যদি চুপ করে যাই
জয় হবে তাদেরই

পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা

এক সপ্তাহ আগে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন গৌরী লঙ্কেশ। এখনও পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। তদন্ত কী থেমে আছে? অথচ দেশের মানুষ জানে কারা এই হত্যাকারী। কারা হত্যা করছে কালবুর্গি, দাভোলকার, পানসারে, গৌরী লঙ্কেশদের। কেন এই সব হত্যা? সেই প্রসঙ্গেই এই লেখা।

গৌরীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। ব্যাঙ্গালোর সমাজে ওরা মধ্যবিত্ত মানে মোটামুটি আপার ক্লাস বলা যেতে পারে। ইংরেজি খুব ভালো বলতে ও লিখতে পারত। ও যেকোনও সংস্হায় অনায়াসে কাজ পেতে পারত। ও কলকাতায় আনন্দবাজার গ্রুপে আনন্দবাজারের জন্য কাজ করেছে, টেলিগ্রাফের জন্য কাজ করেছে। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর যে পত্রিকাটা ওর বাবা শুরু করেছিলেন সেই পত্রিকাটা ও নিয়ে নেয়, মানে ওই চালাতে শুরু করে। কন্নড ভাষায় পত্রিকাটা। ওর বাবা লঙ্কেশ, পত্রিকাটার নামও দিয়েছিলেন ‘লঙ্কেশ’ থেকে। অর্থাৎ লঙ্কেশ হলো রাবণের পত্রিকা। লঙ্কা থেকে আসছে খবর। সামাজিকভাবে লঙ্কেশ বিপ্লবীচেতনার মানুষ ছিলেন। এই কন্নড সমাজে বিপ্লবী চেতনার বিকাশ ঘটানোর প্রচেষ্টা করে যেতেন। ২০০০ সালে উনি মারা যান। উনি শুধু সাংবাদিক ছিলেন না, উনি লেখক ছিলেন, উনি চলচ্চিত্র নির্দেশনা করেছেন। উনি একদিকে রাজনীতিক, অন্যদিকে সামাজিক নানা ভূমিকা রাখতেন। ওঁর পত্রিকার চরিত্রেও ছিল নানা রূপ। একটা আদর্শকে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা ছিল। পত্রিকাতে কোনও বিজ্ঞাপন নেওয়া হতো না। গৌরী এসে এই পত্রিকার দায়িত্ব নিলো, আজকের দিনে ভারতে এরকম খুব বেশি দেখা যায় না। একজন মহিলা তিনিই পত্রিকার সম্পাদক এবং প্রযোজক সবকিছু, ওরই কোম্পানি ছিল। এই কন্নড ভাষার পত্রিকা বিভিন্ন গ্রামে পৌঁছে যেত। আমি এই কথাটা বলতে চাইছি এইজন্য কোন এলিট ক্লাসের কাছে ইংরেজি ভাষার লেখা পৌঁছানো নয়। সাধারণ মানুষের কাছে, গরিব মানুষের কাছে পৌঁছানো। কন্নড সমাজের কাছে কন্নডভাষী যারা তাদের কাছে ওর চিন্তা-ভাবনা পৌঁছে যেত এই পত্রিকা মারফত। খুব বড় ধরনের প্রভাব ছিল এই পত্রিকার, এটা পরিষ্কার। এই যারা ওকে খুন করলো তারা ওর এই কলমকে, এই চিন্তাকে ভয় পেত। তাই শেষ অবধি তাকে খুন করলো।

ওর বিরুদ্ধের মানুষেরা ওকে ভয় পেতে শুরু করেছিল। কারণ ওর লেখা শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় এলিট এক ধরনের লোকের কাছে পৌঁছাচ্ছিল শুধু তা নয়। ওর লেখা দলিত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। ওর লোকপ্রিয়তা অসাধারণ ছিলো। তাই ওকে ভয় করার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছিল। যারা ওর বিরোধিতা করেছে, ওকে শত্রু হিসাবে চিহ্ণিত করেছে তারা শুধু দক্ষিণপন্থী নয়, তারা চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতির মানুষ।

ওকে কে বা কারা খুন করেছে তা জানি না, কর্ণাটক সরকারের পুলিশ খুঁজে বার করবে কারা কী উদ্দেশ্যে ওকে খুন করেছে। তবে একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে, ওকে খুন করার পর কারা খুশি হয়েছে এটা কিন্তু আমরা সবাই জানি। গৌরী লঙ্কেশ খুন হবার পর ওর বিরুদ্ধে ট্যুইটার ও সোশ্যাল মিডিয়াতে যেসব লেখা বেরিয়েছে, কারা সেগুলি লিখেছে এটা আমরা জানি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের সমর্থক, তাদের ট্যুইটারে ফলো করেন। তারা বাম চিন্তা ধারার বিরোধী। আমি তাদের বর্ণনা করবো এই বলে যে তারা চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। যারা যুক্তিবাদী, যারা অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এরা। এরাই নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবুর্গিকে খুন করেছে। আর গৌরী এই যুক্তিবাদীদের পক্ষে ছিল। গৌরীর স্বামী যার সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে সেই চিদানন্দরাজপুতান তার একটি লেখায় বলেছেন, ওরা যখন কলেজে পড়তো তখন তাদের পড়াতেন আব্রাহাম কভুর নামে একজন শ্রীলঙ্কান ভদ্রলোক। এই যে নানারকম বাবা আজকাল যাদের গডম্যান বা এইরকম কিছু বলা হয়, অধ্যাপক আব্রাহাম কভুর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তিনি তার যুক্তিবাদী মন দিয়ে এই বুজরুকি, ধাপ্পাবাজির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছিলেন। এমন কী সাঁইবাবার বিরুদ্ধেও তিনি যুক্তিবাদী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ঐ অলৌকিক বিষয়গুলিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলম ধরেছিলেন। এই অধ্যাপকের প্রভাব গৌরীর মধ্যে ছিল।

ওর ভাই, যার সঙ্গে গৌরীর সম্পর্ক ভালো ছিল না। যে এখন বি জে পি ঘেঁষা, যে বলছেন, গৌরীর সঙ্গে মাওবাদীদের সম্পর্ক আছে। গৌরী মাওবাদীদের সাহায্য করে। কিন্তু আমি জানি, গৌরী মাওবাদী ছিলেন না। সে তাদের বলেছে তোমরা লড়াই করো, আদর্শ প্রতিষ্ঠা কর। মানুষকে মুক্তির পথ দেখাও কিন্তু হাত থেকে বন্দুক ফেলে দাও। এখন যারা বলছে গৌরী নিজেই মাওবাদী ছিল সেকথা ঠিক নয়, একদমই ঠিক নয়। কে মেরেছে সেটা বের করা অবশ্য পুলিশের কাজ।

এছাড়া আমি আর দু তিনটে কথা বলতে চাই। এক হলো গৌরীর বিরুদ্ধে অনেকগুলো মানহানির মামলা করা হয়েছিল। এরমধ্যে একটা মামলা খুবই অদ্ভুত ছিলো, কয়েকবছর আগে ব্যাঙ্গালোরের এক জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে কিছু লোক ঠকিয়েছিল। এই লোকগুলির মধ্যে কয়েকজন বি জে পির লোক ছিল। এই সংবাদ শুধু গৌরীর কাগজে নয় আরও কয়েকটি কাগজে প্রকাশিত হয়। কিন্তু দেখা যায়, শুধুমাত্র গৌরীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা হয়। এই মামলার পেছনে একজন বি জে পির সাংসদ ছিলেন। একদম লোয়ার কোর্টে হেরে গেলেও হাইকোর্টে গিয়ে জামিন পেয়ে যায় গৌরী। আমি মনে করি, আমাদের দেশে, শুধু আমাদের দেশই বা বলবো কেন সারা বিশ্বেই এই মানহানির মামলা হলো প্রতিবাদীদের মুখ বন্ধ করার একটা সহজ রাস্তা। যারা এটা করে তারা বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, যাদের টাকা পয়সা আছে তারা কোর্টে একটা মামলা ঠুকে দেয় তারপর উকিল দিয়ে বছরের পর বছর সেই মামলা চালায়। তারা জানে তারা জিতবে না, তবু চালায়। এর ফলে মানুষের মুখ বন্ধ করার জন্য ভয় দেখানোর বার্তা পৌঁছায়। কেউ যদি প্রতিবাদ কর বা আমাদের বিরুদ্ধে লেখ তাহলে তোমাদের বিরুদ্ধে মামলা করবো। মোকদ্দমার ভয় দেখিয়ে এভাবে মুখ বন্ধ করানোর একটা লিগাল টার্ম আছে। এস এল এ পি পি বা স্ট্র্যাটেজিক লিটিগেশন এগেনস্ট পাবলিক পার্টিশিপেশন। এমনভাবে মোকদ্দমা করা যাতে অন্যদের সংকেত পাঠানো যায় আমার পিছনে টাকা পয়সা আছে, উকিল আছে। অপ্রিয় সত্য লিখলে আমি তোমাকে বছরের পর বছর আদালতে ঘোরাবো, তোমার পয়সা ও সময় নষ্ট করাবো। বিশ্বের অনেক জায়গায়, আমাদের দেশেও এরকম ঘটনা ঘটছে। আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতাও আছে, এই নিয়ে আমি একটা বইও লিখেছি।

যারা গৌরীকে খুন করেছে তারা চায় লোকেদের মনে ভয় তৈরি করতে। তাদের উদ্দেশ্য হলো লোকের মনে এমন ধারণা তৈরি করা যে গৌরীর মতো অন্ধবিশ্বাসের প্রতিবাদ করলে, চরম দক্ষিণপন্থীদের বিরোধিতা করলে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করলে আমারও মৃত্যু হতে পারে, আমার ছেলেমেয়ে পরিবারের ক্ষতি হতে পারে। অতএব এগুলো থেকে বিরত থাকাই ভালো।

আমি মনে করি, সামনের সময়টা খুবই ভয়াবহ। শুধু সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান নয়, ফ্যাসিবাদী শক্তি মাথা তুলতে চাইছে। তারা বিভিন্ন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বারবার একই মিথ্যা কথা বলে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে চাইছে। তারা ভেবেছে হিটলার, গোয়েবলস্‌ যেভাবে বারবার মিথ্যা বলে মানুষকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিল তারাও সেটাই করতে পারবে। যেমন একটা উদাহরণ হলো, নোটবন্দির জন্য কালো টাকা উদ্ধার করা যাচ্ছে, নোটবন্দির জন্য জাল নোট বন্ধ করা গেছে, নোটবন্দির জন্য সন্ত্রাসবাদীরা অসুবিধায় পড়েছে। জনগণের টাকা ব্যবহার করে এই ধরনের মিথ্যাকে বারবার মানুষের কাছে প্রচার করা হচ্ছে। বড় বড় বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমরা দেখলাম কি ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক পরিষ্কার বলে দিয়েছে যে ৯৯% টাকা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে ফেরত এসেছে। তার মানে নোটবন্দি করে এসব কোনও লাভই হয়নি। তাও ফ্যাসিবাদীদের মতো বারবার প্রচার করে সত্যি বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে।

ফ্যাসিবাদের এই আক্রমণের বিরুদ্ধে গৌরী লড়াই করছিল। সে তার কলম ধরেছিল। তার শেষ সম্পাদকীয়টা ছিল ‘ফেক নিউজ’ নিয়ে। কীভাবে মিথ্যা কথা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করা হচ্ছে। ও নিজেও একবার ভুল করে এরকম একটা ফেক্‌ ছবি ব্যবহার করে ফেলেছিল, যে ভুল ও পরে স্বীকার করে নিয়েছিল, ক্ষমা চেয়েছিল পাঠকদের কাছে। ওর শেষ সম্পাদকীয়তে গৌরী বলেছে চরম দক্ষিণপন্থী এই অন্ধবিশ্বাসের কারবারিদের এই মিথ্যা প্রচার সম্পর্কে সতর্ক করেছিল।

অফিস থেকে ফিরে বাড়ি ঢোকার পথে আততায়ীরা তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে। এতে ভয় পেয়ে আমরা যদি চুপ করে যাই তাহলে জয় হবে তাদেরই। যারা খুন করেছে, তারা এটাই চেয়েছে। তাই আমি আশা করবো, মুখ বন্ধ না রেখে আমরা বুজরুকি, ফ্যাসিবাদ, মিথ্যার বিরুদ্ধে আরও বেশি করে মুখ খুলবো। প্রতিবাদ করবো। আশা করবো, আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা গৌরীকে এই বিষয়ে রোলমডেল হিসাবে অনুসরণ করবে। তাহলে আগামী দিনে হাজার হাজার গৌরীর জন্ম দিতে পারব আমরা।

-------------------------------

যারা গৌরীকে খুন করেছে তারা চায় লোকেদের মনে ভয় তৈরি করতে। তাদের উদ্দেশ্য হলো লোকের মনে এমন ধারণা তৈরি করা যে গৌরীর মতো অন্ধবিশ্বাসের প্রতিবাদ করলে, চরম দক্ষিণপন্থীদের বিরোধিতা করলে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করলে আমারও মৃত্যু হতে পারে, আমার ছেলেমেয়ে পরিবারের ক্ষতি হতে পারে। অতএব এগুলো থেকে বিরত থাকাই ভালো।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement