এত ভয় কিসের

পাহাড়ে অনিশ্চয়তা, ই ডি-সি বি আই দপ্তরে প্রায় প্রতিদিনই নেতা-মন্ত্রীদের ম্যারাথন জেরা আর মাঠে ময়দানে বামপন্থীদের নেতৃত্বে জনগণের উত্তাল আন্দোলনের দামামা। বোঝাই যাচ্ছে নেত্রীসহ গোটা দলটাই ভয়ানক চাপে আছে। মুখে যতই হম্বিতম্বি করুন, আচরণেই স্পষ্ট পায়ের তলার মাটি টলছে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অজানা ভীতি উঁকি মারছে। এই অবস্থায় মাথা ঠিক রাখা কঠিন। ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়াও কার্যত অসম্ভব। বি জে পি যতই তড়পাক শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে একটা রফা করে ফেলা যাবে। কিন্তু বামপন্থীদের ঠেকানোর কোনও সোজা রাস্তা নেই। যেভাবে লড়াইয়ের ময়দানে প্রায় প্রতিদিনই তাঁদের হাজিরা বাড়ছে। সাথে সাথে বাড়ছে জেদ, হার না মানা তেজ। তাতে দুশ্চিন্তা বাড়াই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের হিংস্রতা আর শাসকের সন্ত্রাসের বাঁধ দিয়ে জনরোষের মহাপ্লাবন একটা সময় পর্যন্ত আটকানো যায়। কিন্তু বাঁধের ওপারে ঘৃণার আগুন, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আগুন কিন্তু ধিকি ধিকি জ্বলতেই থাকে। বামপন্থীরা সেই আগুনে প্রতিনিয়ত ঘৃতাহূতি দিয়ে চলেছে। এখন শুধু অপেক্ষা কখন অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। বাঁধের ওপারে জলতল যখন বিপদসীমা অতিক্রম করে প্লাবনের আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করে তখন থেকেই। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলন-গণবিক্ষোভ দেখেও শাসকদল বিপদ ঘণ্টার আঁচ পাচ্ছে। এমনি সাধারণভাবে বাঁধ ভাঙে না। চাপ বাড়তে বাড়তে কোনও এক সময় কোনও এক জায়গায় আচমকা ফাটল সৃষ্টি হয় বা ছোট ছিদ্র তৈরি হয়। পরক্ষণেই সেই ছিদ্র বা ফাটল গোটা বাঁধটাকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে সবকিছু প্লাবনে ভাসিয়ে দেয়। বাংলার বুকে তেমনই এক ভয়ংকর রাজনৈতিক জনপ্লাবনের ভূত দেখতে শুরু করেছে শাসকদল এবং তার নেত্রী। তাই তাদের অসংলগ্ন কথাবার্তা বাড়ছে। সরকারি কর্মচা‍‌রীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভে বিচলিত মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের কুকুরের সঙ্গে তুলনা করছেন। আর যেখানেই মানুষের প্রতিবাদ মুখরতা, গণজমায়েত সেখানেই একদিকে পুলিশ অন্যদিকে তৃণমূলী দুষ্কৃতীরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে হিংস্র শ্বাপদের মতো। ভয়, আতঙ্ক এতটাই তাদের গ্রাস করছে যে গণতান্ত্রিক পথে, আইনি চৌহদ্দির মধ্যে মোকাবিলার সামর্থ্য বা সাহস নেই। হিংস্রতা আর বর্বরতা দিয়েই শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করতে চায়। যা পৃথিবীতে কোনও বর্বর শক্তির পক্ষে সম্ভব হয়নি, তৃণমূল তো কোন ছার।

পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়া, ভীত, উদ্বিগ্ন শাসক তৃণমূলকে এখন স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেখা গেছে গত নবান্ন অভিযানের সময়। আবার দেখা গেল জেলায় জেলায় অভিযানের দিন। অন্তত তিনটি জেলায় পুলিশমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ যে হিংস্র আক্রমণ চালিয়েছে তার পেছনে ভীতি আর উদ্বেগই যে প্রধান কারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না। কলকাতাসহ চারটি জেলা বাদে বাকি সব জেলার সদরে এবং বেশ কিছু মহকুমায় জেলাশাসক ও মহকুমাশাসকের কাছে বিক্ষোভসহ ডেপুটেশন দিতে গিয়েছিলেন কয়েক লক্ষ মানুষ। তাঁদের কাছে কোনও অস্ত্র ছিল না। সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আগাম ঘোষণা করে দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে এই অভিযান হয়। পুলিশের সঙ্গে বিরোধেরও কোনও প্রশ্ন ছিল না। এতদসত্ত্বেও এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সফল হওয়ার সুযোগ দিতে চায় না ভীত তৃণমূল। পুলিশকে লেলিয়ে দিয়ে পথেই আটকানোর চেষ্টা হয় অভিযান। ব্যর্থ হয়ে ক্রোধে মারমুখী হয়ে ওঠে। চালায় লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, এমনকি বোমা, গুলিও। একা পুলিশের সাধ্য নেই এমন জনপ্লাবন ঠেকানো। তাই দোসর হিসাবে সঙ্গে নিয়েছে শাসকদলের বাছাই করা দুষ্কৃতীদের। তারাই ছুঁড়েছে বোমা। লাঠি, বোমা ইত্যাদির বেপরোয়া হামলায় জখম হয়েছেন কয়েকশত মানুষ। তাঁদের অনেকেই গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে শতাধিক নেতা-কর্মীকে। লাঠিপেটা ও গ্রেপ্তারের হাত থেকে রেহাই পাননি শীর্ষ নেতারাও। এমন বর্বরতার কোনও সঙ্গত কারণ ছিল না। মানুষ তাঁদের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে দাবি জানাতে এসেছেন। বিক্ষোভ দেখিয়ে ডেপুটেশন দিয়ে ফিরে যাবেন। অশান্তির কোনও কারণই নেই। তথাপি এমন হিংস্রতা বর্বরতা ভয়ের প্রতিফলন। মমতা ব্যানার্জি যত ভয় পাচ্ছেন, ক্ষমতা হারানোর আতঙ্ক যত গ্রাস করছে ততই তাঁর অসংযম, অস্থিরতা বাড়ছে। পুলিশ ও দলীয় দুষ্কৃতীদের হিংস্রতা বাড়ছে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করলেও জনপ্লাবন ঠেকানোর সাধ্য তাঁর নেই।