ঠিক করেন আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি করা হবে। ৯ই আগস্ট রাজস্থানজুড়ে কৃষকরা গ্রেপ্তার বরণ করবেন। রাজস্থানজুড়ে প্রচার হয়। শুধু সিকরেই এক হাজারের বেশি কৃষক গ্রেপ্তার বরণ করেন। আন্দোলনের পরের ধাপে ঠিক হয় এবার জেলার সদর দপ্তরে লাগাতার ধরনা শুরু হবে। সেই ধরনা বা মহাপাদভ শুরু হয় ১লা সেপ্টেম্বর। হাজার হাজার কৃষক খাবার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় টুকিটাকি নিয়ে ধরনায় বসে পড়েন। শুরুর দিনেই ১৫হাজার কৃষক জেলাশাসকের দপ্তর অভিমুখে মিছিল করেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা দাবিসনদ জেলাশাসকের দপ্তরে দিয়ে আসেন। পরের তিন দিন রোজই এভাবে মিছিল হয়। কৃষক মান্ডিতে কৃষকরা ধরনা চালিয়ে যান। ৪ঠা সেপ্টেম্বর এক নজিরবিহীন মিছিল হয়। লক্ষাধিক কৃষক সিকর শহরে জমায়েত হন। অনেকে এসেছিলেন আগের রাতেই। মিছিলে ছিলেন ১০হাজারের বেশি কৃষক রমণী, প্রত্যেকে লাল রঙের শাড়ি পরে এসেছিলেন। বসুন্ধরারাজে সরকারের ‘শবদেহ’ নিয়ে ওই বিশাল মিছিল সিকর শহরকে কাঁপিয়ে দেয়। এত বড় মিছিল কেউ কখনো দেখেননি, একথা লেখা হয় সংবাদমাধ্যমেও। বস্তুত, কৃষকদের আবেদনে সাড়া দিয়ে শহরের দোকানদার, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীরাও আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করেন। দেখা যায় ইটভাটার শ্রমিকরা ৫০০-র বেশি ট্রাক্টর নিয়ে জড়ো হয়েছেন। অটো চালকরা চলে এসেছেন সারিবদ্ধ ভাবে। ধরনায় খাবার, জল জোগান দিতে শুরু করেন শহরের মানুষই। ৭ই সেপ্টেম্বর সিকরে বন্‌ধের ডাক দেওয়া হয়। স্বতঃস্ফূর্ত ও সর্বাত্মক চেহারা নেয় সেই বন্‌ধ। দোকানপাট, হাটবাজার, স্কুল কলেজ সবই বন্ধ হয়ে যায়। শহরে বাস চালকরা সারিবদ্ধ ভাবে ফাঁকা বাস চালিয়ে অভিনব প্রতিবাদ জানান। অ্যাম্বুলেন্স এবং দুধ সরবরাহকারীরাও আন্দোলনে যোগ দেন গাড়ি নিয়ে। সিকরে গান-বাজনা শোনানোর ডিজে ভ্যান জনপ্রিয়। ৯ই সেপ্টেম্বর ১০০ ডিজে ভ্যান সিকর শহরের পথ ঘুরে কৃষক মান্ডিতে আসে। জনপ্রিয় সুরে কৃষক নেতাদের নামে গানও বেঁধেছেন তাঁরা। গোটা শহর এই দৃশ্য দেখতে রাস্থায় নেমে পড়ে। বস্তুত বিস্তীর্ণ এলাকায় গানের তালে তালে নাচও শুরু হয়ে যায়। আবার, এই ধরনা মঞ্চেই রাতে হয়েছে কবি সম্মেলন।

১১ই সেপ্টেম্বর জেলাশাসকের দপ্তরে কৃষক নেতাদের ডেকে পাঠানো হয়। ওইদিন সিকরের সমস্ত রাস্তা কৃষকরা অবরুদ্ধ করে দেন। ৩০০-র বেশি জায়গায় অবরোধ করা হয়। কৃষক নেতাদের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত জেলাশাসক দেখা করেননি। সোমবার থেকে সিকরের সঙ্গে গোটা রাজ্যের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। জেলা থেকে প্রবেশ-প্রস্থানের সমস্থ পথে কৃষকরা, বিশেষ করে মহিলারা বসে পড়েছেন। চাষের যন্ত্র হাতে নিয়েই অবরোধ চলছে।

রাজস্থানের বি জে পি সরকার কৃষকদের সঙ্গে আলোচনার বদলে ১৪৪ধারা জারি করেছে। নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে মুড়ে ফেলা হচ্ছে সিকরকে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট।

এদিকে, মঙ্গলবার সিকর-লাগোয়া চুরু ও ঝুনঝুনুতেও বন্‌ধ পালিত হয়েছে। বস্তুত রাজস্থানের বিস্তীর্ণ অংশেই কৃষক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে।